কুতুব আলীর ময়না পাখি . . .

জীবন- জীবিকার এই প্রিয় ঢাকা শহর ছেড়ে হাজারো মানুষ তাদের নিজস্ব গন্তব্যে— গ্রামের বাড়ী ছুটছেন। করোনা সংক্রমন আগের থেকে বেড়ে যাওয়ায় সরকার আগামী ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল ২য় সপ্তাহের জন্য সর্বাত্মক লকডাউনে ঘোষণা দিয়েছে, এবারের লকডাউন হবে আগের থেকে অনেক বেশী কঠোর, যাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে ।

মাছ ব্যবসায়ী কুতুব আলী যাত্রা বাড়ীর মোড়ে বিকল্প গাড়ীর জন্য দাড়িয়ে ছিলেন তার প্রিয় ময়না পাখিটি নিয়ে, কুতুব আলীর সাথে আলাপচারিতায় উঠে এলো —করোনা ভাইরাস, লকডাউনে, মাছ ব্যবসা আর প্রিয় ময়না পাখি নিয়ে তার ঘর-সংসারের গল্প . . .

[ডাইরি ]
ঢাকা, যাত্রাবাড়ী মোড়
১৩ এপ্রিল / ২০২১
© মনিরুল আলম

আমরা তখন অন্ধকারে হেঁটে চলছি . . .

সন্ধ্যার আকাশে একটা নিশাচর উড়ে গেল মনে হয়; তারপর আরো একটা । মুকুলে মুকুলে ছেয়ে পরা আম গাছটায়—একটা লক্ষীপেঁচা ডেঁকে উঠলো ;

আমরা তখন অন্ধকারে হেঁটে চলছি, সড়কের প’রে— জোনাকি পোকা দেখে দেখে । আমাদের পায়ের শব্দ গুলো বহু দূরে গিয়ে মিলিয়ে যায়— ফিরে আসে না ! কি জানি কি হয় !

পৃথিবীর এই সব গল্প গুলো ফুরিয়ে যায়— মৃত হয়ে হারিয়ে যায় — যেমন হারিয়ে গেছে — প্রস্তর যুগের সেই সব ঘোড়াদের কাহিনী . . .

মার্চ ২০২১

■ ডাইরি / কালিহাতী, টাঙ্গাইল

নির্জনতার গল্প . . .

নির্জন দুপুরে—জানালার পাশে রোজ এসে বসি,—দেয়ালের কার্নিশে হেলে পরা আলোর বিচ্ছুরণ দেখি ;

চড়ুই পাখি আর ঝুটি শালিকের হৃদয়ের আর্তনাদ শুনি,— ওদের মনে কোন এক বিপন্ন বিস্ময় জাগে;—একটা বুনো বেড়াল জীবন্ত শিকার ধরে,—দেয়ালের কার্নিশ দিয়ে হেটে চলে গেল !

দেয়ালের কার্নিশে বসে থাকা এক ঝাঁক বুনো কবুতর কোথায় যেন উড়ে চলে গেল;—‘হরি বলা’ ধ্বনি দিয়ে কারা যেন, কাঁধে করে একটা শব নিয়ে গেল—শশ্মান ঘাটে;

আজকাল— চোখে খুব ভালো একটা দেখতে পাই না;—ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা কবিদের সেইসব স্কেচ করা পোট্রেট গুলো—অস্পষ্ট বলে মনে হয়;

জানালা থেকে ফিরে আসি.—আবার জানালায় পাশে যাই,— আলোর বিচ্ছুরণ দেখি;—অন্ধকার চোখে . . .

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

■ ডাইরি / পুরান ঢাকা

সেলফ পোট্রেট . . .

