বাবা—শুভ জন্ম দিন . . .

18485997_10158731612315707_975768917675212026_n
আমার ছোট বাবা মেঘের আঁকা ছবি . . .

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতেই— ছোট মেঘ এবং তার ‘মা’ আমার কপালে ছোট একটা আদর দিয়ে, জন্ম দিনের শুভেচ্ছা জানালো ! আহা—ভালোবাসা ! গতকাল রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল— কাঁচ আর গ্রীল ঘেরা জানালার দিকে তাকিয়ে—সেই বৃষ্টি পরা দেখছিলাম ! মনে মনে ভাবছিলাম, আচ্ছা আমার এই পৃথিবীতে আগমনের সময়টা কখন ছিল—তখন কি বৃষ্টি ছিল আজকের মতো। নাকি অন্য কোন ক্ষণ ! রাত না দিন বা ঘড়ির কাটায় তখন কয়টা বেজে ছিল ? কে কে উপস্থিত ছিলেন তখন ? এতো গুলো বছর কেটে গেলে অথচ—আমার জন্ম বৃত্তান্ত জানা হলো না ! তা কি হয় ।

সকালে নাস্তার টেবিলে বসে, মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, আমার জন্মদিন সম্পর্কে ! মা—আমাকে বললেন, সব কিছু তোর বাবা’র ডাইরিতে লেখা আছে । মা’র কাছ থেকে বাবার ডাইরিটা নিয়ে পড়ে ফেললাম, আমার জন্মদিন নিয়ে, বাবা যা কিছু লিখে রেখে গেছেন ! বাবার সেই লেখার পাশাপাশি ‘মা’ আরো কিছু সংযোগ করলেন ।

আমার জন্মের সময় বাবা এবং বড়’মা ( নানীর ‘মা’ ) উপস্থিত ছিলেন । পুরান ঢাকায় আমাদের বাসাতেই আমার জন্ম । লক্ষী বাজার এলাকায় সবার পরিচিত এক দাই’মা ছিলেন, তার নাম ছিল—সরলা । সেই সরলা দাই’মা আমার জন্মের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন । ঘড়ির কাটার তখন রাত্রি—৩.১৫ মিনিট শনিবার, ১৬ মে, ১৯৭৫ বাংলা পহেলা জ্যৈষ্ঠ ১৩৮২ ছিল । আমার নিজের সম্পর্কে আরো জানলাম, আমার ওজন ছিল, আন্ডার ওয়েট ! আর আকারে খুব ছোট ! না তাহলে সেই ক্ষণটি বৃষ্টি ছিল না !

সকালে আমার ছোট বাবা—মেঘ, তার আঁকা একটা ছবি আমাকে উপহার দিল ! আমি বললাম কি এঁকেছ বাবা, উত্তরে সে বলল, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা আর ছবি ! মানে তোমার কাজের বিষয় গুলো আমি একেছি । আমি আমার পন্ডিত বাবা’টাকে আর একবার বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলাম !

ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার খুলতেই আমার কাছের এবং দুরের মানুষ গুলো শুভেচ্ছা জানিয়েছেন—আমার জন্মদিনে, সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এবং ভালোবাসা ।

কোন এক একুশের বই মেলা থেকে কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি কাব্য গ্রন্থ কিনেছিলাম—কবির সাথে দেখা হতেই, কবিকে অনুরোধ করেছিলাম— কিছু একটা লিখে দিতে ! কবি লিখলেন,আপাতত অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে ভালোবাসা ছাড়া কোনো উপায় দেখি না ।

সবার জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা . . .

১৬ মে ২০১৭
পুরান ঢাকা

আজ বিশ্ব “মা” দিবস . . .

