Kirsten Claire (English Photographer) ছিলেন। তিনি পাঠশালায় প্রথম দিকে আমাদের ফটোগ্রাফির শিক্ষক ছিলেন। ফটোগ্রাফির বাইরেও তাঁর কাছ থেকে শেখার মতো অনেক কিছু ছিল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল নিয়মিত ডায়েরি লেখার অভ্যাস। তাঁর মনটা ছিল অসাধারণ সুন্দর। নিজের জানা বিষয়গুলো খুব সুন্দর ও ব্যতিক্রমীভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন।
তিনি আমাকে ডাকতেন ‘মনি’ বলে ! মনির—নামটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারতেন না— সে আমাদের বলতেন ‘নিয়মিত ডাইরি লিখবা, এটা তোমাদের অনেক কাজে লাগবে!’ কিন্তু তখন আমার বাউন্ডুলে স্বভাবের কারণে সেই পরামর্শ আর নিয়মিত মেনে চলা হয়ে ওঠেনি। তবে একটু একটু লিখতাম ।
ফটোগ্রাফির নানা বিষয়ের পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে আরও একটি মজার বিষয় শিখেছিলাম—কোলাজ ফটোগ্রাফি। তাঁর কাজের ধরন ছিল একধরনের স্বতন্ত্র শৈল্পিকতা। পরে তাঁর কাজের ধারা কিছুটা ফটোসাংবাদিকতার দিকে মোড় নিয়েছিল বলে আমার মনে পড়ে। তবে তাঁর শৈল্পিক কাজগুলোই আমার কাছে বেশি ভালো লাগত। প্রতিটি ছবির ছিল নিজস্ব আবেদন, আর ছবির ভেতরের গল্পগুলো ছিল অসম্ভব আকর্ষণীয় ।
সময়ের সঙ্গে অনেক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের শেখানো কথা, তাঁদের কাজের সৌন্দর্য আর আন্তরিকতা মনের গভীরে থেকে যায়। Kirsten Claire আমার কাছে তেমনই একজন শিক্ষক।
কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা, আমার শিক্ষক Kirsten Clair কে . . .
🎙️ একটি ছবি একটি মুহূর্তকে তুলে ধরতে পারে; আর ধারাবাহিক কয়েকটি ছবি একটি গল্প বলতে পারে। ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং হলো ছবির মাধ্যমে একটি গল্প বলার একটা শিল্প। নতুন যারা ফটোগ্রাফি করছেন তাদের জন্য ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং একটা ধারণ দেওয়া হলো। আপনার ফটোগ্রাফির প্রথম প্রজেক্টের সাফল্য কামনা করি ।
বাংলাদেশ জুড়ে ফুটে উঠেছে কাশফুল . . .
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতিতে শরৎ আসে যেন এক নীরব কবিতার মতো—অসীম নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা, আর বাতাসের মৃদু দোলায় দুলতে থাকে শুভ্র কাশফুল। বাঙালির কাছে কাশফুল শুধু ঋতুর একটি ফুল নয়; এটি শরতের এক চিরন্তন প্রতীক—নীরবে জানান দেয়, শরৎ এসে গেছে।
কোলাজ ফটোগ্রাফি অর্থের দিক থেকে বলতে গেলে যা আমি বুঝি তা হলো একাধিক ছবি জোড়া লাগানো সেটা নানা ভাবে হতে পারে। ফটোগ্রাফিতে কোলাজ বলতে বোঝায় একাধিক ছবি বা ছবির অংশকে একত্র করে একটি নতুন ছবি বা ভিজ্যুয়াল গল্প তৈরি করা। এটা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হতে পারে আবার বিভিন্ন সফটওয়্যার বা অ্যাপ ব্যবহার ব্যবহার করে তৈরি করা যেতে পারে। যা একটি সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে ।
আরো বিস্তারিত ভাবে বলতে গেলে একটি কোলাজ শুধু অনেকগুলো ছবি পাশাপাশি সাজানো নয়; বরং এটি এমন একটি সৃজনশীল মাধ্যম, যেখানে বিভিন্ন ছবি, রং, আকৃতি ও উপাদান মিলিয়ে নতুন অর্থ, অনুভূতি বা গল্প প্রকাশ করা হয়।
কোলাজ ফটোগ্রাফি মাধ্যম ব্যবহার করে আমরা অসাধারণ সব গল্প একই ফ্রেমে তৈরি করতে পারি । কোনো ঘটনা বা ভ্রমণের বিভিন্ন মুহূর্ত একসাথে দেখাতে। শিল্পসুলভ ও সৃজনশীল উপস্থাপনা তৈরি করতে। স্মৃতি সংরক্ষণের একটি আকর্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন কনটেন্ট তৈরি করতে কোলাজ ফটোগ্রাফি অসাধারণ একটি আইডিয়া ।