সেলফ পোট্রেট । ছবি: মনিরুল আলম

সেদিন শান্তি নগর গিয়েছিলাম । একটা ব্যক্তিগত কাজ ছিল । লিফট দিয়ে নামছি— লিফটের গ্লাসে আমারই প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে, সেটা আমার নজরে এলো । মাস্কের আবরণে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা পরে আছে, কিছুটা যেন অস্পষ্ট, অচেনা লাগছিল নিজের আত্মপ্রতিকৃতিটি দেখে ! মোবাইল ক্যামেরাটি দিয়ে মুহুর্তটির ছবি তুলে রাখলাম ।

করোনাকালীন সময়— এখন সময়ের দাবি মাস্ক পরিধান করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া । এটাই এখন নিজেকে এবং অন্যকে সুস্থ রাখার স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে । আজকাল এই শহরের অনেক জায়গাতে একটি লেখা বেশ চোখে পরে—No mask, No service । সেদিন দেখি, মেঘ আমাদের ছাঁদের দেয়ালে বিভিন্ন জায়গায় ইটের টুকরা দিয়ে এই কথাটি লিখে রেখেছে ।

শহরের মানুষ আগের থেকে অনেকটা ( কম-বেশী ) এই বিষয়ে সচেতন হয়েছেন । তবে এই সচেতনতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা উচিত—আমাদের সবার । ইতিমধ্যে COVID-19 এর ভ্যাকসিন আমাদের দেশে চলে এসেছে । করোনাযুদ্ধের সম্মুখ যোদ্ধারা এরই মধ্যে ভ্যাকসিন নিতে শুরু করেছেন । এ মাসেই শুরু হবে সবার জন্য করোনা ভ্যাকসিন কর্মসুচি । তবে করোনাকালীন সংকটময় সময়টা— মানুষ চিরদিন মনে রাখবে । এই মহামারি জনিত রোগে অনেকেই হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জন। যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি । যারা অসুস্থ রয়েছেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি তারা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেন । সবার জীবন সুস্থ এবং সুন্দর কাটুক— এই প্রত্যাশা ।

Norwegian ফটোগ্রাফার— আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক
Morten Krogvold, বাংলাদেশে এসেছিলেন তার তোলা ছবির প্রদর্শনী নিয়ে ( ছবি মেলার আমন্ত্রণে ) পাশাপাশি আমাদের একটা কর্মশালা নিয়েছিলেন । আমি সেই কর্মশালাতে অংশগ্রহণ করেছিলাম । তার প্রথম আ্যসাইমেন্ট ছিল Self-Portrait তোলা । মুল বিষয়টি ছিল, অনেকটা এরকম—আমি নিজেকে আমার ক্যামেরায় কিভাবে দেখতে চাই এবং উপস্থাপিত হতে চাই । আমরা তা প্যাটিক্যাল করে আমাদের কর্মশালাতে উপস্থাপন করেছিলাম । এই সেলফ পোট্রেটটি তুলতে গিয়ে সেই সময়ের অনেক স্মৃতি মনে পরে গেল ।

আত্মপ্রতিকৃতি Self-Portrait কিংবা group selfie এখন সময়ের দাবি ।বিশেষ করে মোবাইলের সাথে ক্যামেরা সংযুক্ত হবার পর, এই ছবি তোলার প্রবনতা আগের তুলনায় অনেক বেশী বেড়েছে । মানুষ প্রযোজনে-অপ্রযোজনে নিজের সেলফি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট দেন এবং লিখে দেন, এটা এমনি এমনি তুললাম ! অবচেতন মনে, আমরা অনেক সময় অনেক কিছু করি । সব সময় সব কিছুর কারণ খুঁজতে গেলে, অনেক সময় আনন্দটা নষ্ট হয়ে যায়—মন খারাপ হয় ।

সেলফ পোট্রেটটি তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঘটনাস্খলটির একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণিক দলিল বা স্বাক্ষ্য বহন করা । যা অত্যন্ত সহজ এবং দ্রুততার সাথে বর্তমানে মোবাইল ফোনটি দিয়ে তোলা যায়, সংরক্ষণ করা যায় চাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যায় । ছবি তোলার গুরুত্বের দিক থেকে বলতে গেলে—আজকের তোলা একটি আলোকচিত্র / ছবি আগামী দিনের ইতিহাস। যা সেই সময়ের স্মৃতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মনে রাখে, প্রকাশ করে . . .

■ ডাইরি / ঢাকা
ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জীবন-জীবিকার গল্প . . .

