অনুভূতি . . .

ছবি থেকে একটি আ্যপের সাহায্য নিয়ে এই স্কেচটি করা । স্কেচ & ছবি: মনিরুল আলম

তিনি আমাকে মটরসাইকেলে করে বাজারে নিয়ে এলেন । এটি একটি গ্রাম্য—ছোট বাজার । বাজারের চায়ের দোকানটিতে প্রবেশ করেই দুই কাপ চায়ের জন্য বলা হলো । আমি দেখলাম— বেশ বড় সাইজের তিনটি কেটলিতে চা বানানো হচ্ছে, মাটির চুলাটিতে। কেটলি তিনটি আগুনে পুড়ে পুড়ে ভিন্ন একটা রঙ ধারণ করেছে। এই দোকানটিতে যে প্রচুর চা বিক্রি হয় তা ঐ চায়ের তিনটি কেটলি দেখলে বোঝা যায়; পাশাপাশি ছোট সাইজের ১৪/১৫টি চায়ের কাপের সারাক্ষণ ঝনঝনানির শব্দে এক ধরণের মুগ্ধতা লেগে থাকে । দোকানে বসা লোকজন গরুর দুধ দিয়ে বানানো গরম গরম চায়ের স্বাদ নিতে নিতে টিভি দেখছেন, কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে আলাপ জুড়ে দিয়েছেন। দোকানী এক গাল হেসে আমাদের বসার জায়গা করে দিলেন । বোঝা যায়; সে এই দোকানটিতে নিয়মিত চা খেতে আসেন ।

হিজুলিয়ার এই বাজারে চা-বিস্কুট খেতে খেতে সেই বিকেলে আমাদের কথোপকথন হলো—সে আমাকে অবসরে যাওয়া একজন কলেজ শিক্ষকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ধীরেন্দ্র কুমার দাশ, সরকারী ঘিওর কলেজের প্রভাষক ছিলেন, বাংলা পড়াতেন। আমি তার ছবি তুলতে চাইলে সে অনুমতি দিলো । আমরা বাজারটিতে বেশ খানিকটা সময় কাটালাম—ছোট এই বাজারটি আমি ঘুরে দেখলাম; সঙ্গে থাকা ক্যামেরাটি দিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলে রাখলাম ।

চায়ের এই দোকান ঘরটি দেখতে বেশ লম্বা আকারের, বাজারে আসা লোকজন এখানে বসে চা খায় নিয়মিত; কাজ না থাকলে টেলিভিশন দেখে দেখে সময় কাটান তাঁরা ! গ্রামের ছোট এই বাজার গুলো মনে হয় এরকম হয়; খুব বেশী মানুষের জটলা থাকে না। সবাই— সবাইকে চেনেন, জানেন । নতুন কেউ এলে কৌতুহলী হয়ে তারা তার সাথে পরিচিত হন ।

বাজারের সড়কটিকে দাড়িয়ে থাকা একটা ব্যাটারী চালিত রিক্সা আমার নজরে এলো, রিকশাটি কাঠামো গত গঠনে একটু ভিন্নতা রয়েছে ; একেবারে শহুরে রিকসার মতো না এটি। রিকশাটি খুব সুন্দর করে সাজানো। রঙ গুলো তখনো কটকট করছে। খুব সম্ভতব এটি একেবারে নতুন নামানো হয়েছে—এই সড়কে । রিকশাটির পিছনে মক্কা শরিফের ছবি আঁকা রয়েছে, আরো আঁকা রয়েছে মিনার, ফুল। রিকশাটির বডিতে লেখা রয়েছে—আল-মদিনা পাশেই একটা মোবাইল নম্বর লেখা। রিকশার চালককে খুঁজে পেলাম না, সে হয়তো রিক্সা রেখে, চা খেতে গেছেন বা অন্য কোন কাজে।

দুই তরুণকে দেখলাম তারা আখ খাচ্ছেন। বাজারটির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটিতে পানি কমে এসেছে, সেই কমে যাওয়া পানিতে ছোট ছোট শিশুরা মাছ ধরছে । খালের উপর ফুটে থাকা ঝাঁক ঝাঁক কচুরীপানার ফুল গুলো তখনো অনেকটা সজীব। আর কয়েকদিন পর পানি আরো শুকিয়ে গেলে—তারা একে একে মরে যাবে । যেমন মরে গেছে— খালটির পারে ফুটে থাকা কাশফুল গুলো । শীতের আগমনী বার্তা খুব সহজেই চোখে পরে— এখানে ।