উদাহরণস্বরূপ, কারো জন্মদিন উপলক্ষে নানা ছবি তুলে সেই ছবি গুলোর বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি জোড়া লাগিয়ে একটি ফ্রেমে তা সুন্দর করে উপস্থাপন করা যায় । অথাৎ যার জন্মদিন তাকে কেন্দ্র করে নানা মুহূর্তের ছবি তুলে তাকে নিয়ে একটা সৃজনশীল গল্প বলা ।
আবার ভিন্ন একটা আইডিয়া নিয়েও কাজ করা যেতে পরার যেমন—একটি গ্রামের হাট নিয়ে কাজ করলে আপনি শুধু একটি ছবি না দেখিয়ে হাটের মানুষ, পণ্য, পরিবেশ, ক্রেতা-বিক্রেতা এবং আশপাশের দৃশ্য একত্রে কোলাজে উপস্থাপন করতে পারেন। এতে দর্শক পুরো পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পায়।
নিচে কিছু আইডিয়া শেয়ার করলাম যাতে আপনারা এই বিষয়ে আগ্রহ থাকলে এই সব বিষয়ে নিয়ে কাজ করতে পারেন । যেমন :
প্রকৃতি ভ্রমণ শহুরে জীবন গ্রামীণ জীবন একটি উৎসব একটি ব্যক্তির জীবনধারা ফটোগ্রাফি প্রজেক্ট
ফ্রেমটি সাজানো ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ছবিগুলো এমনভাবে সাজান যেন দর্শকের চোখ স্বাভাবিকভাবে এক ছবি থেকে অন্য ছবিতে যায়। অথাৎ প্রধান ছবি বড় রাখুন, গুরুত্বপূর্ণ ছবিটি কেন্দ্রে রাখা, রঙ ও আলোতে সামঞ্জস্য ছবি সাজানো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্যই অতিরিক্ত ছবি দিয়ে ফ্রেমটির মূল আবেদন যাতে হারিয়ে না যায় সেই দিকে খেয়াল রাখা এবং ফ্রেমটিতে টেক্সট বা গ্রাফিক্স যোগ করা যেতে পারে তবে খুব বেশি না । সাধারণত ৬/১২টি ছবি দিয়ে একটি সুন্দর কোলাজ করা যায় ।
পরিশেষে কোলাজ ফটোগ্রাফির মূলমন্ত্র যদি আমি বলতে চাই তা হলো—একটি ছবি একটি মুহূর্তকে দেখায়, কিন্তু একটি কোলাজ অনেক মুহূর্তকে একত্র করে একটি সম্পূর্ণ গল্প বলে। তাই কোলাজ ফটোগ্রাফিতে শুধু সুন্দর ছবি তোলাই যথেষ্ট নয়; ছবিগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হয় যেন তারা একসঙ্গে মিলে একটি অর্থবহ গল্প, অনুভূতি বা বার্তা প্রকাশ করে।
Photojournalism করতে এসে সেই কাজ আর এখন নিয়মিত করা হয়ে উঠে না । তবে মজার ব্যাপার হলো বর্তমানে এই কাজ গুলো ডিজিটাল ফর্মে অনেক সহজে করা সম্ভব । যদিও আ্যনালগ ফর্মের আবেদনটি এখনো হারিয়ে যায়নি । সময় সুযোগ হলে এই কাজ গুলো এখনো আমি করি ।
লেখার নোট : যতোদূর মনে পরে Kirsten Claire পাঠশালায় যোগদান করার আগে আমরা দৃক-পাঠশালার আয়োজন পলিহোপ নামের একজন ব্রিটিশ আর্টিস্ট এক কর্মশালায় করেছিলাম । সেখানে কোলাজ ফটোগ্রাফি নানা দিক নিয়ে আমরা কাজ করেছিলাম। সেটা কাজ গুলো দৃক গ্যালারিতে একটি প্রদর্শিত হয়েছিল ।
পাঠশালায় ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করার সময় Kirsten Claire একজন English Photographer পাঠশালার প্রথম নিয়মিত শিক্ষক ছিলেন । ফটোগ্রাফি অন্যনা বিষয় গুলোর সাথে আরো একটা মজার বিষয় শিখেছিলাম—কোলাজ ফটোগ্রাফি ।
পরাবাস্তববাদী (Surreal Photography) ফটোগ্রাফি হলো এমন এক ধরনের আলোকচিত্র, যা দেখতে বাস্তব মনে হলেও তার ভেতরে থাকে স্বপ্ন, কল্পনা, রহস্য কিংবা অসম্ভব কোনো দৃশ্য। এই ধরনের ছবি আমাদের পরিচিত বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করে নতুন এক ভাবনার জগতে নিয়ে যায়।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যে ছবি বাস্তবের নিয়ম মানে না, কিন্তু দেখতে একেবারে বাস্তব মনে হয়—সেটাই পরাবাস্তববাদী ফটোগ্রাফি।
এই ধরনের ছবি দেখলে দর্শক প্রথমে অবাক হয়, তারপর ছবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থ বা বার্তা খুঁজতে শুরু করে। কিছু সহজ উদাহরণ :
একজন মানুষ আকাশে ভাসছে।
মাছ পানির বদলে আকাশে উড়ছে।