ভোরের আলো ফুটে উঠার আগেই প্রস্তুতিটা নিতে হয় ! রাত তিনটার সময় ঘর থেকে বের হন—তারা । তারপর ছোট ছোট ডিঙ্গী নৌকা নিয়ে বিলে চলে যায়—শাপলা তুলতে ! সারাদিন শাপলা তুলে নৌকা বোঝাই করে তা নিয়ে চলে আসেন ঘাটে, বিকেল নাগাদ । নদীর ঘাটে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব; শাপলা গুলো আটিঁ বাঁধার কাজ। এই কাজটি পানির মধ্যে দাড়িয়ে থেকেই করতে হয় । সেদিন গিয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে, এই শাপলা তোলার ছবি এবং সেইসব মানুষ গুলোর সুখ-দুঃখের কথা জানার জন্য । যাদের জীবন-জীবিকা প্রকৃতির নিয়মেই ঋতুতে ঋতুতে পাল্টে যায়—এইখানে ।

কৃষক ইয়ার রহমানের সাথে কথা হয় ঘাটে বসে । বেলা তিনটা-চারটার দিকে আমরা সব শাপলা রেডি কইরা পিকআপে তুইলা দেই, তারপরে হেইডা চইলা যায় ঢাকার যাত্রাবাড়ী, হেনে দরদাম কইরা বিক্রি হয় —শাপলা। সারাদিন এক নৌকা শাপলা তুললে খরচপাতি বাদ দিয়ে তা ধরেন তিন/চার শত টাকা আমাগো থাহে ।

এখন শরৎ কালের শুরু—আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর হয়ে আছে। সড়কটির দুইপাশে বিল; সেই বিলেই শত শত শাপলা ফুটে আছে । সড়কের পাশে সারিসারি গাছ, মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ী চলে যাচ্ছে, তাদের গন্তব্যের দিকে। জায়গাটা খুব ভালো লাগল !

ঘাটে বসে বসে ছবি তুলতে থাকি—ইয়ার রহমানের সুখ-দু্ঃখের কথা শুনি । অন্য আর একজন কৃষক গনি মিয়া শাপলার আটিঁ বাঁধতে বাঁধতে বলেন, সাংবাদিক ভাইরে তোমার দুঃখের কথাটা কও রহমান ভাই, রহমান মাথা নিচু করে কাজ করতে থাকেন । গনি মিয়াই বলতে শুরু করেন, চার মাইয়্যার এহনো বিয়া দিবার পারে নাই, মাইয়্যারা বড় হইয়া গেল ? বাপ-মায়ের বড় চিন্তা অভাবের সংসার কেমনে দিন চলবো । এই করনার সময়ে আমরা যে কেমনে চলতাছি, তা আল্লাই জানে।শাপলার দাম কইমা গেছে, বেচা-বিক্রি ভালো না—এবার । মানুষের হাতে টাকা নাই । জীবন বড় কষ্টে চলতাছে, আমাগো। সাংবাদিক ভাই আমাগো কথা একটু লেইখা দিয়েন ।

ততোক্ষণে ঘাটে আরো অনেক নৌকা এসে থেমেছে। সব নৌকাতেই শাপলা বোঝাই—আমাদের জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ যা এই মানুষ গুলোর জীবিকানির্ব্বাহের একটা মাধ্যম হিসাবে কাজ করছে।

সড়কের ওপারে একটা উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়াই । যতোদূর চোখ যায় বিলটি দেখি । দূর থেকে একটা ডিঙ্গী নৌকা নিয়ে দুটি শিশু এই ঘাটের দিকেই আসছে শাপলা বোঝাই করে । বিকেলের রোদ ওদের চোখে-মুখে, ওরা হাসছে ! ওদের শাপলাও তুলে দেওয়া হবে পিকআপে । যা একটু পরেই ছুটবে ঢাকার উদ্দেশ্যে, আমারও গন্তব্যে ঢাকা . . .

সিরাজদিখান, মুন্সীগঞ্জ
আগষ্ট, ২০২০

ছোট ছোট কথা . . .

