মায়া-আলোয় শরৎ দেখা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

নীলাকাশে তখন সবেমাত্র সূর্য্যস্তের রঙ লাগতে শুরু করেছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সাদা মেঘ গুলো কোথাও কোথাও সেই রঙের আভায় ঝলকাচ্ছে, আহা— কি যে সুন্দর দেখতে ! এটাকেই বলে প্রকৃতির—ক্যানভাস । চারিদিকে শান্ত নিরবতা, মৃদু বাতাস আর শুভ্রতা নিয়ে দাড়িয়ে থাকা কাশফুলেরা, আমাদের কাছে আজকের পৃথিবীটার গল্পটা যেন এমনই—ভালোবাসার, আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

প্রকৃতি— তার নিজের ভিতর এমন একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ধারণ করে যে, মানুষের দল সেই মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে ! মানুষের মাথার ভিতরে এক ধরণের ‘বোধ’ তৈরি হয় ! চারিদিকের পরিবেশটা তখন এক আশ্চর্যময় ভালোলাগা তৈরি হয় । আবার এর বিপরীতও হয়— সেটা বোধহীন মানুষের বেলায় খাটে !

দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে, একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে, এখানে। আমরা তখন শরতের কাশফুল ঘেরা মাঠে হেঁটে চলছি, মৃদু ছন্দে । এখানে, সেইসব নীলাকাশে সাদা মেঘেরা খেলা করে, ঐ যে দূরে—দিগন্ত রেখা দেখা যায়; ঠিক তার নিচেই মাঠের প’রে মাঠে ছড়িয়ে আছে কাশফুলেরা—ওরা যেন সব শরৎ ছবি হয়ে আছে !

হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে কেমন যেন এক ধরণের শীতল অনুভূতি হতে লাগলো, বাতাসের গতিবেগ কিছু একটা ইঙ্গিত দিতে চাইছে, কাশফুল গুলোতে যেন সেটা বুঝতে পেরে কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ! প্রকৃতির ‘খেয়াল’ বলে কথা ।

ওমা— এইসব যখন ভাবছি, তখন দেখি আকাশ তার ক্যানভাস একদম পাল্টে ফেলছে ! আকাশ জুড়ে তখন কালো মেঘের আনাগোনা—বৃষ্টি নামবে বলে মনে হয় ! মেঘ— তখন হঠাৎ করে চিৎকার করে বলে উঠলো, বাবা প্লেন ! দেখো কতো নিচ দিয়ে চলছে ! আমরা তখন সবাই তাকালাম, ঢেউ’ সেই প্লেন দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো ! আমি মেঘ’কে বললাম, ওটা নামছে একটু দূরেই আমাদের এয়ারপোর্ট, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল ততোক্ষণে ! আমরা তখন বৃষ্টি ভেজা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে কোন একটা ছাউনি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু আশেপাশে সেরকম কিছু চোখে পরলো না, বেশ দূরে একটা নির্মাণাধীন ব্রীজ দেখলাম, সেটাকে টার্গট করে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম ! তবে সেই ব্রীজ পর্যন্ত পৌঁছাতে যথেষ্ট ভিজে গেলাম, আমরা । মজার ব্যাপার হলো, ঢেউ এবং মেঘ এই বৃষ্টিতে ভিজতে পেরে ওরা তাদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। ঢেউ—বলে উঠলো, বাবা এই বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগছে, আমি বললাম, বিউটিফুল মনের আনন্দে ভিজো— ‘মা’ । আজ ছোট এই মানুষটির কাশফুলের মাঠে বৃষ্টিভেজার অভিজ্ঞতা হচ্ছে !

মেঘ’কে দেখলাম কাশফুলের মাঝে তার দুই হাত প্রসারিত করে, সে বৃষ্টিটাকে খুব উপভোগ করছে । অন্যদিকে মেঘ/ঢেউ এর মা, মেঘের সেই দৃশ্য দেখে তার দিকে ‘কটমট’ করে তাকিয়ে বলছে, মেঘ দ্রুত হাঁটো ! বেচারী বেশ খানিকটা ভিজে গেছে, বৃষ্টিতে ! অবশেষে আমরা ব্রীজের নিচটায় আশ্রয় নিলাম, ততোক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এখানে ।

ব্রীজটির নিচে দাড়িয়ে আমরা বৃষ্টি পরা দেখতে লাগলাম, কাশশফুলের বনে তখন অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে ! মেঘ, আমাকে বললো, বাবা আমরা’তো বৃষ্টিতে ভিজেই গেছি, চলো আরো একটু ভিজি। আমরা বাপ-বেটা মিলে আবার ভিজতে শুরু করলাম, আমাদের এই কান্ড দেখে ‘ঢেউ’ তার মায়ের কাছ থেকে চলে এসে, আমাদের সাথে যোগ দিলো !

একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল । মেঘ/ঢেউ এর মা বললো, সে এখন বাসায় ফিরে যেতে চায় ! আমরা তার সাথে একমত হয়ে সিএনজিতে উঠে পরলাম । ততোক্ষণে কাশফুলের বনে সূর্যাস্ত হচ্ছে । আমাদের সিএনজি চলতে শুরু করলে, একটু পরেই দেখি—ঢেউ আমার কোলে ঘুমিয়ে পরেছে ! তখন তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক মায়া-আলো ছড়িয়ে পরেছে । আমরা তখন সেই মায়া-আলো সঙ্গী করে, ঘরে ফিরে চলছি ।

সেপ্টেম্বর , ২০২১

■ ডাইরি / দিয়াবাড়ী, উত্তরা

© মনিরুল আলম

© মনিরুল আলম

এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া !

ছবি: মনিরুল আলম

আমাদের দেশে ছয় ঋতুর ভিভাজন কাল হিসেব করলে এখন চলছে—শরৎকাল। অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাস মিলে শরৎকাল । নীলাকাশে সাদা মেঘেরা এই ঋতুতেই ভেসে বেড়ায় ! আবার হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ জমে, ঝিরিঝির বৃষ্টি সব কিছু ভিজিয়ে দেয় ক্ষণিক সময়ের জন্য । দেখতে খুব অসাধারন লাগে । এটাই এই ঋতুর বৈশিষ্ট ।

সকালে ঘুম থেকে উঠেছি । বারান্দাতে দাঁড়াতেই দেখি গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পরছে ! মানুষজন কেউ কেউ ছাতা মাথায় নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন ! যদিও বেশীর ভাগ মানুষ এই গুড়িগুড়ি বৃষ্টিকে পাত্তা দেন না ! বারান্দায় লাগানো ফুলগাছ গুলোর দিকে তাকাতেই দেখলাম সবগুলো গাছ বৃষ্টিতে ভিজে একাকার ! আমাদের সামনের বাসার টিনের চালা দেওয়া বারান্দা থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার উপর পরছে ! মেঘ-ঢেউ’কে ডাকলাম তারা তখনো ঘুম !

নয়নতারা গাছটিতে বেশ কয়েকটা সাদা রঙের ফুল ফুটে আছে । ফুল এবং পাতাতে বৃষ্টির ফোটা লেগে থাকা এবং তাতে সূর্যের আলো পরায়— বৃষ্টির ফোটা গুলো খুব অসাধারন লাগছে ! যদিও দৃশ্যটি খুব সাধারন খুব সহজেই যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় । কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলেই মনের ভিতরে এক অসাধারন অনুভূতি তৈরি হয়— ভালো লাগে । আমার কাছে মনে হয়, এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া ! যদিও আমাদের বেশীর ভাগ মানুষদের এই সব ছোট ছোট অনুভূতি দিন দিন ভোতা হতে চলছে ! পাশাপাশি করোনাকালীন এই দুঃসময়ে আমরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, প্রযুক্তি নির্ভরতায় অভ্যস্ত হয়ে পরছে আমাদের জীবন . . .

ডাইরি / ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদী
শরৎকাল, আশ্বিন ১৪২৮
লেখা ও ছবি: মনিরুল আলম

মায়ের কথা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

মা— আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে তার রুটিন নাস্তা করলেন, ওষুধ খাওয়ানো হলো । ছোট বোনের সাথে স্বাভাবিক আচরন করলেন । চা— খাওয়ানোর অনুরোধ করতেই, চা খেলেন । সে আজ নিজেই বললেন, সে এখন আর হাঁটতে পারেন না, উঠে দাঁড়াতে পারেন না, অন্যের সাহায্য ছাড়া বাথরুম করতে পারেন না ।