কারও ছায়া তার শরীর থেকে আলাদা হয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
একটি গাছের ডালে ফলের বদলে ঝুলছে ঘড়ি।
একজন মানুষ নিজের ছোটবেলার সঙ্গেই কথা বলছে।
এসব দৃশ্য বাস্তবে সম্ভব নয়। কিন্তু ছবিতে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মনে হয় ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটছে।পরাবাস্তববাদী ছবি তৈরির কিছু পদ্ধতি নিচে আলোচনা করা হলো:
উদাহরণস্বরূপ, একটি শিশুর ছবি এবং একটি বিশাল চাঁদের ছবি একত্রিত করে এমনভাবে সাজানো যায়, যেন শিশুটি চাঁদের উপর বসে আছে।
কেন পরাবাস্তববাদী ফটোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ?
পরাবাস্তববাদী ফটোগ্রাফি শুধু সুন্দর ছবি তৈরি করার জন্য নয়; এটি মানুষের কল্পনা, অনুভূতি, স্বপ্ন, ভয়, আশা কিংবা মনের গভীর চিন্তাগুলোকে প্রকাশ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। অনেক সময় একটি পরাবাস্তব ছবি হাজার শব্দের চেয়েও গভীর বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
সংক্ষেপে বলা যায়, পরাবাস্তববাদী ফটোগ্রাফি হলো বাস্তবতা ও কল্পনার এক অনন্য মেলবন্ধন, যেখানে অসম্ভবকে সম্ভব বলে মনে হয় এবং দর্শককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
একটি সহজ উপমা: যেমন স্বপ্নে আমরা অনেক অসম্ভব ঘটনা দেখি—কখনও উড়ে বেড়াই, কখনও সমুদ্রের তলায় হেঁটে বেড়াই। পরাবাস্তববাদী ফটোগ্রাফি ঠিক সেই স্বপ্নের জগতকে ছবির মাধ্যমে বাস্তবের মতো করে দেখানোর একটি শিল্প।
সমকালীন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবি শুধু দৃশ্যমান উপাদান নয়—এটি এক ধরনের ভাষা, যা পাঠ করা যায়, ব্যাখ্যা করা যায় এবং অনুভব করা যায়। যে ছবি পাঠকের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করতে পারে না, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কেবল সংবাদের প্রয়োজনে জোর করে ছাপা কোনো ছবি যদি অর্থবহ বার্তা বহন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা পাঠকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারে না। তাই সময়ের দাবি অনুযায়ী ভিজ্যুয়াল তথ্যের পাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ছবিটি তুলেছেন হাফিজুন নাহার / সৌখিন আলোকচিত্রী এপ্রিল ২০২৬
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের ফটোসাংবাদিকদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাজের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তাদের অনেকের কাজেই উচ্চমানের নান্দনিকতা ও গভীরতা বিদ্যমান। এই ছবিগুলো শুধু তথ্য পরিবেশন করে না; বরং এর ভেতরে থাকে শৈল্পিক প্রকাশ, যা প্রচলিত ক্লিশে ধারা অতিক্রম করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। অনেক সময় এই ছবিগুলো দর্শককে গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়, বাস্তবতার নিবিড় স্তরগুলো উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি শক্তিশালী ছবি তখনই সফল হয়ে ওঠে, যখন তা একইসঙ্গে গ্রহণযোগ্য, অর্থবহ এবং পাঠকপ্রিয় হয়। একজন দক্ষ ফটোসাংবাদিকের কাজ কেবল ছবি তোলা নয়, বরং এমন একটি দৃশ্য নির্মাণ করা—যা দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। আজকের তরুণ ফটোসাংবাদিকদের কাজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে, যা এই পেশাকে আরও সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তুলছে।
ছবির নোট : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদে নিউজ কাভার করত সময় তোলা হয়েছিল ।। ছবিটি তুলেছেন হাফিজুন নাহার / সৌখিন আলোকচিত্রী এপ্রিল ২০২৬
ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়া মনিরুল আলম / ফটোগ্রাফার, শিক্ষাবিদ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকা
আলোকচিত্রের আবিষ্কারের পর থেকেই এটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির এক শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বিস্তার ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে বহুগুণ—বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারে তা আজ আরও দৃশ্যমান।
ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি— এই মাধ্যমের এক গভীরতর রূপ, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অভিজ্ঞতার সেতুবন্ধন রচনা করে। একটি ছবির ভেতরে লুকিয়ে থাকে সময়,প্রেক্ষাপট ও অনুভবের স্তরবিন্যাস। তাই একটি ছবির গুরুত্ব শুধু ধারণে নয়, তার পাঠেও। যে চোখ দেখে, তারও দায় আছে ছবিটিকে বোঝার—ঠিক ততটাই, যতটা দায় থাকে আলোকচিত্রী’র।
আজকের সমাজে এই মাধ্যমের ব্যবহার সহজলভ্য। প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাক বা না থাক, মানুষ ছবি তুলে, ভাগ করে নেয়, সংরক্ষণ করে স্মৃতি। আমার মনে হয়, এই সহজলভ্যতাই এর বড় সার্থকতা—বিশেষ করে কর্পোরেট জগতে এর প্রয়োগ তা আরও সুসংহত করেছে। তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত থাকতেই পারে, এবং সে ভিন্নতাকে আমি সম্মান করি।
নোট: ফটোগ্রাফি বিষয়ক বোঝাপড়া লেখালেখি গুলো চলমান থাকবে । ফটোগ্রাফি নিয়ে নানা ধরনের লেখা, ছবি আলোচনা এখানে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলবে । সঙ্গে থাকার জন্য অনুরোধ রইল । সবার জন্য শুভকামনা । 📷🙏
ছবির নোট : বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের আলোর স্কুলের ফটোগ্রাফি কোর্সের ক্লাস চলাকালীন সময়ে ছবিটি তুলেছেন মেজবাহ সুমন / আলোকচিত্রী, সংগঠক ।
ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়া মনিরুল আলম / ফটোগ্রাফার, শিক্ষাবিদ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকা
[ ছয় ] ফটোগ্রাফী আবিষ্কারের সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই মাধ্যমটিতে ছবি পরিবেশন, উপস্থাপন নিদিষ্ট একটা গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর ব্যাপ্তী সকল স্তরে ( শিল্প-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি রাজনীতি-অর্থনীতি ) সঞ্চারিত হয়েছে— হচ্ছে । যেমনটা বর্তমান সময়ে ব্যবহার করা Virtual Reality (VR) journalism প্রযুক্তি একটা উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে । বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম ইতিমধ্যেই এর ব্যবহার শুরু করেছে ।
‘ঢেউ’ এর এই প্রোট্রেট ছবিটি তোলার ক্ষেত্রে Slow shutter photography বা Long exposure photography technique ব্যবহার করা হয়েছে । আমি এই ছবিটি তোলার ক্ষেত্রে Motion Blur Movement Technique ব্যবহার করেছি । ক্যামেরার সাথে অতিরিক্ত equipments হিসাবে একটা Camera tripod stand এবং Torch light ব্যবহার করেছি, রাতের বেলা ছবিটি indoor তোলা হয়েছে ।
এই long exposure বা slow shutter পদ্ধতি ব্যবহার করে আপনি অনেক ধরনের ছবি তুলতে পারেন যেমন— Motion Blur, Camera Panning, Light Trails, Light Painting, Stat Trails বা Ghost Effect ইত্যাদি । DSLR বা Mobile ক্যামেরা যন্ত্র চালানোর সাধারন জ্ঞান ( বেসিক ফফোগ্রাফী ) জানা থাকলেই, এইসব ছবি খুব সহজে তোলা সম্ভব . . .