ভাই আপনে হেলিকাপ্টার আনেন নাই ? আমি প্রথমে তার কথা বুঝতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না !

উত্তরে সে জানালেন, আরেকদিন দেখলাম কয়জন সাংবাদিক ছোট খেলনা হেলিকাপ্টার আইনা ছাইড়া দিছে, আকাশে ! একবারে আস্তা হেলিকাপ্টার । উপরে অনেক দূর পর্যন্ত উইঠ্যা যায়, আবার নিচে নাইমা আসে, দেখলাম হাতের তাইলায় নামাইলো ! হেইডা দিয়া ছবি তুলছে, ভিতরে মনে হয় ক্যামেরা আছে ।

আমি বললাম আপনি ঠি ক বলছেন, ছোট হেলিকাপ্টারটির নাম হলো ড্রোন । সেটা দিয়ে খুব সহজে ছবি এবং ভিডিও করা যায়, সেটার ভিতরে একটা ক্যামেরা লাগানো থাকে । তবে ঐ যন্ত্র চালাইতে সরকারের অনুমতি লাগে । কিছু নিয়মনীতি আছে, যাক সে কথা, আমি বললাম, ভাই সেই হেলিকাপ্টার আমার নাই ! আমি এই ক্যামেরা দিয়া ছবি তুলি । তার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো, নদীভাঙ্গন সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করি ।

কৃষক হাফেজ আলী জানান, প্রায় একমাস হইলো এই নদী ভাঙ্গন শুরু হইছে । এহন পর্যন্ত প্রায় তিনশত বসতভিটা, নদীতে বিলিন হইয়া গেছে । মানুষ অসহায় হইয়া গেছে, তাগো দাঁড়ানের জায়গা নাই । আমাগো বাড়ী এখনো ভাঙ্গে নাই তবে চিন্তায় আছি, কহন কি হইয়া যায় ! নদীতে প্রচন্ড স্রোত দেখলে বোঝা যায় না। কিন্তু হঠাৎ কইরা ভাঙ্গন শুরু হয় । কিছু বুইঝা উঠার আগেই সব শেষ ।

হাফেজ আলীকে আমি প্রশ্ন করি—নদী ভাঙ্গে কেন ? উত্তরে সে জানায়, নদী থেকে বালু উঠায় আর এই কারণে বন্যার সময় প্রচন্ড স্রোতে নদীর গতিপথ পরিবর্ত হয়, তাই নদী তীরের বসতভিটা ভাঙ্গে । নদীর তীরে রক্ষাবাধঁ দিলে এই ভাঙ্গন বন্ধ করা সম্ভব আর নদী থিইক্যা বালু তোলা বন্ধ করতে হইবো ।

নদী ভাঙ্গন দেখাতে দেখাতে কথা বলে চলেন এই কৃষক, তার সঙ্গে থাকা শহিদুল বিশ্বাস আরো কিছু যোগ করেন । অনেক গ্রামবাসীদের দেখলাম নদীগর্ভে বসতবিটা বিলীন হওয়ার ভয়ে তা আগে থেকেই অন্যত্র সরিয়ে নেবার চেষ্টা করছেন, তাদের ভিটের গাছগুলো কেঁটে ফেলছেন । ছবি তোলা শেষ করে তাদের বিদায় জানিয়ে আমি ফিরে চলি আমার গন্তব্যে . . .

খাড়াকান্দি, ধলেশ্বরী নদী
আগষ্ট, ২০২০

ফুল আর প্রজাপতির গল্প . . .

এই প্রখর রোদে বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যায় না, অথচ
ছাঁদ বাগানের গাছ গুলোকে দেখ ! পাতা আর ফুলেরা
রোদের প্রখরতাকে সামলে নিয়ে—দিব্যি বাতাসে দোল খাচ্ছে; মনে হয় ওরা যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছে !

আমার পাশ দিয়ে শব্দহীন একটা প্রজাপতি উড়ে গেল—ওরা প্রতিদিন নিয়ম করে এই ছাঁদ বাগানে আসে; আচ্ছা মধ্যে দুপুরে ফুলগুলো কি গভীর ঘুমে থাকে—আমার জানা নেই !