আজ তাঁর মায়ের কথা খুব মনে পরছিল, শুয়ে শুয়ে অনেক বার মা, মা বলে ডাকলেন, হয়তো তাঁর মায়ের কথা মনে পরেছে । ছোট বোন জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোন মায়ের কথা বলছেন— উত্তরে বললেন, আমার ‘মা’ ! সে আরো বললেন আমার ‘মা’ অনেক আগেই মারা গেছেন, দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিল । মায়ের নাম জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, আমার মায়ের নাম আনোয়ারা খানম । বাবার নাম আনোয়ার হোসেন । আমাদের বাসার নম্বর জিজ্ঞেস করতেই নম্বর বলতে পারলেন । তাদের পরিবারে বড় ভাই মাসুদ ( আমাদের বড় মামা ) বলে ডাকলেন বার কয়েক । একটু পরেই আবার হারিয়ে গেলেন তার সেই অচেতন জগতে !

আমাদের ‘মা’ মাঝে মাঝে তার স্বাভাবিক আচরনে ফিরে আসেন । তখন সবার কথা বলেন, তার সংসারের কথা বলেন, তার জীবনের অনেক স্মৃতি মনে করতে পারেন । ‘মা’ স্বাভাবিক থাকলে আরো একটা কথা বলেন, আমি এমন হয়ে গেলাম কেন ? তার এই অসুস্থতা সে মেনে নিতে পারেন না ! নিয়মিত ওষুধ এবং সার্বক্ষণিক সেবা এখন মায়ের বেঁচে থাকার অন্যতম কারণ । নামাজের সময় হলে সে ঠিক ঠিক নামাজ পরার জন্য তৈরি হয়ে যান । ‘মা’ এখন ছোট বোনের সাহায্য নিয়ে নামাজ পরেন ।

মৃত্যু সবার জন্য নির্ধারিত । আমাদের সবাইকে একদিন
মৃত্যুবরণ করতে হবে । আমাদের মায়ের জন্য আল্লাহর কাছে অনেক অনেক দোয়া । আল্লাহ যেন আমাদের ‘মা’ কে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেন । সবাই আমাদের মায়ের জন্য দোয়া করবেন ।

ছবির কথা : মায়ের এই ছবিটি আমাদের সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সময় তুলেছিলাম, ২৭ নভেম্বরের ২০১০ সালে । মা’কে মজা করে বলেছিলাম, মা সমুদ্র ভ্রমণে এলে সূর্যাস্তের সময় সবাইকে সূর্য হাতে নিয়ে ছবি তুলতে হয়, মা একটা সুন্দর হাসি দিয়ে তার হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ।

ডাইরি / পুরান ঢাকা
১৫ আগষ্ট, ২০২১ ছবি: মনিরুল আলম

ওয়েল কাম টু ধামরাই উপজেলা . . .

ছবি: © খালেদ সরকার

মনে মনে বৃষ্টির আশংকা করছিলাম, সেই চিন্তা থেকে
ক্যামেরা ব্যাগের মধ্যে ছাতা, রেইনকোট নিয়ে নিলাম সঙ্গে এক বোতল পানি । যাবো ধামরাই উপজেলায়, EPA-EFE এর জন্য একটা ষ্টোরি করতে হবে, সঙ্গী আমার প্রতিদিনের বাহন মটরসাইকেল । ঢাকা থেকে সড়ক পথে এই উপজেলাটির দূরত্ব প্রায় ৪২ কিলোমিটার, এখানে আগেও আসা হয়েছে।

বর্ষা মৌসুম শুরু না হলেও বেশ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে । গ্রীষ্মকাল শেষ হতে চলছে, আর ২/৩ দিন পরই শুরু হবে আষাঢ় মাস অর্থাৎ—বর্ষাকাল । খাল-বিল তখন ভরে উঠবে বর্ষার পানিতে, শুরু হবে নৌকা চলাচল, অবিরাম বৃষ্টি পরা শব্দের সাথে শোনা যাবে, ডোবায় ব্যাঙের ডাকাডাকি !

মনের আশংকা সত্য হলো । ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার, নবীনগর এলাকাতে পৌঁছানোর পর শুরু হলো, আকাশ থেকে মেঘের হাকডাক আর বিদ্যুৎ চমকানো । একটু পরেই আকাশ কালো করে শুরু হলো ঝুম— বৃষ্টি ! অগত্যা সড়কের পাশে মটরসাইকেল রেখে—ছাতা, রেইনকোট নিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম । আকাশ থেকে তখন ভারি বৃষ্টি পরছে, একটা অসাধারন বৃষ্টির ল্যান্ডস্কেপ চোখের সামনে দেখলাম । সেই সাথে বৃষ্টির শব্দ—এক কথায় অসাধারন লাগলো সেই মুহুর্ত ! মাঝে মাঝে বাতাসে বৃষ্টির ঝাপটা আমার ছাতাকে পাশকাটিয়ে ভিজিতে দিচ্ছিল আমাকে; এ এক অদ্ভুত অনুভুতি !