আমাদের মটরসাইকেলটি আবার চলতে শুরু করলো; মটর সাইকেলের পিছনে বসে আমি দেখলাম, আল-মদিনা লেখা রিকশাটি দুইজন যাত্রী নিয়ে এক রকম ছুটে চলছে সড়কটি দিয়ে ।

আমি তাকে শেষ বারের মতো—বিদায় জানালাম। তার মটরসাইকেলটি তখনো শব্দ করে যাচ্ছিল। আমি বললাম, আজ বাবার কবরটা দেখতে যাব। সে আমার সঙ্গী হতে চাইলে আমি বললাম, —কবরস্থানের নির্জনতায় বাবার সাথে কিছুটা সময় একা নিরবে কাটাতে চাই !

গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমি হেঁটে চললাম—কবরস্থানের দিকে . . .

অক্টোবর ২০১৯ / হিজুলিয়া, বাংলাদেশ

সিলুয়েট ছবি তোলা . . .

বুড়ীগঙ্গা নদী, ঢাকা, আগষ্ট ২০১৯ © মনিরুল আলম

সেদিন গিয়েছিলাম বুড়ীগঙ্গা নদীর পাড়ে গরুর হাটের ছবি তুলতে; আমার সঙ্গী হয়েছিল—ছোট মেঘ । বাপ-বেটা মিলে পোস্তগোলা এলাকায় বিকেলের রোদে নদীর পাড় দিয়ে বেশ হেঁটে বেড়ালাম— দেখা হলো গরুর হাট; ছবি তোলা হলো । সামনেই কোরবানীর ঈদ; ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বুড়ীগঙ্গা নদী হয়ে কোরানির গরু ঢাকায় আসছে। এ ঘাটেও কিছু কিছু গরু নামানো হচ্ছে । একজন গরুর ব্যাপারীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কোন এলাকা থেকে গরু নিয়ে এসেছেন, সে জানালো ফরিদপুর থেকে ।

বর্ষার পানিতে বুড়ীগঙ্গা নদীর অন্যরকম সৌন্দর্য আমার চোখ এড়ালো না ! নদীর পাড়টিতে ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পড়ছে; সূর্যের আলোতে সেসব ঢেউ গুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল ! আমি চিন্তা করলাম— এখানে খুব সুন্দর সিলুয়েট ( Silhouette ) ছবি হয় । আসলে সিলুয়েট ফটোগ্রাফী করতে যা যা দরকার তার সব এলিমেন্ট গুলো এখানে খুঁজে পেলাম । আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখন কিছু সিলুয়েট ছবি তুলবো ।

সিলুয়েট ছবি তোলার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে তা হলো — আপনি যে বিষয়বস্তু বা যার ছবি তুলছেন আলোর উৎসটি তার পিছনে থাকতে হবে । ব্যাকগ্রাউন্ডের আলো এবং স্পেসকে প্রাধান্য দিয়ে ছবি তুলতে হবে; ফোরগ্রাউন্ডকে না । ফ্রেমিংটা এমন ভাবে করতে হবে; যাতে আপনার বিষয়বস্তুটির শুধু ‘কালো একটা আউটলাইন’ তৈরি হয় । সহজ করে বললে— সাধারন নিয়মে আমরা ছবি তুললে ক্যামেরার পিছনে আমাদের আলোর উৎসটি থাকে আর সিলুয়েট ছবি ক্ষেত্রে আলোর উৎসটি হবে বিষয়বস্তুর পিছনে । আউটডোর সিলুয়েট ছবি তোলার জন্য ফাঁকা জায়গা, আকাশ, নদী, সমুদ্রের তীর উপযুক্ত । আর একটা কথা low angle of view হলে ভালো হয় ।

সিলুয়েট ছবির অর্থবহতা নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে আমি বললো— এই ধরণের ছবি গুলো আমাদের মূল গল্পটা পরিষ্কার করে না কিন্তু দর্শক বা পাঠককে এক ধরণের কল্পনার জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় . . .

