কইন্যার নাম দিলাম ‘ঢেউ’ . . . 

© Monirul Alam / WITNESS PHOTO
আমাদের কইন্যারে নিয়ে এখনো উদ্বেগ, উৎকন্ঠা কাটে নাই ! দশ দিন হাসপাতালে থাকার পরও তার উপর এখনো চলছে ডাক্তারের নানা পরীক্ষা—এই টেষ্ট ঐ টেষ্ট ! যদিও তার অন্যান্য সব রিপোর্ট ভালো তবে তার বিলোরবিনের পরিমান এখনো বর্ডার লাইনে আছে । ডাক্তার বললেন, রোদে দেওয়া লাগবে। কিন্তু রোদের দেখা নাই ! এই রোদ আবার এই বৃষ্টি ! ডাক্তার আরো জানালেন, বিলোরবিনের পরিমান বাড়তে থাকলে আবারও তাকে ফটোথ্যারাপি দেওয়া লাগবে ! আল্লাহ সহায় । আল্লাহ যেন—আমাদের বাবুটা’কে সুস্থতা দান করেন । 

তার নাম দিলাম ‘ঢেউ’ ! মেঘের বোন—ঢেউ । নবজাতক পেটে থাকতেই, আমরা তার নাম কি রাখা হবে সেটা ভাবছিলাম, হঠাৎ করেই এই নামটা মাথায় আসলো । ছেলে হোক বা মেয়ে তার নাম রাখা হবে —ঢেউ । মেঘের সাথে মিলিয়ে কইন্যার নাম রাখা হলো—ঢেউ । মেঘের মা অবশ্য খাতা-কলমের জন্য একটা নাম ভেবে রেখেছে ! আল্লাহর রহমতে তার আকিকাটা দিয়ে নামের কাজটি সম্পন্ন করতে চাই । 

সবাই আমাদের কইন্যা ‘ঢেউ’ এর জন্য দোয়া করবেন . . . 
পুরান ঢাকা 

২৪ জুলাই ২০১৭ 

ফটোগ্রাফী নিয়ে এটিএন নিউজের টিভি শো . . .

19366159_10158908561635707_1429700533194406951_n
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

সে দিন এটিএন নিউজের টিভি শো— ডার্করুম অনুষ্ঠানটিতে অংশ নিয়েছিলাম । অনুষ্ঠানটির প্রধান পরিকল্পনায় আছেন—এটিএন নিউজের হেড অফ নিউজ মুন্নী সাহা। পরিকল্পনা, গ্রন্থণা ও উপস্থাপনায় আছেন জনপ্রিয় ফটোগ্রাফার এবং ওয়েডিং ডাইরির প্রতিষ্ঠাতা প্রীত রেজা এবং প্রযোজনা করছেন ফারুক আযম ।

রোজার মাস— বিকেলে সড়ক গুলোতে ভয়াবহ যানজট ! অফিস ছুটি শেষে বাড়ী ফেরার তাড়া সবার ! কিন্তু বিধিবাম বৃষ্টি ! সঙ্গে ছাতা আর রেইনকোট ছিল বলে রক্ষা ! সেদিন দৃক এর ইফতার পার্টিতে অংশ গ্রহণ করতে গিয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে—শিক্ষাটা ভালো হয়েছে !

এটিএন নিউজে ইফতার শেষ করলাম। আমরা সংক্ষিপ্ত আলাপতারিতা শেষে—সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটিতে অংশ নিলাম । ফটোগ্রাফী, ফটোর্জানালিজম এবং ফটোগ্রাফী প্রশিক্ষণ সহ ফটেগ্রাফীর নানা বিষয় আলোচনা হলো— প্রীতর সাথে । সময় সল্পতার কারণে আলোচনা সংক্ষিপ্ত করতে হলো, যা হোক—আমি ধন্যবাদ জানাই, আয়োজক এটিএন নিউজ এবং ডার্করুম টিভি শো কর্তৃপক্ষকে—আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ।

অনুষ্ঠানটি শেষ হয়ে গেলে—আমাদের আড্ডা হলো আরো কিছুক্ষণ ! আর সেই আড্ডার ফাঁকে একটা গ্রুপ সেলফি ! প্রীত রেজা, ফারুক আযম এবং আমি . . .