Snapseed(33)
আমরা তিন ভাই বোন মায়ের সাথে | ছবি : মুরসালিন আব্দুল্লাহ মেঘ

আমার ফুপাতো বোন রুকসানা— গ্রামের বাড়ী হিজুলিয়া থেকে আমাদের ঢাকার বাসায় এসেছেন দিন/ দুই হলো । রুকসানা ফোনে জানিয়েছিল, মামীকে অনেক দেখতে ইচ্ছা করছে—কতো দিন মামীকে দেখি না। “মা” মারা যাবার পর মামীকেই “মা” বলে জানি ! আমি বললাম, তুই চলে আয় ঢাকায় । মা’র চোখের অপারেশন হবে, তুই থাকলে আমাদের ভালো লাগবে । গ্রামের বাড়ী গেলে আমার এই বড় ফুপুর কাছে অনেক আবদার থাকতো— পিঠা খাওয়া থেকে শুরু করে, পুকুরের মাছ, খেজুরের রস,গাছের পেয়ারা, নারিকেল সহ নানা কিছু ! আমাদের এই সমাজে খালা, ফুপু-রা মায়ের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ।

আজ বিশ্ব “মা” দিবস । আমার “মা” সহ পৃথিবীর সকল মায়ের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা । ফেসবুকে স্টাটাস দেওয়ার জন্য নয় বা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সাথে বসবাসকারী এই আমি শুধু গতানুগতিক “মা” দিবস পালনের জন্য নয় । আমার মন-প্রাণ, মেধা-মনন; কোন ভালো কিছুর সায় দিলে— আমি সেটা করার চেষ্টা করি, হয়তো শত ভাগ হয় না । কিন্তু আমি চেষ্টা করি ।

আসুন “মা”- কে ( যাদের “মা” বেঁচে আছেন ) একবার আদর করি, বুকে জড়িয়ে ধরে—একটু পাগলামী করি ! সেই ছোট্ট বাবুটি হয়ে যাই ! আমাদের ছোট “মেঘ” যেমন করে তার মা’কে জড়িয়ে ধরে আদর করে ! আহা ! মা-সন্তানের ভালোবাসা । পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভালোলাগার—একটি মুহূর্ত !

যাদের “মা” দূরে আছেন — ফোনেই না হয় মায়ের সাথে পাগলামীটা করি । যাদের “মা” এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের জন্য দোয়া করি—পরলোকে তাঁরা যেন ভালো থাকেন ।

সব মায়ের জন্য সুস্থতা কামনা করে দোয়া করি । সবাই ভালো থাকুন . . .

১৪ মে ২০১৭
পুরান ঢাকা

তবুও মানুষের আশ্রয় এখানেই . . .

photo-1494576732
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

খালপাড়ে পড়ে আছে কয়েক ফুট উঁচু নোংরা পলিথিনের স্তূপ—সেখানে মাছি উড়ছে! দুর্গন্ধ, কাছে যাওয়া যায় না! রয়েছে ঘোড়ার আস্তাবল। সরু খাল দিয়ে বয়ে যাওয়া—দগদগে কালা পানি! সেই কালা পানিতে ধোয়া হচ্ছে লন্ড্রির কাপড়! এটা বুড়িগঙ্গা নদীর শাখা খাল, কামরাঙ্গীরচরের প্রবেশ মুখের চিত্র।

একটা সময় এই খালটি বুড়ীগঙ্গা নদীর একটা চ্যানেল ছিল, এখন দখল হতে হতে তা সরু খালে পরিণত হয়েছে! এই খাল পার এলাকায় দেখা হলো কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে—বিকেলে তারা এখানেই ঘোরাফেরা করে, মানে খেলাধুলা। এই শিশুদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো, টুকটাক কথা হলো ওদের সঙ্গে—ওরা ছবি তুলতে চাইলে আমি ওদের ছবি তুললাম। চোখে পড়ল টিন দিয়ে ঘেরা কিছু ছোট ছোট ঘর। কিছু নারী শ্রমিককে দেখলাম—নোংরা পলিথিনের স্তূপের ওপর বসে কাজ করছেন। আমার সঙ্গে ক্যামেরা থাকায় তাঁরা কেউ কেউ মুখ ঢেকে ফেললেন। এঁরা সামান্য অর্থের বিনিময়ে সারা দিন পলিথিন ঘাঁটাঘাঁটি করেন। তাঁদের থেকে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম—চোখে পড়ল ব্রিজ! ব্রিজের নিচে বিকেলের রোদে বসে আছে একটি শিশু! মাটির নিজ দিয়ে বেরিয়ে আসা একটি ড্রেনের মুখ দিয়ে নোংরা পানি পড়ছে সরু খালটিতে—শিশুটি বসে বসে সেই পানি পড়া দেখছে! আরো চোখে পড়ল কিছু বেওয়ারিশ কুকুর! এরা সবাই এই বিষাক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠছে—ভাবলেশহীন সব প্রাণ! আমি বিকেলের আলোয় একের পর এক ছবি তুলে যাই! সব চোখ যেন আমার ক্যামেরাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে! কারো কারো চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখি! কেউ কেউ ভীত-সন্ত্রস্ত! সেদিন পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম—পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কামরাঙ্গীরচর ও এর আশপাশের এলাকায়

