মায়া-আলোয় শরৎ দেখা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

নীলাকাশে তখন সবেমাত্র সূর্য্যস্তের রঙ লাগতে শুরু করেছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সাদা মেঘ গুলো কোথাও কোথাও সেই রঙের আভায় ঝলকাচ্ছে, আহা— কি যে সুন্দর দেখতে ! এটাকেই বলে প্রকৃতির—ক্যানভাস । চারিদিকে শান্ত নিরবতা, মৃদু বাতাস আর শুভ্রতা নিয়ে দাড়িয়ে থাকা কাশফুলেরা, আমাদের কাছে আজকের পৃথিবীটার গল্পটা যেন এমনই—ভালোবাসার, আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

প্রকৃতি— তার নিজের ভিতর এমন একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ধারণ করে যে, মানুষের দল সেই মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে ! মানুষের মাথার ভিতরে এক ধরণের ‘বোধ’ তৈরি হয় ! চারিদিকের পরিবেশটা তখন এক আশ্চর্যময় ভালোলাগা তৈরি হয় । আবার এর বিপরীতও হয়— সেটা বোধহীন মানুষের বেলায় খাটে !

দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে, একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে, এখানে। আমরা তখন শরতের কাশফুল ঘেরা মাঠে হেঁটে চলছি, মৃদু ছন্দে । এখানে, সেইসব নীলাকাশে সাদা মেঘেরা খেলা করে, ঐ যে দূরে—দিগন্ত রেখা দেখা যায়; ঠিক তার নিচেই মাঠের প’রে মাঠে ছড়িয়ে আছে কাশফুলেরা—ওরা যেন সব শরৎ ছবি হয়ে আছে !

হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে কেমন যেন এক ধরণের শীতল অনুভূতি হতে লাগলো, বাতাসের গতিবেগ কিছু একটা ইঙ্গিত দিতে চাইছে, কাশফুল গুলোতে যেন সেটা বুঝতে পেরে কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ! প্রকৃতির ‘খেয়াল’ বলে কথা ।

ওমা— এইসব যখন ভাবছি, তখন দেখি আকাশ তার ক্যানভাস একদম পাল্টে ফেলছে ! আকাশ জুড়ে তখন কালো মেঘের আনাগোনা—বৃষ্টি নামবে বলে মনে হয় ! মেঘ— তখন হঠাৎ করে চিৎকার করে বলে উঠলো, বাবা প্লেন ! দেখো কতো নিচ দিয়ে চলছে ! আমরা তখন সবাই তাকালাম, ঢেউ’ সেই প্লেন দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো ! আমি মেঘ’কে বললাম, ওটা নামছে একটু দূরেই আমাদের এয়ারপোর্ট, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল ততোক্ষণে ! আমরা তখন বৃষ্টি ভেজা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে কোন একটা ছাউনি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু আশেপাশে সেরকম কিছু চোখে পরলো না, বেশ দূরে একটা নির্মাণাধীন ব্রীজ দেখলাম, সেটাকে টার্গট করে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম ! তবে সেই ব্রীজ পর্যন্ত পৌঁছাতে যথেষ্ট ভিজে গেলাম, আমরা । মজার ব্যাপার হলো, ঢেউ এবং মেঘ এই বৃষ্টিতে ভিজতে পেরে ওরা তাদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। ঢেউ—বলে উঠলো, বাবা এই বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগছে, আমি বললাম, বিউটিফুল মনের আনন্দে ভিজো— ‘মা’ । আজ ছোট এই মানুষটির কাশফুলের মাঠে বৃষ্টিভেজার অভিজ্ঞতা হচ্ছে !

মেঘ’কে দেখলাম কাশফুলের মাঝে তার দুই হাত প্রসারিত করে, সে বৃষ্টিটাকে খুব উপভোগ করছে । অন্যদিকে মেঘ/ঢেউ এর মা, মেঘের সেই দৃশ্য দেখে তার দিকে ‘কটমট’ করে তাকিয়ে বলছে, মেঘ দ্রুত হাঁটো ! বেচারী বেশ খানিকটা ভিজে গেছে, বৃষ্টিতে ! অবশেষে আমরা ব্রীজের নিচটায় আশ্রয় নিলাম, ততোক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এখানে ।

ব্রীজটির নিচে দাড়িয়ে আমরা বৃষ্টি পরা দেখতে লাগলাম, কাশশফুলের বনে তখন অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে ! মেঘ, আমাকে বললো, বাবা আমরা’তো বৃষ্টিতে ভিজেই গেছি, চলো আরো একটু ভিজি। আমরা বাপ-বেটা মিলে আবার ভিজতে শুরু করলাম, আমাদের এই কান্ড দেখে ‘ঢেউ’ তার মায়ের কাছ থেকে চলে এসে, আমাদের সাথে যোগ দিলো !

একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল । মেঘ/ঢেউ এর মা বললো, সে এখন বাসায় ফিরে যেতে চায় ! আমরা তার সাথে একমত হয়ে সিএনজিতে উঠে পরলাম । ততোক্ষণে কাশফুলের বনে সূর্যাস্ত হচ্ছে । আমাদের সিএনজি চলতে শুরু করলে, একটু পরেই দেখি—ঢেউ আমার কোলে ঘুমিয়ে পরেছে ! তখন তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক মায়া-আলো ছড়িয়ে পরেছে । আমরা তখন সেই মায়া-আলো সঙ্গী করে, ঘরে ফিরে চলছি ।

সেপ্টেম্বর , ২০২১

■ ডাইরি / দিয়াবাড়ী, উত্তরা

© মনিরুল আলম

© মনিরুল আলম

আমরা তখন অন্ধকারে হেঁটে চলছি . . .

সন্ধ্যার আকাশে একটা নিশাচর উড়ে গেল মনে হয়; তারপর আরো একটা । মুকুলে মুকুলে ছেয়ে পরা আম গাছটায়—একটা লক্ষীপেঁচা ডেঁকে উঠলো ;

আমরা তখন অন্ধকারে হেঁটে চলছি, সড়কের প’রে— জোনাকি পোকা দেখে দেখে । আমাদের পায়ের শব্দ গুলো বহু দূরে গিয়ে মিলিয়ে যায়— ফিরে আসে না ! কি জানি কি হয় !

পৃথিবীর এই সব গল্প গুলো ফুরিয়ে যায়— মৃত হয়ে হারিয়ে যায় — যেমন হারিয়ে গেছে — প্রস্তর যুগের সেই সব ঘোড়াদের কাহিনী . . .

মার্চ ২০২১

■ ডাইরি / কালিহাতী, টাঙ্গাইল

নির্জনতার গল্প . . .

নির্জন দুপুরে—জানালার পাশে রোজ এসে বসি,—দেয়ালের কার্নিশে হেলে পরা আলোর বিচ্ছুরণ দেখি ;

চড়ুই পাখি আর ঝুটি শালিকের হৃদয়ের আর্তনাদ শুনি,— ওদের মনে কোন এক বিপন্ন বিস্ময় জাগে;—একটা বুনো বেড়াল জীবন্ত শিকার ধরে,—দেয়ালের কার্নিশ দিয়ে হেটে চলে গেল !

দেয়ালের কার্নিশে বসে থাকা এক ঝাঁক বুনো কবুতর কোথায় যেন উড়ে চলে গেল;—‘হরি বলা’ ধ্বনি দিয়ে কারা যেন, কাঁধে করে একটা শব নিয়ে গেল—শশ্মান ঘাটে;

আজকাল— চোখে খুব ভালো একটা দেখতে পাই না;—ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা কবিদের সেইসব স্কেচ করা পোট্রেট গুলো—অস্পষ্ট বলে মনে হয়;

জানালা থেকে ফিরে আসি.—আবার জানালায় পাশে যাই,— আলোর বিচ্ছুরণ দেখি;—অন্ধকার চোখে . . .

২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

■ ডাইরি / পুরান ঢাকা

সেলফ পোট্রেট . . .