১৮ জুন ২০১৭
এটিএন নিউজ
কারওয়ান বাজার

© Monirul Alam / WITNESS PHOTO
https://monirulalam.net

আজ বিশ্ব বাবা দিবস . . .

snapseed-37
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

বিশ্ব বাবা দিবস—সকল বাবা কে অভিনন্দন জানাই । কর্মব্যস্ত বাবা— নিজের সন্তানের জন্য সময় বের করুন । নিজের ছেলে-মেয়ে’র সাথে সময় করে খেলাধুলা করুন, শুধু মাত্র সাংসারিক দায়িত্ব বোধ টুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে—আপনার সন্তান’কে আরো ভালোবাসা দিন, সময় দিন।

জাতিসংঘের শিশু তহবিলের ইউনিসেফ সাম্প্রতিক জরিপটি জানাচ্ছে—বিশ্বে অর্ধেকের বেশি শিশু তাদের বাবার সঙ্গে লেখাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে ! ৭৪টি দেশে এই জরিপ চালানো হয় । বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে এই বাবা দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে এখন ।

আমার বাবা আজ বেঁচে নেই । তিন সন্তানের জনক এই মহান মানুষটিকে ছোট বেলায় অনেক ভয় পেতাম । ভয়ে কাছে যেতাম না ! কিন্তু এটা ছিল—আমার ভুল ! বোঝা-পরার সময়টা পার করতে না করতেই, বাব চলে গেলেন —না ফেরার দেশে ! জমে থাকা কথা গুলো, বাবাকে— আর বলা হলো না !

আমার বাবা হারিয়ে, আরো এক বাবা পেয়েছি আমি —ছোট বাবা; আমার সন্তান । সেই ছোট বাবা ‘মেঘ’ কে নিয়ে আমার সময় কাটে—আদর-ভালোবাসা, মান-অভিমান বাপ-বেটা মিলে উপভোগ করি । বাবা মানুষটি যে ভয়ের না, বাবা যে জীবনের অনেক বড় বন্ধু —সেটা মেঘ ইতি মধ্যে জেনে গেছে । সে বাপ-সন্তানের এই সম্পর্ক—মন থেকে অনুভব করে !

বিশ্ব বাবা দিবসে মা-বেটা মিলে আমার জন্য— খুব সুন্দর একটা গিফট তৈরি করেছে ! সেই গল্পটা না হয়, অন্য কোন দিন করা যাবে । পিতা-সন্তানের ভালোবাসা অটুট থাকুক— আজীবন ।

সবাইকে বিশ্ব বাবা দিবসের ভালোবাসা . . .

পুরান ঢাকা
১৬ জুন ২০১৭

IMG_6901
© Hafizun Nahar / WITNESS PHOTO

মেঘের মুসলমানি . . . 

© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

আল্লাহর রহমতে আজ মেঘের— মুসলমানি করানো হলো । ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে সকাল ১২ টার সময় অপারেশনটি সফল ভাবে করেন, অধ্যাপক ডা: সজল মজুমদার ( বিশেষজ্ঞ শিশু সার্জন ) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ।

 
রমজান মাস এবং ঈদ উপলক্ষে—মেঘের স্কুল এ সপ্তাহে থেকে বন্ধ শুরু হয়েছে । আর এই বন্ধকে সামনে রেখেই মেঘের মুসলমানি / সুন্নতে খাতনা করিয়ে ফেললাম ।

 
এনেসথেসিয়া—দিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়ার পর অপারেশন শুরু হয় । প্রায় আধা ঘন্টা সময় লাগে অপারেশন করতে, জ্ঞান ফিরে আসতে— আরো দেড় ঘন্টা সময় লাগে । জ্ঞান ফিরে আসার পর পর মেঘ বলছে, বাবা একটা মাস্ক আমার মুখের সামনে ধরার পর; আমি রোবটের মতো কাঁপতে কাঁপতে ঘুমিয়ে পড়লাম ! চোখ খুলেই রাখতে পারলাম না—আমার অনেক কষ্ট লেগেছে !