ফুটে থাকা ফুলগুলোর সাথে নিবির কখপকথন শেষে
প্রজাপতি গুলো কোথায় যেন—আবার উড়ে যায় ! আমি দুটি ফুলকে ঝরে পরতে দেখলাম !

প্রকৃতির নিয়মে সময় ফুরিয়ে গেলে কেউ ঝরে যায়, কেউ আবার উড়ে চলে যায়—অন্য কোথাও ! এই প্রখর রোদে বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যায় না । যাই, —আমি চলে যাই . . .

■ ডাইরি / আগষ্ট
আগষ্ট, ২০২০

কইন্যার প্রশ্ন—আমার বসার জায়গা কই . . .

মেঘ এবং ঢেউ । ঢাকা, জানুয়ারি ২০২০ ছবি: মনিরুল আলম

এই রিকশা আস্তে চালান, আমিতো পরে যাই—আমিতো সিটে বসেছি ! কথা গুলো বলে ঢেউ আমার দিকে তাকিয়ে ! রিকশাওয়ালা পিছন ফিরে একটা হাসি দিয়ে বলে, ঠি ক আছে মা—আমি আস্তে চালাই। তুমি শক্ত করে বাবাকে ধরে, বসে থাকো . . .

মেঘের— স্কুল ছুটি শেষে, মাঝে মাঝে আমি তাকে নিয়ে আসি । তখন আমার সঙ্গী হয়—ঢেউ । রিকশাতে উঠে সে আমার কোলে বসবে না; রিকশার পাশের সিটে তার বসা লাগবে ! রিকশাতে বসে সব কিছু দেখতে হবে। অত:পর প্রশ্ন — এটা কি, সেটা কি ? এবং উত্তরটাও যথাযথো হওয়া লাগবে ।

আজ মেঘ, ঢেউ এবং আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরছি, রিকশাতে । ফেরার সময় ঢেউ’কে যথারীতি আমার কোলে বসিয়েছি। রিকশা চলতে শুরু করেছে, ঢেউ আমাকে বলছে— বাবা, আমার বসার জায়গা কই ? আমি বলি তাইতো, আমার আম্মীর বসার জায়গা কই ? তারপর বলি—আম্মী তুমি, ভাই আর আমার মাঝখানে বসো— তার বসার জায়গা ছোট হওয়ায় একটু মন খারাপ হয়েছে ! সে ভাইয়ের হাত ধরে রেখেছে, তার বাবার প্রতি অভিমান হয়েছে !

অন্যদিকে, ভাইয়ের প্রতি—তার প্রগাঢ় ভালোবাসা । তার ভাইকে এতোটুকু বকাঝকা করা যাবে না। বকাঝকা করলেই— সে তীব্র এক প্রতিবাদী মানুষ ! শিশুদের মনটা বুঝি এমনই হয় ; তাদের পৃথিবীতে বকাঝকার কোন স্থান নেই । আমরা বড় মানুষেরা এটা মাঝে মাঝে ভুলে যাই ।

কইন্যা আমার— তুই একজন সৎ, সুন্দর এবং সুখী মনের মানুষ হয়ে বেড়ে উঠিস—আল্লাহ নিশ্চই তোকে এবং তোর ভাইকে সহায় এবং রক্ষা করবেন। তার কাছে সব সময় আমার এই প্রার্থনা।

দুই ভাই-বোনের প্রতি ভালোবাসা . . .

ডাইরি / ঢাকা ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছোট ছোট কথা . . .

অর্ণব এবং আদ্রিতা জমজ ভাই বোন । ছবি: মনিরুল আলম

১. সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষ করে চা এবং পত্রিকা নিয়ে বসেছি—আজ শুক্রবার আমাদের পারিবারিক একটি দাওয়াত আছে— সন্ধ্যায় । আমরা যাবো সেখানে—‘মা’ যাবেন না শারীরিক ভাবে ‘মা’ খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ।