সেলফ পোট্রেট । ছবি: মনিরুল আলম

সেদিন শান্তি নগর গিয়েছিলাম । একটা ব্যক্তিগত কাজ ছিল । লিফট দিয়ে নামছি— লিফটের গ্লাসে আমারই প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে, সেটা আমার নজরে এলো । মাস্কের আবরণে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা পরে আছে, কিছুটা যেন অস্পষ্ট, অচেনা লাগছিল নিজের আত্মপ্রতিকৃতিটি দেখে ! মোবাইল ক্যামেরাটি দিয়ে মুহুর্তটির ছবি তুলে রাখলাম ।

করোনাকালীন সময়— এখন সময়ের দাবি মাস্ক পরিধান করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া । এটাই এখন নিজেকে এবং অন্যকে সুস্থ রাখার স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে । আজকাল এই শহরের অনেক জায়গাতে একটি লেখা বেশ চোখে পরে—No mask, No service । সেদিন দেখি, মেঘ আমাদের ছাঁদের দেয়ালে বিভিন্ন জায়গায় ইটের টুকরা দিয়ে এই কথাটি লিখে রেখেছে ।

শহরের মানুষ আগের থেকে অনেকটা ( কম-বেশী ) এই বিষয়ে সচেতন হয়েছেন । তবে এই সচেতনতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা উচিত—আমাদের সবার । ইতিমধ্যে COVID-19 এর ভ্যাকসিন আমাদের দেশে চলে এসেছে । করোনাযুদ্ধের সম্মুখ যোদ্ধারা এরই মধ্যে ভ্যাকসিন নিতে শুরু করেছেন । এ মাসেই শুরু হবে সবার জন্য করোনা ভ্যাকসিন কর্মসুচি । তবে করোনাকালীন সংকটময় সময়টা— মানুষ চিরদিন মনে রাখবে । এই মহামারি জনিত রোগে অনেকেই হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জন। যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি । যারা অসুস্থ রয়েছেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি তারা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেন । সবার জীবন সুস্থ এবং সুন্দর কাটুক— এই প্রত্যাশা ।

Norwegian ফটোগ্রাফার— আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক
Morten Krogvold, বাংলাদেশে এসেছিলেন তার তোলা ছবির প্রদর্শনী নিয়ে ( ছবি মেলার আমন্ত্রণে ) পাশাপাশি আমাদের একটা কর্মশালা নিয়েছিলেন । আমি সেই কর্মশালাতে অংশগ্রহণ করেছিলাম । তার প্রথম আ্যসাইমেন্ট ছিল Self-Portrait তোলা । মুল বিষয়টি ছিল, অনেকটা এরকম—আমি নিজেকে আমার ক্যামেরায় কিভাবে দেখতে চাই এবং উপস্থাপিত হতে চাই । আমরা তা প্যাটিক্যাল করে আমাদের কর্মশালাতে উপস্থাপন করেছিলাম । এই সেলফ পোট্রেটটি তুলতে গিয়ে সেই সময়ের অনেক স্মৃতি মনে পরে গেল ।

আত্মপ্রতিকৃতি Self-Portrait কিংবা group selfie এখন সময়ের দাবি ।বিশেষ করে মোবাইলের সাথে ক্যামেরা সংযুক্ত হবার পর, এই ছবি তোলার প্রবনতা আগের তুলনায় অনেক বেশী বেড়েছে । মানুষ প্রযোজনে-অপ্রযোজনে নিজের সেলফি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট দেন এবং লিখে দেন, এটা এমনি এমনি তুললাম ! অবচেতন মনে, আমরা অনেক সময় অনেক কিছু করি । সব সময় সব কিছুর কারণ খুঁজতে গেলে, অনেক সময় আনন্দটা নষ্ট হয়ে যায়—মন খারাপ হয় ।

সেলফ পোট্রেটটি তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঘটনাস্খলটির একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণিক দলিল বা স্বাক্ষ্য বহন করা । যা অত্যন্ত সহজ এবং দ্রুততার সাথে বর্তমানে মোবাইল ফোনটি দিয়ে তোলা যায়, সংরক্ষণ করা যায় চাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যায় । ছবি তোলার গুরুত্বের দিক থেকে বলতে গেলে—আজকের তোলা একটি আলোকচিত্র / ছবি আগামী দিনের ইতিহাস। যা সেই সময়ের স্মৃতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মনে রাখে, প্রকাশ করে . . .

■ ডাইরি / ঢাকা
ফেব্রুয়ারি, ২০২১

হিম রাত্রি নামছে . . .