পুরান ঢাকা, লক্ষীবাজার

আগষ্ট ২০১৯

স্বতন্ত্র দৃষ্টি কোণ থেকে ছবি তোলা . . .

Angle of view পরিবর্তন করে ছবি তোলা । © মনিরুল আলম
Angle of view পরিবর্তন করে ছবি তোলা । © মনিরুল আলম

ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়া’তে আমি ( রিয়ালিষ্টিক ) বাস্তব দৃশ্যাবলী এবং ( অ্যাবস্ট্রাক্ট ) বিমূর্ত ফর্ম নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, যেখানে আপনি আপনার ছবিতে নান্দনিকতার দিকটা কি করে তুলে ধরবেন । আজ Angle of View নিয়ে খুব ছোট করে বলবো । ফটোগ্রাফী যেহেতু একটা কারিগরি মাধ্যম তাই এর ( ক্যামেরা ) ব্যবহারিক দিকটা জানা জরুরী ।

আমরা নতুনরা ছবি তোলার ক্ষেত্রে বেশীর ভাগ সময় একই Angle of View থেকে ছবি তুলি, যার কারণে আমাদের তোলা ছবিটি একটা সাধারন মানের ছবি হয়ে যায়। আমি বলছি না যে, সাধারন Angle of View থেকে ছবি তুলতে তা খারাপ হয় । যারা ছবি সিলেকশনের দায়িত্বে থাকেন ( ফটো-এডিটর, বিচারক ) তারা কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে খুব সহজেই বুঝতে পারেন, আপনার তোলা ছবিটির মানদন্ড কোন পর্যায়ের ।

একটু চিন্তা করে ফ্রেমিং করলেই কিন্তু ছবিটির Angle of View ভিন্ন করা সম্ভব । যদিও ছবি তুলতে তুলতে একটা সময় এই পরিবর্তনটা একজন ফটোগ্রাফারের নিজ থেকেই হয়ে যায় । কিন্তু আমাদের যদি বিষয়টি সম্পর্কে আগেই জানা থাকে তাহলে শুরু থেকেই আপনার তোলা ছবি প্রসংশিত হতে থাকবে ।

এবার সহজ মন্ত্রটা জানা যাক—অর্থাৎ আপনার তোলা ছবিটির Angle of View হতে হবে Unique Angle of View বা —দেখার স্বতন্ত্র কোণ । সহজ ভাবে আমি যেটা বুঝি গতানুগতিকা থেকে বের হয়ে বেশীর ভাগ মানুষের পছন্দের একটা ছবি তোলা। যে মানুষটা আপনার ছবিটি দেখছেন তার যেন মনের ভিতরে একটা অনুভুতি তৈরি হয় । কাজটি কিন্তু একেবারে সহজ নয় . . .

পুরান ঢাকা, লক্ষীবাজার

আগষ্ট ২০১৯

মেঘের প্রথম কোরআন শরিফ পাঠ . . .

কোরআন শরিফ হাতে মেঘ, আগষ্ট ২০১৯ পুরান ঢাকা, লক্ষীবাজার। ছবি : মনিরুল আলম

মেঘ—সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে বসে আছে হুজুরের জন্য। আজ সে— নীল একটা পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা পড়েছে । পাঞ্জাবির সাথে মিলিয়ে নীল রঙের একটা টুপি। আজ তার প্রথম কোরআন শরিফ পাঠ শুরু । এতোদিন সে কায়দা, আমপারা পড়ে শেষ করেছে ।

তার মা বললো, মেঘ— আয় তোকে ঠি ক মতো ওজু শিখিয়ে দিই— ঠি ক করে ওজু করে নে। কোরআন শরিফ সব সময় পাক-পবিত্র হয়ে পড়তে হয় । দাদীকে সালাম করে এসো। নতুন কোরআন শরিফ পড়া শুরু করলে মুরুব্বীদের দোয়া নিতে হয় ।

মেঘ আমাকে এসে বলে; বাবা ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠো ! আমি ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললাম, কেন কি হয়েছে ? সে বলে আম্মী বলেছে—তোমাকে পাঁচ কেজি রসোগোল্লা কিনে আনতে। আজ বাসার সবাইকে রসোগোল্লা খাওয়ানো হবে। আমি তাকে বললাম, তুমি যাওতো এখন; দেখি আমি বিকেলে নিয়ে আসবো ।