 
মেঘ’কে বাসায় নিয়ে এসেছি । সিএনজি দিয়ে বাসায় আসতে আসতে বার কয়েক ঝাকিতে—সে বেশ কষ্ট পেয়েছে ! ডাক্তার বলে দিয়েছে, সাত দিন তাকে সাবধানে থাকতে হবে, কোন রকম ইনফেকশন হতে দেওয়া যাবে না । নিয়মিত ওষুধ গুলো খেতে হবে ।

 
সবাই মেঘের জন্য দোয়া করবেন . . .
০২ জুন ২০১৭

পুরান ঢাকা

বাবা—শুভ জন্ম দিন . . .

18485997_10158731612315707_975768917675212026_n
আমার ছোট বাবা মেঘের আঁকা ছবি . . .

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেই— ছোট মেঘ এবং তার ‘মা’ আমার কপালে ছোট একটা আদর দিয়ে, জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানালো ! আহা—ভালোবাসা ! গতকাল রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল— কাঁচ আর গ্রীল ঘেরা জানালার দিকে তাকিয়ে—সেই বৃষ্টি পরা দেখছিলাম ! মনে মনে ভাবছিলাম, আচ্ছা আমার এই পৃথিবীতে আগমনের সময়টা কখন ছিল—তখন কি বৃষ্টি ছিল আজকের মতো। নাকি অন্য কোন ক্ষণ ! রাত না দিন বা ঘড়ির কাটায় তখন কয়টা বেজে ছিল ? কে কে উপস্থিত ছিলেন তখন ? এতো গুলো বছর কেটে গেলে অথচ—আমার জন্ম বৃত্তান্ত জানা হলো না ! তা কি হয় ।

সকালে নাস্তার টেবিলে বসে, মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, আমার জন্মদিন সম্পর্কে ! মা—আমাকে বললেন, সব কিছু তোর বাবা’র ডাইরিতে লেখা আছে । মা’র কাছ থেকে বাবার ডাইরিটা নিয়ে পড়ে ফেললাম, আমার জন্মদিন নিয়ে, বাবা যা কিছু লিখে রেখে গেছেন ! বাবার সেই লেখার পাশাপাশি ‘মা’ আরো কিছু সংযোগ করলেন ।

আমার জন্মের সময় বাবা এবং বড়’মা ( নানীর ‘মা’ ) উপস্থিত ছিলেন । পুরান ঢাকায় আমাদের বাসাতেই আমার জন্ম । লক্ষী বাজার এলাকায় সবার পরিচিত এক দাই’মা ছিলেন, তার নাম ছিল—সরলা । সেই সরলা দাই’মা আমার জন্মের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন । ঘড়ির কাটার তখন রাত্রি—৩.১৫ মিনিট শনিবার, ১৬ মে, ১৯৭৫ বাংলা পহেলা জ্যৈষ্ঠ ১৩৮২ ছিল । আমার নিজের সম্পর্কে আরো জানলাম, আমার ওজন ছিল, আন্ডার ওয়েট ! আর আকারে খুব ছোট ! না তাহলে সেই ক্ষণটি বৃষ্টি ছিল না !

সকালে আমার ছোট বাবা—মেঘ, তার আঁকা একটা ছবি আমাকে উপহার দিল ! আমি বললাম কি এঁকেছ বাবা, উত্তরে সে বলল, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা আর ছবি ! মানে তোমার কাজের বিষয় গুলো আমি একেছি । আমি আমার পন্ডিত বাবা’টাকে আর একবার বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলাম !

ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার খুলতেই আমার কাছের এবং দুরের মানুষ গুলো শুভেচ্ছা জানিয়েছেন—আমার জন্মদিনে, সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা ।

কোন এক একুশের বই মেলা থেকে কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কাব্য গ্রন্থ কিনেছিলাম—কবির সাথে দেখা হতেই, কবিকে অনুরোধ করেছিলাম— কিছু একটা লিখে দিতে ! কবি লিখলেন,আপাতত অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে ভালোবাসা ছাড়া কোনো উপায় দেখি না ।

সবার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা . . .

১৬ মে ২০১৭
পুরান ঢাকা

আজ বিশ্ব “মা” দিবস . . .

Snapseed(33)
আমরা তিন ভাই বোন মায়ের সাথে | ছবি : মুরসালিন আব্দুল্লাহ মেঘ

আমার ফুপাতো বোন রুকসানা— গ্রামের বাড়ী হিজুলিয়া থেকে আমাদের ঢাকার বাসায় এসেছেন দিন/ দুই হলো । রুকসানা ফোনে জানিয়েছিল, মামীকে অনেক দেখতে ইচ্ছা করছে—কতো দিন মামীকে দেখি না। “মা” মারা যাবার পর মামীকেই “মা” বলে জানি ! আমি বললাম, তুই চলে আয় ঢাকায় । মা’র চোখের অপারেশন হবে, তুই থাকলে আমাদের ভালো লাগবে । গ্রামের বাড়ী গেলে আমার এই বড় ফুপুর কাছে অনেক আবদার থাকতো— পিঠা খাওয়া থেকে শুরু করে, পুকুরের মাছ, খেজুরের রস,গাছের পেয়ারা, নারিকেল সহ নানা কিছু ! আমাদের এই সমাজে খালা, ফুপু-রা মায়ের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ।

আজ বিশ্ব “মা” দিবস । আমার “মা” সহ পৃথিবীর সকল মায়ের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা । ফেসবুকে স্টাটাস দেওয়ার জন্য নয় বা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সাথে বসবাসকারী এই আমি শুধু গতানুগতিক “মা” দিবস পালনের জন্য নয় । আমার মন-প্রাণ, মেধা-মনন; কোন ভালো কিছুর সায় দিলে— আমি সেটা করার চেষ্টা করি, হয়তো শত ভাগ হয় না । কিন্তু আমি চেষ্টা করি ।

আসুন “মা”- কে ( যাদের “মা” বেঁচে আছেন ) একবার আদর করি, বুকে জড়িয়ে ধরে—একটু পাগলামী করি ! সেই ছোট্ট বাবুটি হয়ে যাই ! আমাদের ছোট “মেঘ” যেমন করে তার মা’কে জড়িয়ে ধরে আদর করে ! আহা ! মা-সন্তানের ভালোবাসা । পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভালোলাগার—একটি মুহূর্ত !

যাদের “মা” দূরে আছেন — ফোনেই না হয় মায়ের সাথে পাগলামীটা করি । যাদের “মা” এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের জন্য দোয়া করি—পরলোকে তাঁরা যেন ভালো থাকেন ।

সব মায়ের জন্য সুস্থতা কামনা করে দোয়া করি । সবাই ভালো থাকুন . . .

১৪ মে ২০১৭
পুরান ঢাকা

তবুও মানুষের আশ্রয় এখানেই . . .

photo-1494576732
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

খালপাড়ে পড়ে আছে কয়েক ফুট উঁচু নোংরা পলিথিনের স্তূপ—সেখানে মাছি উড়ছে! দুর্গন্ধ, কাছে যাওয়া যায় না! রয়েছে ঘোড়ার আস্তাবল। সরু খাল দিয়ে বয়ে যাওয়া—দগদগে কালা পানি! সেই কালা পানিতে ধোয়া হচ্ছে লন্ড্রির কাপড়! এটা বুড়িগঙ্গা নদীর শাখা খাল, কামরাঙ্গীরচরের প্রবেশ মুখের চিত্র।

