জীবন-জীবিকার গল্প . . .

ভোরের আলো ফুটে উঠার আগেই প্রস্তুতিটা নিতে হয় ! রাত তিনটার সময় ঘর থেকে বের হন—তারা । তারপর ছোট ছোট ডিঙ্গী নৌকা নিয়ে বিলে চলে যায়—শাপলা তুলতে ! সারাদিন শাপলা তুলে নৌকা বোঝাই করে তা নিয়ে চলে আসেন ঘাটে, বিকেল নাগাদ । নদীর ঘাটে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব; শাপলা গুলো আটিঁ বাঁধার কাজ। এই কাজটি পানির মধ্যে দাড়িয়ে থেকেই করতে হয় । সেদিন গিয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে, এই শাপলা তোলার ছবি এবং সেইসব মানুষ গুলোর সুখ-দুঃখের কথা জানার জন্য । যাদের জীবন-জীবিকা প্রকৃতির নিয়মেই ঋতুতে ঋতুতে পাল্টে যায়—এইখানে ।

কৃষক ইয়ার রহমানের সাথে কথা হয় ঘাটে বসে । বেলা তিনটা-চারটার দিকে আমরা সব শাপলা রেডি কইরা পিকআপে তুইলা দেই, তারপরে হেইডা চইলা যায় ঢাকার যাত্রাবাড়ী, হেনে দরদাম কইরা বিক্রি হয় —শাপলা। সারাদিন এক নৌকা শাপলা তুললে খরচপাতি বাদ দিয়ে তা ধরেন তিন/চার শত টাকা আমাগো থাহে ।

এখন শরৎ কালের শুরু—আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর হয়ে আছে। সড়কটির দুইপাশে বিল; সেই বিলেই শত শত শাপলা ফুটে আছে । সড়কের পাশে সারিসারি গাছ, মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ী চলে যাচ্ছে, তাদের গন্তব্যের দিকে। জায়গাটা খুব ভালো লাগল !

ঘাটে বসে বসে ছবি তুলতে থাকি—ইয়ার রহমানের সুখ-দু্ঃখের কথা শুনি । অন্য আর একজন কৃষক গনি মিয়া শাপলার আটিঁ বাঁধতে বাঁধতে বলেন, সাংবাদিক ভাইরে তোমার দুঃখের কথাটা কও রহমান ভাই, রহমান মাথা নিচু করে কাজ করতে থাকেন । গনি মিয়াই বলতে শুরু করেন, চার মাইয়্যার এহনো বিয়া দিবার পারে নাই, মাইয়্যারা বড় হইয়া গেল ? বাপ-মায়ের বড় চিন্তা অভাবের সংসার কেমনে দিন চলবো । এই করনার সময়ে আমরা যে কেমনে চলতাছি, তা আল্লাই জানে।শাপলার দাম কইমা গেছে, বেচা-বিক্রি ভালো না—এবার । মানুষের হাতে টাকা নাই । জীবন বড় কষ্টে চলতাছে, আমাগো। সাংবাদিক ভাই আমাগো কথা একটু লেইখা দিয়েন ।

ততোক্ষণে ঘাটে আরো অনেক নৌকা এসে থেমেছে। সব নৌকাতেই শাপলা বোঝাই—আমাদের জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ যা এই মানুষ গুলোর জীবিকানির্ব্বাহের একটা মাধ্যম হিসাবে কাজ করছে।

সড়কের ওপারে একটা উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়াই । যতোদূর চোখ যায় বিলটি দেখি । দূর থেকে একটা ডিঙ্গী নৌকা নিয়ে দুটি শিশু এই ঘাটের দিকেই আসছে শাপলা বোঝাই করে । বিকেলের রোদ ওদের চোখে-মুখে, ওরা হাসছে ! ওদের শাপলাও তুলে দেওয়া হবে পিকআপে । যা একটু পরেই ছুটবে ঢাকার উদ্দেশ্যে, আমারও গন্তব্যে ঢাকা . . .

সিরাজদিখান, মুন্সীগঞ্জ
আগষ্ট, ২০২০

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s