বাপ-বেটা মিলে গতকাল বাংলাবাজার গিয়েছিলাম কোরআন শরীফ কিনতে । লিয়াকত এভিনিউ মার্কেটের জাহানারা বুক হাউস থেকে নাদিয়াতুল কুরান প্রকাশনীর একটা নাদিয়া সহীহ কোরআন শরিফ কেনা হলো। আজ থেকে তার কোরআন পাঠ শুরু হলো ।

সকলে মেঘের জন্য দোয়া করবেন। সে যেন ভালো ভাবে তার কোরআন পাঠ শেষ করতে পারে . . .

২ আগষ্ট ২০১৯

পুরান ঢাকা, লক্ষীবাজার

ছোট ছোট কথা | ঘাটের কথা . . .

বুড়ীগঙ্গা নদীর ঘাটে বসে থাকা নৌকার মাঝি । ঢাকা, ২০ এপ্রিল ২০১৯ ছবি: © মনিরুল আলম

সেদিন গিয়েছিলাম বুড়ীগঙ্গা নদীর এক ঘাটে— বসে ছিলাম প্রায় সারা বিকেল ।পাশেই পোস্তগোলা শশ্মান ঘাট—এই শশ্মান ঘাটকে কেন্দ্র করে রয়েছে আমার অনেক স্মৃতি ! প্রিয় বন্ধু ‘বাবু’ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গেলে ওকে আমরা এই শশ্মান ঘাটে দাহ্য করেছিলাম । সারারাত ধরে জ্বলতে থাকা চিতার আগুনের সামনে আমরা দাড়িয়ে ছিলাম ক’বন্ধু—দেখছিলাম আমাদের প্রিয় বন্ধুটি চিতার আগুনে আস্তে আস্তে পুড়ে ছাই হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে আমাদের সামনে থেকে ।

অনেকদিন এদিকটায় আসা হয় না; আজ যেন কি মনে হলো সঙ্গে ক্যামেরাটি নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। বুড়ীগঙ্গার এই দিকটায় এতোটা প্রাণচাঞ্চল্য নেই—সদরঘাটের মতো । এসব ঘাটে নৌকা খুব বেশী থাকে না যাত্রীও কম পারাপার হয় । ৭/৮ টি নৌকা ঘাটে সিরিয়াল দিয়ে যাত্রী পারাপার করে ।এক নৌকায় ৮/১০ জন যাত্রী হলে মাঝি তার নৌকা নিয়ে বুড়ীগঙ্গা নদী পাড়ি দেন । জন প্রতি পারাপারে দশ টাকা করে নেন তারা । আমি ঘাটের এক পাশে দাড়িয়ে ছবি তুলছিলাম আর মাঝিদের কথা শুনছিলাম ।

তাদের দৈনন্দিন জীবনের আয়-রোজগার, থেকে শুরু করে—পরিবার-পরিজন, সমাজ-সংসার, রাজনীতি, ধর্ম তাবৎ দুনিয়ার গল্প তারা করেন; ঘাটে বসে থেকে।একটু ধৈর্য ধরে বসে তাদের কথা শুনলে বর্তমান সমাজ নিয়ে তাদের ভাবনা-চিন্তা গুলো জানা যায়—বোঝা যায়।

এখন চলছে বর্ষার ভরা মৌসুম । বুড়ীগঙ্গা নদীর দিকে তাকালে সেই চিত্র স্পষ্ট ! দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যার কারণে পানি বন্দী হয়ে পড়েছে দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষেরা । এদের আলাপচারিতায় সেইসব মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা গুলো জানা গেল ।

আমি একজন মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, নদীতে এতো কচুরিপানা কেন ? উত্তরে হাসেম মাঝি আমাকে বলেন— আর কইয়েন না ভাই, এই পানা কাইটা নৌকা পাড়ে ভিড়াইতে আমাগো খুব কষ্ট হয়, যাত্রীরা নৌকায় হাত না লাগাইলে একা একা নৌকা চালানো যায় না; এই সব পানা বানের স্রোতে ভাইস্যা আইছে— ভাই।

হঠাৎ একজন বলে উঠলো; ঐ দেহেন একটা গুইসাপ সাঁতার কাইটা এই দিকে আইতেছে, আমরা সবাই তাকালাম । আমি দেখলাম— সাপটি সাঁতার কেটে এসে কচুরিপানা গুলোর মধ্যে আশ্রয় নিলো । মাঝিদের মধ্যে একজন বলে উঠলো, ঐ গুইসাপকে মারিস না—গুইসাপ মারতে হয় না; ওইডা মনে হয় বানের পানিতে ভাইস্যা আইসে । আমি সাপটিকে দেখি তার কয়েকটা ছবি তুলি !