[ পাঁচ ] যে কোন কাজের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সেই কাজটি ভালো ভাবে, সহজ ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব । আমরা সবাই কম-বেশী এই সহজ সত্যটা জানি । ফটোসাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই সহজ সত্যটা জানা এবং তা পালন করা খুব জরুরি, বিশেষ করে যারা নতুন ফটোসাংবাদিক ( Visual Journalist ) হিসেবে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কাজ করছেন ।
আ্যসাইনমেন্টে যাওয়ার আগে আপনি কি ধরনের কাজে যাচ্ছেন, সেই কাজ সম্পর্কে আপনার পরিষ্কার একটা ধারণা থাকার পাশাপাশি আপনার ক্যামেরা ব্যাগটি পুনরায় পরীক্ষা ( recheck ) করে নেওয়া উচিত । যেমন ক্যামেরা, CF or SD card, card reader, ক্যামেরা ব্যাটারি, লেন্স, ক্যামেরা ষ্ট্যান্ড ( ভিডিও করার ক্ষেত্রে ) ল্যাপটপ ( যদিও বর্তমানে ঘটনাস্খল থেকে ছবি, ভিডিও পাঠানোর জন্য মোবাইল প্রযুক্তি যথেষ্ট ) ফ্লাশ, ফ্লাশের ব্যাটারি, আপনার প্রেস আইডি, অর্থাৎ আপনার অফিসের পরিচয়পত্র । বিশেষ আ্যসাইনমেন্ট কাভারেজ করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ইস্যুকৃত অনুমতি পত্র ।
নিউজ কিংবা ফিচার আপনি যেই ছবি তুলতে যান না কেন—সময় এবং আপনার যাতায়াতের জন্য আপনি কোন ধরনের যান ব্যবহার করছেন, তা বিবেচনা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ ! একটা কথা ফটোসাংবাদিকতায় প্রচলিত আছে, আপনি যদি সঠিক সময় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেন, আপনার ৭৫% কাজ শেষ হয়ে গেল, বাকি সময়টা ছবি তোলা, সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং ছবি পাঠানো কাজটি করা । একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফটোসাংবাদিক অতি সহজেই এই কাজটি করতে পারেন ।
বর্তমানে মোবাইল ফোন ছাড়া আমাদের যেমন এক মুহূর্ত চলে না, ঠিক ফটোসাংবাদিকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তাই, যেহেতু কারো কারো বিশেষ করে অন-লাইন নিউজ গুলোর জন্য ঘটনাস্খল থেকে ছবি পাঠাতে হয়, তাদের জন্য অবশ্যই মোবাইল ডাটার পরিমাণ, পাওয়ার ব্যাংক, চার্জার সঙ্গে থাকার পাশাপাশি ক্যামেরা থেকে ছবি, ভিডিও মোবাইলে স্থানান্তরের জন্য ডাটা ক্যাবল ( ওটিজি ক্যাবল ) বা Wi-Fi সম্বলিত প্রযুক্তির ক্যামেরা কিংবা কোন মোবাইল আ্যপ ( সফটওয়্যার ) থাকা জরুরি, যা দিয়ে অতি সহজেই আপনি আপনার ক্যামেরা থেকে মোবাইলে ছবি,ভিডিওটি স্থানান্তর করতে পারেন ।
যা পরবর্তীতে মোবাইলের ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহার করে আপনার ছবি বা ভিডিওটি নিউজ ডেস্কে,পিকচার ডেস্কে পাঠাতে পারেন, পরবর্তী সম্পাদনা এবং প্রকাশনার জন্য । এই ক্ষেত্রে ফোনে বা ই-মেইল করে আপনার ডেস্ক-কে জানাতে হবে, এবং নিশ্চিত হতে হবে তারা আপনার ছবি, ভিডিও গুলো পেয়েছে কিনা ।
আজ এতোটুকু লিখে শেষ করতে চাই । একটা কথা প্রত্যেক ফটোসাংবাদিকদের আবার মনে করিয়ে দিতে চাই. বিশেষ করে যারা নতুন ফটোসাংবাদিক হিসাবে কাজ করছেন, Your advance planing is a key to makes more good pictures . . .