1494576626-Image-02
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

এই এলাকা বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে দখল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এলাকাটি ঘুরলেই তা চোখে পড়ে। আর এই দখল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সরকারি মদদপুষ্ট লোকজন, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! সময় সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, একদল চলে নতুনরা ক্ষমতায় বসেন, তখন দখল প্রক্রিয়ার চিত্রেরও বদল ঘটে!

মূল নদী থেকে শুরু করে নদীটির আশপাশের খাল, খানা-খন্দে পানির প্রবাহ দেখলেই বোঝা যায়, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে নদীর পানিতে কালো এক ধরনের তরল পদার্থ ভাসতে থাকে, পুরো শুকনো মৌসুম। মাদ্রাসার শিশুদের সঙ্গে নদীর পানি নিয়ে কথা বলতেই—ওরা জানাল এ সময়ে (শুকনো মৌসুমে) তারা এই নদীর পানি ব্যবহার করে না। ওরা জানাল—এই পানিতে গোসল করলে শরীর পচে যায়, ঘাসহ নানা ধরনের অসুখ হয়। এ সময় এলাকার কেউ নদীর পানি ব্যবহার করেন না। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি যখন কিছুটা ভালো থাকে—তখন তারা এই নদীর পানিতে গোসল করাসহ অন্যান্য কাজে তা ব্যবহার করে।

মিরপুর-গাবতলী এলাকা থেকে শুরু হয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমি, হাজারীবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর—এদিকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচ হয়ে লালকুঠি, শ্যামবাজার, পোস্তগোলা, পাগলা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা দখল আর নদী দূষণের চিত্র প্রায়—অভিন্ন। আমি বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষে নিমির্ত বেড়িবাঁধটির কল্পনায় আনি—না কোথাও খুঁজে পাই না এতটুকু দূষণমুক্ত পরিবেশ। যেখানে ভোরে বা বিকেলে রোদে নদীটির বাঁধ ধরে হেঁটে যাওয়া যায় বহু দূরে—কিংবা নৌকা নিয়ে নদী ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যায়—এই নদী বুড়িগঙ্গার বুকে! একটা সময় (নব্বই দশকে) আমাদের স্কুলজীবনে এই নদীতে বন্ধুরা মিলে নৌকাতে ঘুরে বেড়িয়েছি, শ্যামবাজার থেকে এক কাদি/ছড়ি কলা কিনে নৌকায় বসে তা খেতে খেতে গল্প করেছি, নদীর দুই পারের নানা চিত্র দেখেছি, জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখেছি! আজ সেই সব চিত্র কোথায় হারিয়ে গেছে! অতীত কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসি!

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যমে নানা সময়ে জানিয়েছেন এই নদী নিয়ে তাঁদের শঙ্কা ও পর্যবেক্ষণের কথা। প্রায় ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্যে অনেক আগেই বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে আট ফুট পুরু পলিথিনের স্তর। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, মাছ ও জলজ প্রাণী বসবাসের জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ পাঁচ মিলিগ্রাম বা তার বেশি থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, দ্রবীভূত হাইড্রোজেন মাত্রা কমপক্ষে সাত মিলিগ্রাম থাকা উচিত। অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোটায়।