ইতিমধ্যে মাঝিরা নতুন নতুন যাত্রী নিয়ে নদী পাড়ি দিচ্ছেন। কেউ কেউ নৌকায় বসে ঝিমুচ্ছেন; কেউ আবার নতুন গল্প জুড়ে দিচ্ছেন, একজন মাঝি বলে ওঠেন— ভাই এই ঘাটে আমি একজন মানুষরে মইরা যাইতে দেখছি—মানুষটা ১৩ বছর যাবত পঙ্গু হইয়া বাড়ীতেই থাকতো। দুই হাতের উপর ভর কইরা চলাচল করতো । একদিন এই ঘাটের সামনে আইয়া পিছলা খ্যাইয়া পইড়া গেল; হের পরে হে মইরা গেল গা— হাইরে মানুষের জীবন !

সন্ধ্যা নেমে আসে । আমি কচুরিপানা গুলোর দিকে তাকাই—তারা দলে দলে ভেসে আসছে; গুইসাপটিকে খুঁজি; চোখে পরে না । একজন মাঝিকে দেখি— কচুরিপানা কেটে কেটে যাত্রী নিয়ে নদী পাড়ি দিচ্ছেন। সদরঘাট লঞ্চ টারর্মিনাল থেকে ইষ্টিমার ছেড়ে আসার শব্দ পাই। আমি ফিরে যাবার জন্য তৈরি হই। আজ আমাকে দৈনন্দিন জীবনের কিছু ছবি পাঠাতে হবে আমার এজেন্সি—ইপিএ’র জন্য . . .

২০ এপ্রিল ২০১৯ বুড়ীগঙ্গা নদী

ঢাকা, বাংলাদেশ

শুভ জন্মদিন কইন্যা . . .

আমাদের কইন্যা ঢেউ । ছবি: মনিরুল আলম

মানুষের জীবন সব সময় সহজ-সরল পথে চলে না । সহজাত এই জীবনে মানুষকে কখনো কখনো বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়। সৃষ্টিকর্তা যখন তার রহমতের দুয়ার খুলে দিয়ে ঢেউ’কে আমাদের পরিবারে পাঠালেন; সেই সময়টি নানা উদ্বেগ, উৎকন্ঠার মধ্যে দিয়ে পার করেছিলাম আমরা।

মেঘ-ঢেউ এর মা তখন হঠাৎ করেই চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল—পরিস্থিতিটি আর স্বাভাবিক ছিল না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে; তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করেছিলাম । আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ছিল—ছিল মানুষের সহোযোগিতা আর ভালোবাসা । অবশেষে মা-মেয়ে দুজনে বিপদমুক্ত হয়েছিল ।

মানুষটিকে যখন আমি প্রথম দেখলাম; তখন সে ঘুমাচ্ছে ! আমার বুকটা তখন অদ্ভুত এক মায়ায় ভরে উঠেছিল ! তার মা জানালো—বাবুটি তার দিকে এক চোখে পিটপিট করে তাকাচ্ছিল তখন ! তার সেই দূরন্তপনা এখনো সময়ের সাথে এগিয়ে চলছে; সারাদিনের সঙ্গী হলো তার ভাইটি—মেঘ ।

আজ ছোট সেই মানুষটির জন্মদিন; দুই বছর হলো তার। শুভ জন্মদিন—কইন্যা । আমাদের ছোট মা ‘ঢেউ’ এর জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা . . .

৬ জুলাই ২০১৯

পুরান ঢাকা । লক্ষীবাজার

শুভ জন্মদিন বালক . . .