চা খেতে খেতে খোঁজ খবর করছিলাম ডেইলি নিউজ ইভেন্টে আজ উল্লেখযোগ্য কি কি আছে ? জানা গেল ‘হ্যাসট্যাগ মি টু’ নিয়ে বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকদের একটা মানববন্ধন আছে—জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, বেলা আড়াইটায় । পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু হওয়া এই ‘হ্যাসট্যাগ মি টু’ আন্দোলন এখন বাংলাদেশে । নারী এবং শিশুদের উপর যৌন নিপিড়নকারীর মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য মূলত এই আন্দোলন ।বাংলাদেশে এটাই হচ্ছে প্রথম ‘হ্যাসট্যাগ মি টু’ সংহতি মানববন্ধন ।

২. শুভ জন্মদিন ছোট দুই মানুষ—অর্ণব এবং আদ্রিতা ! ওরা আমার কাজিন / cousin ( সুমন ) সুমন-শিমুর জমজ দুটি ছেলে-মেয়ে, থাকে ঢাকার রায়ের বাগে । আমরা ওদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম । মেঘ, ঢেউ, নীল, অর্ণব, আদ্রিতা এরা হলো আমাদের পরিবারের ছোট গ্যাং । ওরা সবাই এক সঙ্গে হয়ে সেকি আনন্দ ! অনেক মজা হলো—অনেক দিনপর পারিবারিক আড্ডা হলো ! আমার কাজিনদের তিন ভাই-বোনের মধ্যে সুমি এখন বাংলাদেশে নেই, পরিবার নিয়ে সে এখন মধ্যপ্র্যাচে থাকে, সুমন এবং শুভ দেশে আছে দুজনেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জব করছে, বিয়ে করে সংসারি হয়েছে— ওরা । আমাদের এই আড্ডায় সুমিকে মিস করলাম !

২১শ শতাব্দীর এই পৃথিবীতে মানুষের বসবাস এবং জীবনধারণের চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে— আজ ! সময়ের বিবর্তনে একান্নবর্তী পরিবার গুলো ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে, একক পরিবার— কনসেপ্ট ! আমরা ছুটছি; প্রতিদিন—প্রতিনিয়ত ! আজ অনিবার্য হয়ে পড়ছে আমাদের এই ছুটে চলা । হয়তোবা পরিবারের সবাইকে আর একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব নয় তবু প্রত্যাশা থাকে আমরা হয়তো কোন একদিন মিলিত হবে সেই সব ছোট ছোট ভালোবাসা নিয়ে . . .

রায়ের বাগ, ঢাকা

১৬ নভেম্বর ২০১৮

ছোট ছোট কথা . . .

বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন । ছবি: মনিরুল আলম

এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটেছিল—ঘোড়ায় চড়ে আর ফিরে গেলেন—দোলায় চড়ে । প্রতিবার দুর্গোৎসবে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে দুর্গা আসা-যাওয়ার বাহনটি সম্পর্কে। তার এই ধরাতলে গমনাগমনের বার্তাটা কি ? মূলত প্রতি বছর গজ, ঘোটক, নৌকা, দোলা এইসব বাহনে করে তার মর্ত্যে গমনাগমন ঘটে । তার এই আসা ও যাওয়ার সময় শুভ, অশুভ, ক্ষয়ক্ষতি একটা বার্তা বহন করে । আর এটা পুরাকালের মুনি, ঋষি ও পণ্ডিতরা গবেষনা করে এই বাহনে গমনাগমনের বার্তাটি অনুধাবন করেছিলেন ।

শাখারী বাজার, পাটুয়াটুলি হয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সদরঘাট—বুড়ীগঙ্গা নদীর তীরে । বিনা স্মৃতি ঘাটে প্রবেশ করতেই মনটা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় পেয়ে বসলো ! নদীটির পশ্চিম আকাশে তাকাতেই দেখলাম সূর্যটি ততোক্ষণে লালা রং ধারণ করেছে—আজকের মতো সে বিদায় নিচ্ছে এই ধরাতল থেকে আর তার এই বিদায়ের সঙ্গী হয়েছেন—দূর্গা দেবী !

পুরান ঢাকা । ওয়াইজঘাট, বিনা স্মৃতি ঘাট । অক্টোবর ২০১৮