একটা সময় এই খালটি বুড়ীগঙ্গা নদীর একটা চ্যানেল ছিল, এখন দখল হতে হতে তা সরু খালে পরিণত হয়েছে! এই খাল পার এলাকায় দেখা হলো কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে—বিকেলে তারা এখানেই ঘোরাফেরা করে, মানে খেলাধুলা। এই শিশুদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো, টুকটাক কথা হলো ওদের সঙ্গে—ওরা ছবি তুলতে চাইলে আমি ওদের ছবি তুললাম। চোখে পড়ল টিন দিয়ে ঘেরা কিছু ছোট ছোট ঘর। কিছু নারী শ্রমিককে দেখলাম—নোংরা পলিথিনের স্তূপের ওপর বসে কাজ করছেন। আমার সঙ্গে ক্যামেরা থাকায় তাঁরা কেউ কেউ মুখ ঢেকে ফেললেন। এঁরা সামান্য অর্থের বিনিময়ে সারা দিন পলিথিন ঘাঁটাঘাঁটি করেন। তাঁদের থেকে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম—চোখে পড়ল ব্রিজ! ব্রিজের নিচে বিকেলের রোদে বসে আছে একটি শিশু! মাটির নিজ দিয়ে বেরিয়ে আসা একটি ড্রেনের মুখ দিয়ে নোংরা পানি পড়ছে সরু খালটিতে—শিশুটি বসে বসে সেই পানি পড়া দেখছে! আরো চোখে পড়ল কিছু বেওয়ারিশ কুকুর! এরা সবাই এই বিষাক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠছে—ভাবলেশহীন সব প্রাণ! আমি বিকেলের আলোয় একের পর এক ছবি তুলে যাই! সব চোখ যেন আমার ক্যামেরাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে! কারো কারো চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখি! কেউ কেউ ভীত-সন্ত্রস্ত! সেদিন পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম—পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কামরাঙ্গীরচর ও এর আশপাশের এলাকায়

1494576626-Image-02
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

এই এলাকা বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে দখল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এলাকাটি ঘুরলেই তা চোখে পড়ে। আর এই দখল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সরকারি মদদপুষ্ট লোকজন, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! সময় সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, একদল চলে নতুনরা ক্ষমতায় বসেন, তখন দখল প্রক্রিয়ার চিত্রেরও বদল ঘটে!

মূল নদী থেকে শুরু করে নদীটির আশপাশের খাল, খানা-খন্দে পানির প্রবাহ দেখলেই বোঝা যায়, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে নদীর পানিতে কালো এক ধরনের তরল পদার্থ ভাসতে থাকে, পুরো শুকনো মৌসুম। মাদ্রাসার শিশুদের সঙ্গে নদীর পানি নিয়ে কথা বলতেই—ওরা জানাল এ সময়ে (শুকনো মৌসুমে) তারা এই নদীর পানি ব্যবহার করে না। ওরা জানাল—এই পানিতে গোসল করলে শরীর পচে যায়, ঘাসহ নানা ধরনের অসুখ হয়। এ সময় এলাকার কেউ নদীর পানি ব্যবহার করেন না। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি যখন কিছুটা ভালো থাকে—তখন তারা এই নদীর পানিতে গোসল করাসহ অন্যান্য কাজে তা ব্যবহার করে।

মিরপুর-গাবতলী এলাকা থেকে শুরু হয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমি, হাজারীবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর—এদিকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচ হয়ে লালকুঠি, শ্যামবাজার, পোস্তগোলা, পাগলা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা দখল আর নদী দূষণের চিত্র প্রায়—অভিন্ন। আমি বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষে নিমির্ত বেড়িবাঁধটির কল্পনায় আনি—না কোথাও খুঁজে পাই না এতটুকু দূষণমুক্ত পরিবেশ। যেখানে ভোরে বা বিকেলে রোদে নদীটির বাঁধ ধরে হেঁটে যাওয়া যায় বহু দূরে—কিংবা নৌকা নিয়ে নদী ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যায়—এই নদী বুড়িগঙ্গার বুকে! একটা সময় (নব্বই দশকে) আমাদের স্কুলজীবনে এই নদীতে বন্ধুরা মিলে নৌকাতে ঘুরে বেড়িয়েছি, শ্যামবাজার থেকে এক কাদি/ছড়ি কলা কিনে নৌকায় বসে তা খেতে খেতে গল্প করেছি, নদীর দুই পারের নানা চিত্র দেখেছি, জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখেছি! আজ সেই সব চিত্র কোথায় হারিয়ে গেছে! অতীত কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসি!