মেঘের পোট্রট : ছবি: মনিরুল আলম

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে ছুটতে হলো । একটা অ্যাসাইনমেন্ট আছে।মেঘটা তখনো ঘুমায় । তার কপালে ছোট একটা আদর দিয়ে আমি ছুটলাম কাজে । আমাদের মেঘের বয়স আজ দশ বছর হলো ।

সারাদিন কাজ শেষ করে বিকেলে যেন একটু অবসর পাওয়া গেল । সবাই মিলে ছাদে উঠলাম । আকাশ জুড়ে তখন সাদা-কালো মেঘের ছুটোছুটি পাশাপাশি ঝিরিঝির বৃষ্টি শুরু হয়েছে ! মেঘ বলে উঠলো, বাবা বৃষ্টিতে খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে !

বালক ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলাম । বাব-বেটার এই কান্ড দেখে ছোট ‘ঢেউ’ বলে উঠল, বাবা ক-য়ে উঠবো ! আর মেঘ বলে উঠলো—বাবা দেখ রঙধনু ! আমি দেখলাম পূর্বাকাশে অসাধারন এক রঙধনু ফুটে উঠেছে ! মেঘ’কে বললাম, মেঘ-বৃষ্টির দল মনে হয় যুক্তি করে রঙধনু’কে ডেকে এনেছে, আজ তো তোর জন্মদিন তাই !

শুভ জন্মদিন ছোট বালক ‘মেঘ’ । তোর জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা . . .

১ জুলাই ২০১৯

পুরান ঢাকা । লক্ষীবাজার

বদলে যাওয়া প্রযুক্তি . . .

ছবি : ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তির ব্যবহার ! কয়েক বছর আগেও ঘটনাস্থল থেকে অফিসে ছবি পাঠানোর জন্য ল্যাপটপ ব্যবহার করতাম । ক্যামেরার ব্যাগে ল্যাপটপ বহন করতে হতো । ইন্টারনেট সংযোগের জন্য ছিল মোডেম ।

আর এই ২০১৬-তে এসে, স্মার্ট ফোন ব্যবহার করছি ছবি পাঠাতে। ফোনটি একটি ইন্টারনেট ডিভাইস হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে । বিশেষ করে অনলাইন সংবাদ সংস্করনের জন্য । প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার এই বাজারে নিজেকে সব সময় আপডেট রাখতে হয় ।

প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে ফ্রেন্ডলি ভাবে নেয়াটা হচ্ছে— বুদ্ধিমানের কাজ । প্রযুক্তি জ্ঞানের পাশাপাশি, নিজের পেশাদারী মনোভাবটাও খুব জরুরী ।

আমার এই ছবিটি তুলেছেন New Age পত্রিকার ফটোসাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ ঘোষ । আমরা আগারগাঁও এলাকায় আগুন লাগার একটা খবর পেয়ে সেখানে গিয়েছিলাম । সময়টা ছিল ০৩, অক্টোবর, ২০১৩ ।

পুরান ঢাকা

১৩, আষাঢ়, ১৪২৩

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্ষুদে দুই সমর্থক . . .

মেঘ এবং ঢেউ এর আনন্দ উল্লাস । ছবি: মনিরুল আলম

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্ষুদে দুই সমর্থক তৈরি হয়েছে আমাদের পরিবারে ! যেদিন বাংলদেশ দলের খেলা থাকে সেদিন তাদের নানা প্রস্তুতি থাকে । ক্রিকেট ব্যাট, বল, উইকেট, স্টাম্প সহ বাংলাদেশ দলের জার্সি পরে

টিভি সেটের সামনে তারা বসে যায়—খেলা দেখতে ! যেন নিজেরাই মাঠে খেলছে ! মাঝে মাঝে তাদের সেই খেলা দেখার সঙ্গী হন তাদের দাদী, চাচা, ফুপি এবং আমরা ।

আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের ২০১৯ ফিকশ্চারটি টানানো হয়েছে মেঘের পড়ার ঘরের দরজায় । বাংলাদেশ দলের খেলা কবে কবে হবে— তা তার প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে । মেঘ ক্রিকেট খেলা কিছুটা বুঝতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দলের ক্রিকেটারদের নামও সে বেশ বলতে পরে । প্রতিদিনের পত্রিকাটিতে তার পড়ার পছন্দের পাতাটি হলো খেলার পাতা । কিন্তু ‘ঢেউ’ তো আর এতো কিছু বোঝে না, সে শুধু তার ভাইয়ের দেখা-দেখি একটু পর পর খেলা চলাকালে— বাংলাদেশ ! বাংলাদেশ ! বলে উল্লাস করে আর বিছানাতে ঝাপিয়ে পরে ডিকবাজি খায় !