পৃথিবীর সেই সব বিকেলের আলো একে একে নিভে গেলে —সন্ধ্যা আসে ! দূরাগত— শহরের প্রান্ত থেকে কি জানি কিসের শব্দ ভেঁসে আসছে ! আমরা তিনজন— জ্যোৎস্নার আলোয় বসে আছি; আমাদের মাথার উপর হিম রাত্রি নামছে ।

■ ডাইরি / ডিসেম্বর, ২০২০

ফুল আর প্রজাপতির গল্প . . .

এই প্রখর রোদে বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যায় না, অথচ
ছাঁদ বাগানের গাছ গুলোকে দেখ ! পাতা আর ফুলেরা
রোদের প্রখরতাকে সামলে নিয়ে—দিব্যি বাতাসে দোল খাচ্ছে; মনে হয় ওরা যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছে !

আমার পাশ দিয়ে শব্দহীন একটা প্রজাপতি উড়ে গেল—ওরা প্রতিদিন নিয়ম করে এই ছাঁদ বাগানে আসে; আচ্ছা মধ্যে দুপুরে ফুলগুলো কি গভীর ঘুমে থাকে—আমার জানা নেই !

ফুটে থাকা ফুলগুলোর সাথে নিবির কখপকথন শেষে
প্রজাপতি গুলো কোথায় যেন—আবার উড়ে যায় ! আমি দুটি ফুলকে ঝরে পরতে দেখলাম !

প্রকৃতির নিয়মে সময় ফুরিয়ে গেলে কেউ ঝরে যায়, কেউ আবার উড়ে চলে যায়—অন্য কোথাও ! এই প্রখর রোদে বেশীক্ষণ দাঁড়ানো যায় না । যাই, —আমি চলে যাই . . .

■ ডাইরি / আগষ্ট
আগষ্ট, ২০২০

কৃষকের কথা . . .

যাই, বন্যার পানি সড়ক থেকে কতটুকু কমলো দেখে আসি; ভোর বেলা একবার গরু গুলোর জন্য কাঁচা ঘাস খুঁজতে বের হয়েছিলাম—পাইনি;

দেখি ঐ পারায় পাওয়া যায় কিনা ! যদিও বন্যার পানিতে পচে গেছে অনেক ঘাস ! আহা, বোবা প্রাণী গুলো—কেমন করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে !

ছোট মেয়েটার ইলিশ ভাজা দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে হয়েছে; তার মা ঐ বোবা প্রাণী গুলোর মতো আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো !

বন্যার পানি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ভাবি, আমি কৃষক মানুষ; আমাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে; বৃদ্ধা মায়ের ঔষধ, আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন গরু গুলোর খাবার, ছোট মেয়েটার আবদার আর সংসারের সাতটা মুখ ! ওরা আমার পথ চেয়ে থাকবে;

যাই, বন্যার পানি সড়ক থেকে কতটুকু কমলো দেখে আসি . . .

■ ডাইরি / পদ্মা নদী, দোহার

আগষ্ট, ২০২০

রুপালী বৃষ্টি ঝড় . . .

জাফরান রঙে ভরে উঠেছে—সন্ধ্যার আকাশ

আমরা তিনজন ছাঁদের উপর বসে আছি;

সহসা—একটা এরোপ্লেন উড়ে গেল !

আজকের আকাশটা দেখে কি যেন কি মনে হলো আমাদের !

আবার যদি ধূমকেতুর দেখা পাই

বা—সেইসব রুপালী বৃষ্টি ঝড় !

আমাদের মনে এক বিস্ময় জাগে;

আমরা ছাঁদ থেকে নেমে এলাম—

মনে এখনো সেইসব রুপালী বৃষ্টি ঝড় ।

■ ডাইরি / পুরান ঢাকা

১৬ জুলাই / ২০২০

পুরান ঢাকা

কইন্যার প্রশ্ন—আমার বসার জায়গা কই . . .

মেঘ এবং ঢেউ । ঢাকা, জানুয়ারি ২০২০ ছবি: মনিরুল আলম

এই রিকশা আস্তে চালান, আমিতো পরে যাই—আমিতো সিটে বসেছি ! কথা গুলো বলে ঢেউ আমার দিকে তাকিয়ে ! রিকশাওয়ালা পিছন ফিরে একটা হাসি দিয়ে বলে, ঠি ক আছে মা—আমি আস্তে চালাই। তুমি শক্ত করে বাবাকে ধরে, বসে থাকো . . .

