মানিকগঞ্জের হিজুলিয়ায় আমাদের কবরস্থান, ১৯৩৭ সালে এটা স্থাপিত হয় । ছবিটি ২০, ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম
বাবা— কী এক অদ্ভুত এই আমি ! আজ কতদিন—কতমাস হলো দেখতে যাওয়া হয় না— তোমার সমাধি ! অথচ ঘোরলাগা এই জগৎ, সমাজ, সংসার, সময় দিব্বি চলে যায়— কিম্ভূতকিমাকায় ! ঐ দিকে তোমার সমাধি আজো দেখা যায়; তেত্রিশ বছর পর;
একদিন হেঁটে যেতে যেতে— প্যারীদাস রোড়ের গলিপথে, রঙচটা দেয়ালে সাপটে থাকা হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প পড়ি ! রিচার্ডদের পুরোনো বাড়িটা এখনো ঠাঁই দাড়িয়ে আছে—রিচার্ড কোন একদিন হারিয়ে গিয়েছিল, কবে কোথায় কোন দিনে আজ আর মনে পরে না !
এখন মধ্যে রজনী । বই বাঁধাই কারখানার শ্রমিকের কথামালা আর প্রিন্টিং প্রেসের শব্দ থেমে গেছে! চারিদিক খুব শান্ত, শুধু প্রখর রোদ এগিয়ে চলছে পুরোনো দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে ।
গলির বাম দিকটা চলে গেছে— বিউটি বোর্ডিং ! শুনেছি, এখানেই বরেণ্যরা আড্ডা দিতেন— নিয়মিত! তাঁরাও আজ হারিয়ে গেছেন, কবে— কোন কালেই ! তবে আমাদের কালের আলোকচিত্রী বিজন সরকারের সাথে দেখা হতো—কাঁধে ঝোলাটি ঝুলিয়ে, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পরে, এ পথেই বাড়ি ফিরতেন, প্রতিদিন ! এখন আর নাই!
সকাল গড়িয়ে দুপুর নামলেই যেন রাজ্যের নিস্তব্ধতা নেমে আসে এ গলিতে! যদিও দুই একজন পথিক হেঁটে যায়— এ পথেই ! আমি পা বাড়াই — লম্বা এক ছায়া আমার পাশে পাশে চলতে থাকে !
তনুগঞ্জ, হৃষিকেশ দাশ রোড, ধোলাই খাল হয়ে নারিন্দার দিকে— অতঃপর খ্রীষ্টান সিমিট্রি ! আমার সাথে সাথে এই পথে আরো একজন হাঁটেন নিবিষ্ট মনে— তিনি হারিয়ে যাওয়া কবি—জীবনানন্দ দাশ !
কবির সাথে এভাবে হাঁটতে হাঁটতে প্রতিনিয়তই কথা হয় তার হারিয়ে যাওয়া ঝরা পালক, ধূসর পান্ডুলিপি, মহা পৃথিবী কখনো সখোনো সাতটি তারার তিমির—কাব্যে গ্রন্থের !
আজ কবির সাথে হাঁটতে হাঁটতে তার ‘বোধ’ কবিতাটি নিয়ে কথা হলো—রিকশার টুংটাট শব্দ, সকল লোকের মাঝে কবি নিবিষ্ট মনে বলে চলছেন, তার রচিত ‘বোধ’ কবিতাটির নেপথ্যের গল্প !
অনন্ত কালের অনন্য কবি—জীবনানন্দ দাশ হঠাৎ করেই আমাকে ফেলে রেখে ভীড়ের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন—কবি !
তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি নেমে আসছে । আমি সিমিট্রির প্রবেশপথ দাঁড়িয়ে আছি, অনেক অনেক দূর থেকে মাইকে একটা কন্ঠ বাতাসে বাতাসে ভেসে আসছে —
একটি নিখোঁজ সংবাদ, একটি নিখোঁজ সংবাদ! অদ্য বিকেল চার ঘটিকায় হরিপদ ঠাকুর নামের এক বৃদ্ধ নিজ বাড়ির সামনে থেকে হারিয়ে গেছেন, তার বয়স আনুমানিক ৫৭ বছর! পরনে ছিলো সাদা গেঞ্জি আর চেক লুঙ্গি। নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেলে এই নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা গেলো ০০০০০০০০০০০ ।
ছোট এই শহরটির এখানে বসলেই নদীটি দেখা যায়;আমরা রোজ এখানে বসে নদী দেখি, আহা— কতো কতো ঢেউ বয়ে চলে, তার বুকের প’রে; পৃথিবী কী মনে রাখে— সব !
তুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললে, নক্ষত্রেরাও আমাদের সাথে নদী দেখে—রোজ রাতে ; আমি নদীর ঢেউ দেখে দেখে বললাম—এই নদী অনন্ত কালের ; তার স্রোতের গল্প গুলো আবহমান কালের—উপকথা !
তুমি আর আমি—যখন একদিন থাকবো না; যখন আমরা একদিন ঐ নীলাকাশের নক্ষত্র হবো; সেদিনও এই নদী কালের স্রোতে জেগে থাকবে—নিশ্চল ! তুমি আর একবার তাকালে নদীর দিকে, তোমার চোখে তখন নদীর—ছায়া !
আমাদের পাশেই কোন এক বৃক্ষ শাখার ডালে বসে, এক লক্ষীপেঁচা ডেকে উঠল, তারপর আরো একটা; আমরা তখন সন্ধ্যা তাঁরার আলোয়, নদীটিকে পেছনে ফেলে ফেলে ঘরে ফিরছি; আমাদের রক্তে তখন—শীতল নিরবতা . . .
দিনের ঘাস খাওয়া শেষ হলে; গোধূলী সন্ধ্যায় কৃষকের গরু গুলো হেলেদুলে কাশফুলের মাঠ পেরিয়ে যায়—ওরা একে একে ঘরে ফিরে ; ওরা গৃহস্থের গরু ; এরাই ওদের প্রাণ ! কৃষকের ছেলে— মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে একে একে ওদের নাম ধরে ডাক দেয়, ওরা ঘাস থেকে মুখ উঠিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, মনিবের ছেলে ডাকছে; ওরা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে একে একে গোধূলি ধুসর ধূলা উড়িয়ে ফিরে যায় গৃহস্থের ঘরে ।
দলছুট একটা গরুকে দেখলাম—কার্তিকের মাঠে লাল, নীল নর-নারীদের দেখে থমকে দাড়িয়েছে ! তার চোখের ভিতরে এক জল ছবির ছায়া ; সবুজ ঘাসের দেশে ততোক্ষণে সন্ধ্যা-রাত্রি নেমেছে—আমরা জোনাকি পোকা দেখে দেখে বাড়ী ফিরছি— আহা জীবন!
চড়ুই পাখি আর ঝুটি শালিকের হৃদয়ের আর্তনাদ শুনি,— ওদের মনে কোন এক বিপন্ন বিস্ময় জাগে;—একটা বুনো বেড়াল জীবন্ত শিকার ধরে,—দেয়ালের কার্নিশ দিয়ে হেটে চলে গেল !
দেয়ালের কার্নিশে বসে থাকা এক ঝাঁক বুনো কবুতর কোথায় যেন উড়ে চলে গেল;—‘হরি বলা’ ধ্বনি দিয়ে কারা যেন, কাঁধে করে একটা শব নিয়ে গেল—শশ্মান ঘাটে;
আজকাল— চোখে খুব ভালো একটা দেখতে পাই না;—ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা কবিদের সেইসব স্কেচ করা পোট্রেট গুলো—অস্পষ্ট বলে মনে হয়;
জানালা থেকে ফিরে আসি.—আবার জানালায় পাশে যাই,— আলোর বিচ্ছুরণ দেখি;—অন্ধকার চোখে . . .
পৃথিবীর সেই সব বিকেলের আলো একে একে নিভে গেলে —সন্ধ্যা আসে ! দূরাগত— শহরের প্রান্ত থেকে কি জানি কিসের শব্দ ভেঁসে আসছে ! আমরা তিনজন— জ্যোৎস্নার আলোয় বসে আছি; আমাদের মাথার উপর হিম রাত্রি নামছে ।