ঝড়ো বৃষ্টি-টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, ১০/১২ মিনিট ছিল, বৃষ্টি একটু কমতেই শুরু হলো, আবার আমার মটরসাইকেল যাত্রা ! গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি কেটে কেটে একটা সময় চলে এলাম আমার নিদিষ্ট গন্তব্যে — ওয়েল কাম টু ধামরাই উপজেলা ।

ধামরাই উপজেলার উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এখানেই বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রাচীন ও দেশের বৃহত্তম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় । হিন্দু সম্প্রদায়ের পূণ্যার্থীরা সারাদেশ থেকে এই রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে দলে দলে এখানে আসেন, প্রতিবছর ।

ষ্টোরি-টি শেষ করতে প্রায় দেড়ঘন্টা সময় পার হলে গেল, ততোক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে । এবার আমার ঢাকায় ফেরার পালা । ধামরাই বাজারে দেখতে পেলাম বিশাল— সেই জগন্নাথ রথটি । বাজার থেকে এক প্যাকেট পাউরুটি, কলা আর জাম কিনে নিলাম । মটরসাইকেল ড্রাইভ করতে করতে কোথাও থামিয়ে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নিবো। শুরু হলো আবার সেই আড়াই ঘন্টার মটরসাইকেল যাত্রা— রিটার্ন টু ঢাকা ।

ডাইরি / জুন ২০২১
পুরান ঢাকা © খালেদ সরকার

বৃষ্টি ভেজা ফুরুস ফুলেরা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

তখন বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকটাই । আমি বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি । দিনের পুরোটা সময়, এই এলাকাটিতে থাকে, পথচারীদের চলাচল আর নগর যানের দৌরাত্ব !

খেয়ালি— কোন পথচারী খানিক সময়ের জন্য পার্কটিতে একটু বিশ্রাম নিয়ে, আবার চলতে শুরু করেন তার নিজস্ব গন্তব্যে । স্বাস্থ্য সচেতন এলাকাবাসী সকাল-বিকেল এমনকি রাতের বেলাতেও হাঁটেন, নানা বয়সের ভবঘুরে মানুষদের অসঙ্গতি চোখে পরে— পার্কটিতে !

ক্যামেরা ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই চোখে পড়ল, পার্কটির ঊত্তর পাশের সম্প্রসারণ অংশে থোকায় থোকায় ফুটে আছে; বৃষ্টিতে ভেজা ফুলগুলো । আজ মনে হয়, ইচ্ছে মতো বৃষ্টিতে ভিজেছে— ওরা ! ফোটায় ফোটায় বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে তাদের ভিজে যাওয়া শরীর থেকে ।

গাছগুলোর শরীরে লেগে থাকা পানির ফোটার আলোকিত বিচ্ছুরণ—অনেক দূর থেকে দেখা যায় । কোনো কোনো পথচারীরকে দেখলাম, বৃষ্টিতে ভেজা সেইসব ফুলগুলোর সৌন্দর্য দেখছিলেন খানিক দাড়িয়ে ।

ভিজে যাওয়া ফুল গাছগুলোর অনেক গুলো ছবি তোলা হলো । ঘোড়ার গাড়ীর ছুটে চলার শব্দ, রিকশার টুংটাং আর পার্কটিকে ঘিরে থাকা বাসের সেইসব শব্দ পিছনে ফেলে আমি ফিরে চললাম ।

আর হ্যাঁ — আমি যে ফুলটা দেখে আলোড়িত হয়েছিলাম, আমরা তাদের ‘ফুরুস ফুল’ বলে ডাকি . . .

ডাইরি / মে ২০২১
বাহাদুর শাহ পার্ক, পুরান ঢাকা

ঘাস ফুল . . .

ছবি: মনিরুল আলম

ছোট শিশুদের ফেলে দেওয়া বাথটবে-ই তার জন্ম ! অনেকটা অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে উঠা, এতো ছোট যে অনেক সময় বড়দের ভীড়ে, তাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না, কোথায় যেন হারিয়ে যায়—সে !