1494576663-Image-04
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

এত দূষণ এবং দখলের মধ্যেও জীবন এখানে থেমে নেই! প্রতিদিন ঘরছাড়া, গ্রামছাড়া অসহায় মানুষের দল আশ্রয় নেয় এই নগরে। তাদের বসবাসের আশ্রয়স্থল হয় কখনো এই এলাকার কোনো বস্তিতে, এখানে-সেখানে বা অন্য কোথাও! বিপন্ন পরিবেশ, তবুও আশ্রয়হীন মানুষের আশ্রয় এখানেই—বেঁচে থাকতে হবে! ন্যায়-অন্যায় এখানে বিবেচ্য নয়—কখনই! নানা অপরাধ এখানে সংগঠিত হয়। পরিবেশগত কারণেই তা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। বড় কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে প্রশাসনের টনক নড়ে, আবার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং অসৎ প্রসাশনিক লোকজনের বদৌলতে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যান।

দখল হয়ে যাওয়া নদীর পারে গড়ে উঠেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক গলানোর কারখানা। ফেলে দেওয়া পলিথিন আর প্লাস্টিক এসব কারখানায় জড়ো করা হয়—তারপর তা আগুনে পোড়ানো হয়। দিনে-রাতে সারাক্ষণ এই এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়! এসব গলানো প্লাস্টিক আবার ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নতুন প্লাস্টিকের পণ্য। দীর্ঘদিন ধরেই এসব কারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পুরো এলাকা দূষিত হচ্ছে, দূষিত হচ্ছে বাতাস, বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগ। যাঁরা এলাকায় বসবাস করেন, তাঁরা অনেকটা অসহায় হয়ে বেঁচে আছেন। এলাকাটি ঘুরে চোখে পড়ল পরিবেশ বিপর্যয়ের নানা চিত্র! দখলদার আর ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বে চলছে—এই পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা! পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ, যাঁরা এসব দেখার দায়িত্বে আছেন—তাঁরা সত্যি কি তা দেখছেন? শুনেছি—নদী রক্ষায় সরকারের একটি টাস্কফোর্স আছে, সময়ে সময়ে তাঁরা জানান দেন, তাঁরা আছেন—শুধু টেবিলে আর খাতা-কলমে! তাঁদের মাঠে যাওয়ার মতো সময় হয় না।

আশার কথা শোনা যাচ্ছে, এ সরকারের সময়ে সম্প্রতি পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে পানি দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সরকারের আমলে এই রকম আশা বাণী শুনতে পাই কাজ হোক আর না হোক! সাধারণ জনগণ হিসেবে এই আশার ‘বাণী’ আমাদের ভরসা। জানি না, আবার কখনো এই মৃতপ্রায় নদী বুড়িগঙ্গা দখল, দূষণের জালমুক্ত হয়ে আবার প্রাণ সঞ্চারিত হবে কি না!

লেখক : সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী

নোট: লেখাটি এনটিভি বিডি ডট কম তাদের মতামত পাতায় প্রকাশ করেছেন । প্রকাশকাল ১২ মে ২০১৭

জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দুপুর এবং পিয়ারার মুখ . . .

img_1375.jpg
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দুপুর । মন বিষণ্ন করা সময় ! যাবো জাতীয় প্রেস ক্লাবে—পাভেল ভাইয়ের সাথে একটা মিটিং আছে । মিটিং শেষে যাবো বৌদ্ধ পূর্ণমার ছবি তুলতে, আজ শুভ বৌদ্ধ পূর্ণিমা । প্রতিদিনের সঙ্গী ক্যামেরা আর মোটরবাইক নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম—জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্দেশে ! 

আজ সরকারি ছুটির দিন । রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা, যানজট মুক্ত সড়ক । সচিবালয় এবং প্রেসক্লাব লিংক রোডটিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল, এক দল শ্রমিক সড়কটিতে কাজ করছেন ! সড়কটি সংস্কার করা হচ্ছে । সড়ক ও জনপদের অধীনে চলছে সড়ক সংস্কারের কাজ— ছুটির দিনে সরকারি সকল অফিস-আদালত বন্ধ থাকলেও—এই শ্রমিকদের ছুটি থাকে না ! তাদের কাজ করতে হয় । প্রতিদিন তাদের আয়-রোজগার করতে হয় । সংসার চালতে হয়—পেটের ক্ষুধা মিটাতে কাজ করতে হয় ! সারাদিন ঘাম ঝড়ানো শরীর নিয়ে কাজ করলে—দিন শেষে কিছু মজুরি আসে; সেটাই তাদের কাছে বেঁচে থাকার—একমাত্র অবলম্বন ! অনেক পরিশ্রমের টাকা ! কাজ শেষ করে টাকা পাওয়ার পর এক ঝলক—কষ্টের হাসি ! 