ক্ষুদে এই দুই সমর্থকদের আনন্দ-উল্লাসের সাথে মাঝে মাঝে আমি আর তাদের মা একাকার হয়ে যাই—ভেসে যাই তাদের সাথে ! আমাদের জাতীয় সঙ্গীত যখন খেলার মাঠে গাওয়া হয় তখন টিভির ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে দিই ।

১৭ কোটি মানুষের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ । সবার সাথে আমরা একাত্ব হয়ে বলতে চাই—আমাদের টাইগার’রা বীরের মতো খেলার মাঠে লড়বে—ফাইট লাইক এ হিরো ! খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই ।

ছোট বেলায় দেখা ছুটির ঘন্টা সিনেমাটির গান মনে রেখে বলতে চাই—হার-জিত চিরদিন থাকবেই । তবুও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে /

টাইগারদের জন্য শুভ কামনা । অনেক অনেক ভালোবাসা . . .

পুরান ঢাকা । লক্ষীবাজার

জুন ২০১৯

কতো শত স্মৃতি এই খানে . . .

পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় অবস্থিত সেন্ট টমাস চার্চ । জনসন রোড, পুরান ঢাকা : ছবি: মনিরুল আলম

হেমন্তের বিকেলে হাঁটছি—সরকারী শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে শুরু করে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত—সেই পথ। পুরো এলাকাটি একনামে লক্ষীবাজার হিসেবে পরিচিত । আহা—কতো শত স্মৃতি এই খানে ! আমার বাবা—মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা শহরে এসেছিলেন আইন পড়তে তার পর সে একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি হয়ে স্থায়ী হয়েছিলেন—এই শহরে । আমার জন্ম, বেড়ে উঠা এই পুরান ঢাকায়—মেঘ, ঢেউ, নেহাল,নীল ওরা আজ আমাদের পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম হয়ে বড় হচ্ছে—এই শহরে ।

এই লক্ষীবাজার এক সময় আসলেই ‘লক্ষী’ ছিল বলে আমার মনে হয়; আর এখন তা সত্যি সত্যি এক বাজারে পরিণত হয়েছে ! সময়ের প্রয়োজনে পুরনো ভবন গুলো ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে উঠছে বানিজ্যিক সব ভবন, সড়কের দুই ফুটপাত জুড়ে হকারদের নানা দোকানপসার কি নেই সেই সব দোকান গুলোতে ! আর মানুষের দল গাদাগাদি করে সেই বাজার থেকে তাদের সংসারের নানা তৈজসপত্র কিনে নেয়—প্রতিদিন !

শুধু লক্ষীবাজার কেন ? আমার কাছে মনে হয় পুরো ঢাকা শহরে একই চিত্র দেখা যায়—বর্তমানে । বেশ কয়েক বছর আগে শিল্পী মুনিরুল ইসলামের সাথে তার চিত্রকর্ম আঁকা দেখতে দেখতে ঢাকা শহর নিয়ে নানা কথা হচ্ছিল; মুনির ভাই বললেন—ঢাকা শহরের এখন খুব কম ল্যান্ডস্কেপ ফর্ম দেখতে পাবা, এখন শুধুই ভার্টিক্যাল ফর্ম, ঢাকা শহরের ভবন গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখ— সব ভবন গুলো এখন আকাশমুখী ! নানা কারনেই মানুষ শহরমুখী হয়েছে !

ছোট বেলায় সকালে বাবার হাত ধরে লক্ষীবাজার এলাকায় ছানা কিনতে যেতাম—তখন সাদা ধূতি-ফতুয়া পরা সেই বৃদ্ধ দাদু ( ছানা-মাঠা-মাখন বিক্রেতা ) আমার হাতে চিনি মেশানো ছানা দিয়ে বলতেন, বাবু এটা তোমার জন্য—খাও ! আজ সেই সব শুধু স্মৃতি . . .

পুরান ঢাকা, লক্ষীবাজার

নভেম্বর ২০১৮