মেঘের— স্কুল ছুটি শেষে, মাঝে মাঝে আমি তাকে নিয়ে আসি । তখন আমার সঙ্গী হয়—ঢেউ । রিকশাতে উঠে সে আমার কোলে বসবে না; রিকশার পাশের সিটে তার বসা লাগবে ! রিকশাতে বসে সব কিছু দেখতে হবে। অত:পর প্রশ্ন — এটা কি, সেটা কি ? এবং উত্তরটাও যথাযথো হওয়া লাগবে ।

আজ মেঘ, ঢেউ এবং আমি স্কুল থেকে বাসায় ফিরছি, রিকশাতে । ফেরার সময় ঢেউ’কে যথারীতি আমার কোলে বসিয়েছি। রিকশা চলতে শুরু করেছে, ঢেউ আমাকে বলছে— বাবা, আমার বসার জায়গা কই ? আমি বলি তাইতো, আমার আম্মীর বসার জায়গা কই ? তারপর বলি—আম্মী তুমি, ভাই আর আমার মাঝখানে বসো— তার বসার জায়গা ছোট হওয়ায় একটু মন খারাপ হয়েছে ! সে ভাইয়ের হাত ধরে রেখেছে, তার বাবার প্রতি অভিমান হয়েছে !

অন্যদিকে, ভাইয়ের প্রতি—তার প্রগাঢ় ভালোবাসা । তার ভাইকে এতোটুকু বকাঝকা করা যাবে না। বকাঝকা করলেই— সে তীব্র এক প্রতিবাদী মানুষ ! শিশুদের মনটা বুঝি এমনই হয় ; তাদের পৃথিবীতে বকাঝকার কোন স্থান নেই । আমরা বড় মানুষেরা এটা মাঝে মাঝে ভুলে যাই ।

কইন্যা আমার— তুই একজন সৎ, সুন্দর এবং সুখী মনের মানুষ হয়ে বেড়ে উঠিস—আল্লাহ নিশ্চই তোকে এবং তোর ভাইকে সহায় এবং রক্ষা করবেন। তার কাছে সব সময় আমার এই প্রার্থনা।

দুই ভাই-বোনের প্রতি ভালোবাসা . . .

ডাইরি / ঢাকা ফেব্রুয়ারি ২০২০

সোনালী আকাশে অসীম শূন্যতা . . . 

  

বাবার এই ছবিটি পুরান ঢাকার কালাম ষ্টুডিও থেকে তোলা
 

পি্রয় বাবা—কে নিয়ে আমার কবিতা 

সোনালী আকাশ . . .

সোনালী আকাশ থেকে খসে পরা
একটি উজ্জল নক্ষত্র;

হাজারো নক্ষত্রের মেলা থেকে—চির বিদায় নেয়া;
—দূর গন্তবের দিকে ! সোনালী আকাশ এখন নিস্পন্দন !

এমনি করে খসে পড়বে—হাজারো নক্ষত্র একদিন !
তখন সোনালী আকাশে অসীম শূণ্যতা। 

( পি্রয় বাবা, আব্দুল মোন্নাফ তাকুরদারের স্বরণে)
জন্ম: ৬ নভেম্বর ১৯৩৬। মৃত্যু: ২০ ডিসেম্বর ১৯৯০
সৃষ্টিকাল/এপ্রিল,১৯৯৪

১.বাবার ২৫ তম মৃত্যু বাষির্কী পালন করতে আমাদের গ্রামের বাড়ী মানিকগঞ্জের  হিজুলিয়াতে গিয়েছিলাম পরিবারের সদস্যরা মিলে।  অন্যান্য সদস্যের মধ্য মা, বুবলী, মেঘ আর চাচা,চাচী এবং বুবলীর বড় ভাই-ভাবী এবং ওদের বাচ্চার । আমাদের গ্রামের মসজিদে বাদ মাগরিব নামায শেষে মিলাদ এবং দোয়া পাঠ করা হয়েছে । তার কবরস্থানে গিয়ে কবরে দোয়া পড়লাম । অনেকক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এবার মা আমাদের কবরস্থানে একটা ঘর করে দিয়েছেন, যাতে বষর্ার,বৃষ্টি-বাদলে মরদেহ নিয়ে মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে । এবারের বষর্ার বাবার কবরের মাটি ধসে গিয়েছে তা সংস্কার করার উদে্যগ নিলাম। 

