জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দুপুর এবং পিয়ারার মুখ . . .

img_1375.jpg
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দুপুর । মন বিষণ্ন করা সময় ! যাবো জাতীয় প্রেস ক্লাবে—পাভেল ভাইয়ের সাথে একটা মিটিং আছে । মিটিং শেষে যাবো বৌদ্ধ পূর্ণমার ছবি তুলতে, আজ শুভ বৌদ্ধ পূর্ণিমা । প্রতিদিনের সঙ্গী ক্যামেরা আর মোটরবাইক নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম—জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্দেশে ! 

আজ সরকারি ছুটির দিন । রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, যানজট মুক্ত সড়ক । সচিবালয় এবং প্রেসক্লাব লিংক রোডটিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল, এক দল শ্রমিক সড়কটিতে কাজ করছেন ! সড়কটি সংস্কার করা হচ্ছে । সড়ক ও জনপদের অধীনে চলছে সড়ক সংস্কারের কাজ— ছুটির দিনে সরকারি সকল অফিস-আদালত বন্ধ থাকলেও—এই শ্রমিকদের ছুটি থাকে না ! তাদের কাজ করতে হয় । প্রতিদিন তাদের আয়-রোজগার করতে হয় । সংসার চালতে হয়—পেটের ক্ষুধা মিটাতে কাজ করতে হয় ! সারাদিন ঘাম ঝড়ানো শরীর নিয়ে কাজ করলে—দিন শেষে কিছু মজুরি আসে; সেটাই তাদের কাছে বেঁচে থাকার—একমাত্র অবলম্বন ! অনেক পরিশ্রমের টাকা ! কাজ শেষ করে টাকা পাওয়ার পর এক ঝলক—কষ্টের হাসি ! 

রোদে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের পাশে বসে কাজ করছেন—পিয়ারা বেগমক । বেশী সময় আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন না পিয়ারা । তার মুখ আগুনের তাপ লাগে, মুখটা ঘুরিয়ে তুষ দিতে থাকেন—আগুনের মুখে ! কথা হয় পিয়ারা বেগমের সাথে । সারাদিন কাজ করে ৪০০ টাকা মজুরি পান, আর পুরুষ পান ৬০০ টাকা ! তার দুই মেয়ে, এক মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, আর এক মেয়ে ছোট তার সাথে থাকেন—নারায়নগঞ্জ এর আড়াই হাজারে । স্বামী কি করেন জানতে চাইলে, ৩৫ বছর বয়সের পিয়ারা বলেন, স্বামী নাই ! তিনি তার মেয়ে নিয়ে থাকেন । প্রতিদিন অবশ্য এই মজুরের কাজ জোটে না । এরকম কাজ থাকলে, কন্টাকটার সুলতান তাদের খবর দেয় । আমি প্রশ্ন করি, এই কাজ না থাকলে কি করেন— উত্তরে পিয়ারা বলেন, বাসা-বাড়ীর কাজ করে পেট চালাই । সূর্যের তাপ আর আগুনের তাপে পুড়ে যাওয়া মুখটির দিকে আর একবার তাকাই— দেখে মনে হয় না উনার ৩৫ বছর বয়স ! মনে হয় ৪৫/৫০ বছর । পরিবেশ-প্রকৃতি এবং সমাজ ব্যবস্থা—তার লাবণ্য অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে ! 

প্রিন্টের ছাপা দেয়া একটা কাপড় পরনে, দুই হাতে দুটি চুড়ি আর নাকে একটি নাকফুল পরা পেয়ারাকে বলি, আপনার একটা ছবি তুলি—ততক্ষণে তার পরিশ্রান্ত মুখটিতে এক আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে পরে । বিদায় বেলা পিয়ারাকে বলি, আপনার মেয়েদের নিয়ে আপনি ভালো থাকবেন, নিজের অধিকার অর্জনে— জীবনযুদ্ধটা চালিয়ে যেতে হবে । জীবনযুদ্ধ থেকে পিছনে ফিরে আসার কোন অবকাশ নেই । কারণ এই জীবনটা আপনার । 

পাভেল ভাইয়ের সাথে মিটিং শেষ করে আমাকে দৌড়াতে হবে— বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছবি তুলতে । গৌতম বুদ্ধ কোন একটা বাণী মনে করার চেষ্টা করি, মনে পরে যায় ছোট বেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে টারজান সিরিয়ালটি শুরুর আগে—বিটিভির অনুষ্ঠান শুরুর সময়, একজন ত্রিপিটক পাঠ করতেন, বাণী পাঠের শেষের লাইটি হলো—জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক . . . 
পুরান ঢাকা

১০ মে, ২০১৭ 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s