নোট: এ বছর জুলাইতে বন্যার পরিস্থিতির ছবি তুলতে পদ্মা নদী ও এর আশেপাশের এলাকায় পরিদর্শন করেছিলাম। ছবিটি তুলেছেন প্রথম আলোর সাংবাদিক ইকবাল রতন ভাই ।
সমকালীন সময়ে সংবাদ মাধ্যমে ( ছাপা হওয়া ছবি ) যে ছবি পাঠ করা যায় না, সেই ছবির পাঠক গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ থাকে। সংবাদের স্বার্থে জোর করে ছাপা হওয়া ছবিটির কোন অর্থবহতা থাকে না । সময়ের প্রযোজনে ভিজুয়াল তথ্যের পাঠ অতন্ত জরুরী বলে মনে হয় ।
বর্তমান সময়ে আমাদের দেশের ফটোসাংবাদিকদের বিশেষ করে, যারা তরুণ ফটোসাংবাদিক হিসাবে কাজ করছেন, তাদের কারো কারো কাজ আমার কাছে বেশ উঁচু মানের বলে মনে হয়। আমি তাদের কাজের মধ্য ভিজুয়াল তথ্যের পাশাপাশি ছবির মধ্য এক ধরণের শৈল্পিক প্রকাশ দেখতে পাই—যা ক্লিশে ছবিকে অতিক্রম করে যায়।কখনো কখনো নিবিষ্ট সত্যেকে পড়তে শিখায় ।
সংবাদ মাধ্যমে ছাপা হওয়া ছবিটির গ্রহনযোগ্যতা, অর্থবহতা এবং পাঠক প্রিয়তা পায়।একজন সার্থক ফটোসাংবাদিক হিসাবে নিজের কাজটি সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় ।আজকাল তরুণ এই ফটোসাংবাদিকদের কাজ, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত, যা ফটোসাংবাদিকতার পেশাকে অনুরত করে।
সেদিন গিয়েছিলাম বুড়ীগঙ্গা নদীর পাড়ে গরুর হাটের ছবি তুলতে; আমার সঙ্গী হয়েছিল—ছোট মেঘ । বাপ-বেটা মিলে পোস্তগোলা এলাকায় বিকেলের রোদে নদীর পাড় দিয়ে বেশ হেঁটে বেড়ালাম— দেখা হলো গরুর হাট; ছবি তোলা হলো । সামনেই কোরবানীর ঈদ; ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বুড়ীগঙ্গা নদী হয়ে কোরানির গরু ঢাকায় আসছে। এ ঘাটেও কিছু কিছু গরু নামানো হচ্ছে । একজন গরুর ব্যাপারীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কোন এলাকা থেকে গরু নিয়ে এসেছেন, সে জানালো ফরিদপুর থেকে ।
বর্ষার পানিতে বুড়ীগঙ্গা নদীর অন্যরকম সৌন্দর্য আমার চোখ এড়ালো না ! নদীর পাড়টিতে ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে; সূর্যের আলোতে সেসব ঢেউ গুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল ! আমি চিন্তা করলাম— এখানে খুব সুন্দর সিলুয়েট ( Silhouette ) ছবি হয় । আসলে সিলুয়েট ফটোগ্রাফী করতে যা যা দরকার তার সব এলিমেন্ট গুলো এখানে খুঁজে পেলাম । আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখন কিছু সিলুয়েট ছবি তুলবো ।
সিলুয়েট ছবি তোলার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে তা হলো — আপনি যে বিষয়বস্তু বা যার ছবি তুলছেন আলোর উৎসটি তার পিছনে থাকতে হবে । ব্যাকগ্রাউন্ডের আলো এবং স্পেসকে প্রাধান্য দিয়ে ছবি তুলতে হবে; ফোরগ্রাউন্ডকে না । ফ্রেমিংটা এমন ভাবে করতে হবে; যাতে আপনার বিষয়বস্তুটির শুধু ‘কালো একটা আউটলাইন’ তৈরি হয় । সহজ করে বললে— সাধারন নিয়মে আমরা ছবি তুললে ক্যামেরার পিছনে আমাদের আলোর উৎসটি থাকে আর সিলুয়েট ছবি ক্ষেত্রে আলোর উৎসটি হবে বিষয়বস্তুর পিছনে । আউটডোর সিলুয়েট ছবি তোলার জন্য ফাঁকা জায়গা, আকাশ, নদী, সমুদ্রের তীর উপযুক্ত । আর একটা কথা low angle of view হলে ভালো হয় ।
সিলুয়েট ছবির অর্থবহতা নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে আমি বললো— এই ধরণের ছবি গুলো আমাদের মূল গল্পটা পরিষ্কার করে না কিন্তু দর্শক বা পাঠককে এক ধরণের কল্পনার জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় . . .