২.১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর, বাবা— না ফেরার দেশে চলে যান । সে দিনের সংবাদটা আমরা ফোনে পেয়েছিলাম । আমি তখন বাসাতে ছিলাম, ঠিক সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফোন আসে । ফোনটা আমার মা রিসিভ করেন- ও প্রান্তের কথা ঠিক বুঝতে না পেরে, আমাকে ফোনটা দেন। আমি কথা বলে ততোক্ষণে বুঝে গেছি—আমরা, আমাদের পি্রয় বাবাকে চিরদিনের মত হারিয়ে ফেলেছি ! বাবা ব্রেন ষ্টো্রক করেছিলেন । সে দিন হাইকোর্টে তাদের বার্ষিক ডিনার পাটির্ ছিল । সেখানে অংশ গ্রহণ করে— মতিঝিল এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন । আমার বাবর আত্মার শান্তি কামনা করে সবাইকে  তার জন্য দোয়া  করার অনুরোধ রইল । সবাই ভাল থাকুন . . . 

২০ ডিসেম্বর, ২০১৫ / হিজুলিয়া, মানিকগঞ্জ 

 

বাম পাশে আমার বাবা ,উপরের ছবি আমি এবং মেঘ নিচের ছবি আমার চাচা এবং আমি । ছবি: মনিরুল আলম
 
বাবা তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছা করে . . . 

“বাবা” তোমাকে যে খুব দেখতে ইচ্ছে করে । কত দিন যে তোমাকে দেখি না ! বুকের মধো কষ্ট গুলো আর্তনাদ করে উঠে-বার বার । কেন যে তোমার উপর বারবার এতো অভিমান হয় আমার । আমি কাউকে বোঝাতে পারিনা . . .
আজ ২০ ডিসেম্বর আমার বাবার ২৪তম মৃতু্য বাষির্কী । ১৯৯০ সালের এই দিনে বাবা, না ফেরার দেশে চলে যান । সে দিনের সংবাদটা আমরা ফোনে পেয়েছিলাম । আমি তখন বাসাতে ছিলাম, ঠিক সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফোন আসে । ফোনটা আমার মা রিসিভ করেন- ও প্রান্তের কথা ঠিক বুঝতে না পেরে আমাকে ফোনটা দেন। আমি কথা বলে ততোক্ষণে বুঝে গেছি। আমরা আমাদের পি্রয় বাবাকে চিরদিনের মত হারিয়ে ফেলেছি।
বাবা ব্রেন ষ্টো্রক করেছিলেন । সে দিন হাইকোর্টে তাদের বার্ষিক ডিনার পাটির্ ছিল, সেখানে অংশ গ্রহণ করে মতিঝিল এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ।
গতকাল আমরা পারিবারিক ভাবে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে কোরান খতম, দোয়ার আয়োজন করেছিলাম ।
ছোট মেঘ তার দাদা’কে দেখেনি। তাঁর কাছে, তার দাদা মানে ফ্রেমে বাঁধানো এক খানা সাদাকালো ছবি আর তার দাদীর কাছে থেকে শোনা নানা গল্প কথা ।
এ মাসে আমাদের গ্রামের বাড়ী হিজুলিয়া গিয়েছিলাম। বাবা যেখানে ঘুমিয়ে আছে ২৪ বছর ধরে। বাবা আপনি ভালো থাকবেন । আমার বাবার জন্য সবাই দোয়া করবেন . . .
পুরান ঢাকা, পাতলা খান লেন

২০ ডিসেম্বর, ২০১৪
 

মানিকগঞ্জের হিজুলিয়ায় আমাদের কবরস্থান, ১৯৩৭ সালে এটা স্থাপিত হয় । ছবিটি ২০, ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম
 

 

কোন এক ঈদে আমাদের গ্রামের বাড়ী হিজুলিয়াতে এই ছবিটা তুলেছিলাম। বাম থেকে চাচা মহিদুর রহমান,দাদা আবদুর রাজ্জাক তাল্কদার,বাবা আবদুল মোন্নাফ তালুকদার। ছবি :মনিরুল আলম