রোদে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের পাশে বসে কাজ করছেন—পিয়ারা বেগমক । বেশী সময় আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন না পিয়ারা । তার মুখ আগুনের তাপ লাগে, মুখটা ঘুরিয়ে তুষ দিতে থাকেন—আগুনের মুখে ! কথা হয় পিয়ারা বেগমের সাথে । সারাদিন কাজ করে ৪০০ টাকা মজুরি পান, আর পুরুষ পান ৬০০ টাকা ! তার দুই মেয়ে, এক মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, আর এক মেয়ে ছোট তার সাথে থাকেন—নারায়নগঞ্জ এর আড়াই হাজারে । স্বামী কি করেন জানতে চাইলে, ৩৫ বছর বয়সের পিয়ারা বলেন, স্বামী নাই ! তিনি তার মেয়ে নিয়ে থাকেন । প্রতিদিন অবশ্য এই মজুরের কাজ জোটে না । এরকম কাজ থাকলে, কন্টাকটার সুলতান তাদের খবর দেয় । আমি প্রশ্ন করি, এই কাজ না থাকলে কি করেন— উত্তরে পিয়ারা বলেন, বাসা-বাড়ীর কাজ করে পেট চালাই । সূর্যের তাপ আর আগুনের তাপে পুড়ে যাওয়া মুখটির দিকে আর একবার তাকাই— দেখে মনে হয় না উনার ৩৫ বছর বয়স ! মনে হয় ৪৫/৫০ বছর । পরিবেশ-প্রকৃতি এবং সমাজ ব্যবস্থা—তার লাবণ্য অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছে ! 

প্রিন্টের ছাপা দেয়া একটা কাপড় পরনে, দুই হাতে দুটি চুড়ি আর নাকে একটি নাকফুল পরা পেয়ারাকে বলি, আপনার একটা ছবি তুলি—ততক্ষণে তার পরিশ্রান্ত মুখটিতে এক আনন্দের ঝিলিক ছড়িয়ে পরে । বিদায় বেলা পিয়ারাকে বলি, আপনার মেয়েদের নিয়ে আপনি ভালো থাকবেন, নিজের অধিকার অর্জনে— জীবনযুদ্ধটা চালিয়ে যেতে হবে । জীবনযুদ্ধ থেকে পিছনে ফিরে আসার কোন অবকাশ নেই । কারণ এই জীবনটা আপনার । 

পাভেল ভাইয়ের সাথে মিটিং শেষ করে আমাকে দৌড়াতে হবে— বৌদ্ধ পূর্ণিমার ছবি তুলতে । গৌতম বুদ্ধ কোন একটা বাণী মনে করার চেষ্টা করি, মনে পরে যায় ছোট বেলায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে টারজান সিরিয়ালটি শুরুর আগে—বিটিভির অনুষ্ঠান শুরুর সময়, একজন ত্রিপিটক পাঠ করতেন, বাণী পাঠের শেষের লাইটি হলো—জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক . . . 
পুরান ঢাকা

১০ মে, ২০১৭ 

বরিশালের পথে পথে . . .

monl8591
১৮ দলের সমাবেশে আসা এক নারী, বেলস পাক, বরিশাল। ছবি:মনিরুল আলম

বরিশাল ক্লাব,পূব বগুড়া রোডের গেস্ট হাউস, প্যারারা রোড,বিবির পুকুর, হোটেল গাডেন ইন, সদর রোড ধরে বরিশালের বেলস পাক/বঙ্গবন্ধু উদ্যান অতপর ১৮ দলের জনসমাবেশ। এক দিনের এই ঝটিকা আগমনে শুধু এই জায়গা গুলোতেই যাওয়া হলো দেখা হলো না অনেক কিছু । যেমন আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ বসত ভিটা, আর এক জন প্রিয় মানুষ ফটোসাংবাদিক- শওকাত জামিল এই শহরেই ঘুমিয়ে আছেন- যাওয়া হলো না তার সমাধী স্থলে . . .