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যমে নানা সময়ে জানিয়েছেন এই নদী নিয়ে তাঁদের শঙ্কা ও পর্যবেক্ষণের কথা। প্রায় ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্যে অনেক আগেই বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে আট ফুট পুরু পলিথিনের স্তর। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, মাছ ও জলজ প্রাণী বসবাসের জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ পাঁচ মিলিগ্রাম বা তার বেশি থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, দ্রবীভূত হাইড্রোজেন মাত্রা কমপক্ষে সাত মিলিগ্রাম থাকা উচিত। অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোটায়।

1494576663-Image-04
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

এত দূষণ এবং দখলের মধ্যেও জীবন এখানে থেমে নেই! প্রতিদিন ঘরছাড়া, গ্রামছাড়া অসহায় মানুষের দল আশ্রয় নেয় এই নগরে। তাদের বসবাসের আশ্রয়স্থল হয় কখনো এই এলাকার কোনো বস্তিতে, এখানে-সেখানে বা অন্য কোথাও! বিপন্ন পরিবেশ, তবুও আশ্রয়হীন মানুষের আশ্রয় এখানেই—বেঁচে থাকতে হবে! ন্যায়-অন্যায় এখানে বিবেচ্য নয়—কখনই! নানা অপরাধ এখানে সংগঠিত হয়। পরিবেশগত কারণেই তা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। বড় কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে প্রশাসনের টনক নড়ে, আবার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং অসৎ প্রসাশনিক লোকজনের বদৌলতে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যান।

দখল হয়ে যাওয়া নদীর পারে গড়ে উঠেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক গলানোর কারখানা। ফেলে দেওয়া পলিথিন আর প্লাস্টিক এসব কারখানায় জড়ো করা হয়—তারপর তা আগুনে পোড়ানো হয়। দিনে-রাতে সারাক্ষণ এই এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়! এসব গলানো প্লাস্টিক আবার ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নতুন প্লাস্টিকের পণ্য। দীর্ঘদিন ধরেই এসব কারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পুরো এলাকা দূষিত হচ্ছে, দূষিত হচ্ছে বাতাস, বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগ। যাঁরা এলাকায় বসবাস করেন, তাঁরা অনেকটা অসহায় হয়ে বেঁচে আছেন। এলাকাটি ঘুরে চোখে পড়ল পরিবেশ বিপর্যয়ের নানা চিত্র! দখলদার আর ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বে চলছে—এই পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা! পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ, যাঁরা এসব দেখার দায়িত্বে আছেন—তাঁরা সত্যি কি তা দেখছেন? শুনেছি—নদী রক্ষায় সরকারের একটি টাস্কফোর্স আছে, সময়ে সময়ে তাঁরা জানান দেন, তাঁরা আছেন—শুধু টেবিলে আর খাতা-কলমে! তাঁদের মাঠে যাওয়ার মতো সময় হয় না।

আশার কথা শোনা যাচ্ছে, এ সরকারের সময়ে সম্প্রতি পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে পানি দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সরকারের আমলে এই রকম আশা বাণী শুনতে পাই কাজ হোক আর না হোক! সাধারণ জনগণ হিসেবে এই আশার ‘বাণী’ আমাদের ভরসা। জানি না, আবার কখনো এই মৃতপ্রায় নদী বুড়িগঙ্গা দখল, দূষণের জালমুক্ত হয়ে আবার প্রাণ সঞ্চারিত হবে কি না!

লেখক : সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী

নোট: লেখাটি এনটিভি বিডি ডট কম তাদের মতামত পাতায় প্রকাশ করেছেন । প্রকাশকাল ১২ মে ২০১৭