কিন্তু ঐ যে, ছোট শিশুদের নিয়ে সব সময় একটা অন্যরকম আকর্ষন থাকে; দেখতে পেলেই তাকে ভালোবাসতে , আদর করতে ইচ্ছে করে । তাকে দেখে আমার কাছে তাই মনে হলো । কিভাবে দাড়িয়ে আছে সে—একাকী সকলের ভীড়ে !

সেদিন—আমাদের ছাদবাগানে নানা লতা-পাতা, গ্লুম দেখতে দেখতে আমি দেখতে পেলাম তাকে । মুগ্ধতা নিয়ে বেশ কিছু ছবি তোলা হলো, তারপর তাকে জানার জন্য চললো কিছু খোঁজ-খবর ।

শহরের মানুষ তাকে ‘পর্তুলিকা’ নামে চেনেন, গ্রামের মানুষেরা তাকে ডাকে তাদের— ঘাস ফুল ।

[ ডাইরি ] পুরান ঢাকা
মে / ২০২১ © মনিরুল আলম

একজন Brilliant ফটোসাংবাদিক, শফিকুল আলম . . .

ছবি: © শফিকুল আলম

ফটোসাংবাদিক—শফিকুল আলম Shafiqul Alam এর কাজের সাথে আমি দীর্ঘদিন পরিচিত, খুব ছোট করে যদি বলতে হয়— শফিকের কাজ বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে, নিউজ ফটোগ্রাফীর ক্ষেত্রে— অনন্য ।

দৈনিক পত্রিকায় ঠিক কোন ছবিটি ছাপা হতে পারে, বা কি ধরণের ছবি তুলতে হবে ডেইলি নিউজের জন্য, শফিক এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন Brilliant ফটোসাংবাদিক বলে আমার কাছে মনে হয় ।

সংবাদপত্রের জন্য সারাদিনে কোন Breaking News বা বড় কোন ঘটনা না ঘটলেও শফিক জানেন তার পত্রিকাটির কি চাহিদা রয়েছে । অন্যদিকে Breaking News কাভার করার সময় ঠিক কোন ছবিটা তুলতে হবে এবং সেই ছবিটির কম্পোজিশন, ভিজুয়াল ইনফরমেশনটা ( পাঠকের জন্য Massage ) কি হবে—তা সে জানেন, এখানেই শফিক অন্যদের থেকে—ব্যতিক্রম ।

কোন নিউজ ইভেন্ট কাভার করার ক্ষেত্রে ফটোসাংবাদিকতার নিউজের যে এঙ্গেল বা পয়েন্ট অব ভিউ, বা অগ্রজ্ঞান বলতে যা বুঝায়, শফিক চট করে তা বুঝে ফেলেন এবং তা তাঁর ক্যামেরায় তুলে আনেন । তাঁর কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এটি । যা আমার কাছে খুব ভালো লাগে, নিউজ ছবি নিয়ে অসমান্য তার চিন্তা শক্তি কাজ করে ।

যারা নতুন ফটোসাংবাদিকতা করছেন বা ফটোসাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করছেন তাদেরকে বলবো— শফিকের কাজ গুলো Study করতে । এতে করে দুটি জিনিস জানা হবে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে Daily News Events কাভার করার ক্ষেত্রে, কোন কোন বিষয় গুলো গুরুত্ব দিতে হবে, তা জানা হবে । এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফটোসাংবাদিক কি করে সঠিক নিউজের ছবিটি তুলেন, তা জানা যাবে ।

শফিক প্রায় ১৮ বছর যাবত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় কাজ করে আসছেন, বর্তমান তিনি দৈনিক The Financial Express সিনিয়র ফটোসাংবাকিক হিসাবে কাজ করছেন ।

অকৃত্রিম এবং বন্ধুসুলভ এই মানুষটি আমার এই ছবিটি তুলে পাঠিয়েছন । সেদিন, ১ মার্চ, ২০২১ তারিখে বাম সংগঠন গুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ঘেরাও কর্মসুচি আমরা এক সাথে কাভার করেছিলাম ।

শফিক আপনার জন্য শুভ কামনা, ভালো থাকবেন . . .

[ ডাইরি ] পুরান ঢাকা
মার্চ / ২০২১ © শফিকুল আলম

মাথার উপরে পূর্ণিমার চাঁদ . . .