রবিবার ১৮ নভেম্বর/১২ খালেদা জিয়ার গাড়ীর বহরের সাথে ১৮দলের জনসমাবেশ কাভার করতে বিকেল চারটা নাগাদ রওনা হলাম বরিশালের উদ্যেশে- আমি ( মনিরুল আলম, ফটোসাংবাদিক প্রথম আলো), সাংবাদিক সেলিম জাহিদ, প্রথম অলো আর এবিসি রেডিও-র সাংবাদিক টিটু  । পথে পথে খালেদা জিয়াকে কে তার সমথকরা শুভেচ্ছা জানালেন ফুল দিয়ে। সাভার সড়কে শত শত গাঁদা ফুল পরে থাকতে দেখলাম ।মানিকগঞ্জ আসতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। বিএনপি-র  সাবেক প্রয়াত  মহাসচিব দেলোয়ার হোসেনের করব জিয়ারত করলেন খালেদা জিয়া।

আরিচার পাটুরিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে উঠতেই শত শত মানুষ লঞ্চ নিয়ে দাড়িয়ে আবারো তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে । দেখলাম বিএনপির দলীয় পতাকা দিয়ে সাজানো লঞ্চ। পদ্মা নদীর  বাতাসে সেই সব পতাকা পতপত করে উড়ছিল আর অন্ধকার ভেদ করে সেই পরিচিত স্লোগান- খালেদা জিয়া এগিয়ে  চলো, আমরা আছি তোমার সাথে।

ততোক্ষণে রাত নামতে শুরু করেছে। এই রাতেও মানুষ তাদের নেতার জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে ছিল। বরিশাল শহরে এসে পৌছালাম আনুমানিক রাত ১২ টার সময় । খালেদা জিয়াকে  বরণ করে নিলো শত শত নেতা-কমী। বরিশাল সাকিট হাউস এ খালেদার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অতপর আমারা বরিশাল ক্লাবে রাতের খাবার  শেষ করলাম। আমার ইনসুলেন নেয়া হলো না। কোন হোটেল না পাওয়ায অবশেষে মিরণ ভাই এর এক পরিচিত গেষ্ট হাউস এ থাকার ব্যাবস্থা হলো আমাদের। ঐ রাতেই মিরণ ভাইকে নিয়ে এক বার সমাবেশ স্থল ঘুরে এলাম। আগে থেকেই দেখে নিলাম উচচু ভবন আছে কিনা  যেখান থেকে পুরো প্রাঙ্গণের ছবি তোলা যাবে। ফিরে এলাম গেষ্ট হাউস-এ সারাদিনের ক্লান্তি কাটাতে এখন একটা ঘুম অতপর সকালের জন্য কর্ম পরিকল্পনা।

ভাজি পরাটা আর ডিম দিয়ে সকালে নাস্তা শেষ করলাম। পেটের অবস্থা ভালো না কি কারণ বুঝতে পারলাম না। সেলিম জাহিদের  ও একই অবস্থা। রাতে অবশ্য গাড়ীতে বসে  অনেক গুলো চানাচুর খেযেছিলাম আর ফেরিতে ঝালমুড়ি সেথান থেকে পেট খারাপ হলো কিনা কে জানে ।  মিরণ ভাই এর সাথে ফোনে যোগাযোগ হলো  হাটতে হাটতে চলে এলাম প্রথম আলোর প্যারারা রোডের অফিসে। এখানে আমার আগে আসা হয়নি তবে এর আগে নদী পথে এসেছি সিডর কাভার করতে তখন অফিসে আসা হয়ে উঠেনি।

সমাবেশ নিয়ে আলোচনা শুরু হলো কে কোথায় কি ভাবে কাভার করবো। দুটার আগেই মাঠে প্রবেশ করতে হবে তা না হলে ভিতরে প্রবেশ করা কষ্ট হয়ে যাবে । সবাই আশা করছেন এই  সমাবেশএ বিএনপি প্রচুর লোক সমাগম ঘটাবে। খবর পাওয়া গেল ইতিমধ্যে ট্রলার দিয়ে আশেপাশের এলাকা থেকে প্রচুর লোক আসতে শুরু করেছে। আমরাও নিজেদের প্রযোজনীয় কাজ সেরে সমাবেশ স্থলের দিকে পা বাড়ালাম।

কখনো ছোট ছোট আবার কখনো বড় বড় মিছিল নিয়ে ১৮ দলের সমথকদের সমাবেশ স্থলে আসতে দেখলাম। কেউ কেউ বলতে শুরু করলেন এটা বরিশালে এই সময়ের জন্য বড় সমাবেশ বিএনপির জন্য নিবাচন উত্তর বড় শো-ডাউন। প্রধান প্রধান সড়কে খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া এবং স্থানীয় নেতাদের ছবি বড় বড় পোষ্টার আকারে টানানো হয়েছে সেই সাথে অনেক অনেক  তোরণ বানানো হয়েছে।  বেলস পাকে প্রবেশ করতেই দেখলাম ইতিমধ্যে পুরো মাঠ মানুষে মানুষে সয়লাব পোষ্টার  আর ডিজিটাল ব্যানারে ভরে উঠেছে মাঠ প্রাঙ্গণ।  আর  একটু পরেই খালেদা জিয়া মঞ্চে উঠলেন উপস্থিত জনতা তাকে করোতালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন সেই সঙ্গে স্লোগান- প্রতি উত্তরে খালেদা হাত নেড়ে তার জবাব দিলেন।

মঞ্চ থেকে খালেদার ছবি তুলে চলে গেলাম টপ ছবি তোলার জন্য স্থানটি আগেই ঠিক করা ছিল। বরিশাল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ এর ছাদে মঞ্চের পিছনে থাকায় খুব বেশী কষ্ট হলো না। ছাদের উপরে দেখলাম পুলিশ সদস্যরা রাইফেল হাতে নিরাপত্তার কাছে নিযোজিত আছেন। উচু ভবনে উঠলে একটা অনুমান করা যায় সমাবেশে কতো লোক সমাগম হয় । আমার ধারণা ঠিক হলো পুরো মাঠ লোকেলোকারণ্য সেই সাথে পাশের সড়ক গুলোতে ।  ছাদ থেকে বেশ কিছু ছবি তুল্লাম । ছবি অনলাইন এর জন্য পাঠাতে হবে ল্যাবটপ অন করে ছবি পাঠাতে শুরু করলাম। এখানে সিটি সেলের ইন্টারনেট লাইন ভালো কাজ করছে।

খালেদা জিয়া প্রায় ৩৪ মিনিট বক্তব্য রাখলেন। মূল বক্ত্যবের সারসংক্ষেপ হলো আর একবার ক্ষমতা যাওয়ার জন্য সাধারন মানুষের কাছে অনুরোধ । আর একবার তার দলকে সুযোগ দিলে পুরো দেশের অবস্থা পান্টে দিবেন। বরাবরের মতো আবারো আওয়ামী লীগ এর কঠোর সমালোচনা করলেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া।

ঢাকা থেকে আমার পরিচিত সাংবাদিক যারা গিয়েছেন তাদের সাথে দেখা হলো কথা হলো সমাবেশ কাভার করে তারাও আজই ফিরবেন খালেদার সাথে। সমাবেশ শেষ হলে আমরাও ছুটে চল্লাম অফিসের দিকে সংবাদ এবং ছবি পাঠাতে হবে ঢাকায়।

প্যারারা রোডের সেই অফিসে তখন অন্য রকম ব্যস্ততা সেই সাথে লাল চা, ছোট ছোট লুচি আর ভাজি এবং মিরণ ভাই এর অনবসন্ন ভালোবাসা। ছবি, স্ংবাদ আর নেপথ্যের খবর পাঠানো শেষ হলে  আবার সেই চিরচেনা ঢাকায় উদ্দেশ্যে রওরা দিলাম সেই রাতেই।

বরিশাল, প্যারারা রোড

সোমবার ১৯ নভেম্বর ২০১২

১০ অগ্রহায়ণ ১৪১৯