আমাদের মাথার উপরে তখন ভরা পূর্ণিমার বিশাল আকাশ ছবি: মনিরুল আলম

পূর্ণিমার চাঁদ / Full Moon —আমার কাছে সর্বদা এক ‘কাব্য রহস্য’ বা Poetic Mystery বলে মনে হয়, কি জানি এর অর্থ হয়তো-বা অন্য কোন কিছু । সেদিন পূর্ণিমা দেখতে আমরা তিনজন ছাঁদ-বাগানে বসে ছিলাম, আমাদের মাথার উপরে তখন ভরা পূর্ণিমার বিশাল আকাশ।

মেঘ, ঢেউ আমাকে চাঁদের ছবি তুলতে সাহায্য করেছিল, আমি ছবি তোলা শেষে চাঁদ নিয়ে ছোট বেলায় জানা, নানা গল্প আর চাঁদ বিজ্ঞানের নানা কথা শোনালাম । চাঁদের এই ‘কাব্য রহস্য’ ওদের মনে হয়তো ভালো লাগলো । চাঁদের এই ছবিটি Double Exposure দিয়ে তোলা হয়েছিল, সে গল্প না হয়, অন্য কোন দিন বলা যাবে . . .

[ ডাইরি ] পুরান ঢাকা
এপ্রিল / ২০২১ © মনিরুল আলম

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আট বছর . . .

আবদুল আজিজের সাথে আলাপচারিতা. . .

আবদুল আজিজ— সবজী বিক্রি করেই তার সংসার চলে এখন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছে আজ আট বছর হলো । রানা প্লাজার চার তলায় ফ্যানটম গামেন্টস, আয়রন সেকশন কাজ করতেন ১৮, বছরের শাওন। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার আট বছর কাভার করতে, আজ সেখানে গিয়েছিলাম,সাভারে ।

ধ্বংস স্তুপ এর কোন চিহ্ন নেই—আজ সেখানে। কাটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে, সবুজ আগাছা, ময়লা- আর্বজনা আর ডোবায় পরিনত হয়ে, স্থবির হয়ে আছে, সেই—রানা প্লাজা !

নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করতে এই করোনাকালীন সময়ে স্বজনের অনেকেই আজ এসেছিলেন, এসেছিল বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন । ঘটনাস্থলে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা,
প্রতিবাদ করেন, বিচার চান, ক্ষতিপূরণ চান।

বাংলাদেশের গামেন্টস শিল্পের জন্য ২৪ এপ্রিল ২০১৩ এক কালো দিন হিসাবে চিন্তিত হয়ে আছে । যেখানে ১১৩৬ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও কয়েক হাজার শ্রমিক কেউ কেউ পঙ্গুত্ব হয়ে, চাকুরি হারিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন, আজ।

বৃদ্ধ আজিজ, তার ছেলেকে স্বরণ করে— কাঁটাতার ঘেরা এক প্রান্তরে দাড়িয়ে, নিরবে কাঁদছিলেন । ছেলের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইছিলেন । সেখানেই আলাপচারিতা হয়—নিহতদের বাবা আবদুল আজিজের সাথে . . .

[ ডাইরি ]
সাভার, রানা প্লাজা
২৪ এপ্রিল / ২০২১
© মনিরুল আলম

কুতুব আলীর ময়না পাখি . . .

জীবন- জীবিকার এই প্রিয় ঢাকা শহর ছেড়ে হাজারো মানুষ তাদের নিজস্ব গন্তব্যে— গ্রামের বাড়ী ছুটছেন। করোনা সংক্রমন আগের থেকে বেড়ে যাওয়ায় সরকার আগামী ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল ২য় সপ্তাহের জন্য সর্বাত্মক লকডাউনে ঘোষণা দিয়েছে, এবারের লকডাউন হবে আগের থেকে অনেক বেশী কঠোর, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে ।

মাছ ব্যবসায়ী কুতুব আলী যাত্রা বাড়ীর মোড়ে বিকল্প গাড়ীর জন্য দাড়িয়ে ছিলেন তার প্রিয় ময়না পাখিটি নিয়ে, কুতুব আলীর সাথে আলাপচারিতায় উঠে এলো —করোনা ভাইরাস, লকডাউনে, মাছ ব্যবসা আর প্রিয় ময়না পাখি নিয়ে তার ঘর-সংসারের গল্প . . .

[ডাইরি ]
ঢাকা, যাত্রাবাড়ী মোড়
১৩ এপ্রিল / ২০২১
© মনিরুল আলম