মায়ের ইন্তেকালের পর আমরা গভীর শোক ও ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে মাকে গোসল করিয়ে ঢাকায় তাঁর প্রথম জানাজা সম্পন্ন করি। সবকিছু যেন অদ্ভুত লাগছিল—বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে এটাই মায়ের সঙ্গে আমাদের শেষ আনুষ্ঠানিকতা।
এরপর ভোরের নিস্তব্ধ আলোয় আমরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই। মায়ের নিথর দেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে আমি আর বড় মামা নীরবে বসে ছিলাম। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু বুকভরা কান্না আর অসীম শূন্যতা নিয়ে আমরা মায়ের শেষ যাত্রার সঙ্গী হয়েছিলাম।
আমাদের গ্রামের বাড়ির আঙিনা সেদিন ছিল শোকের নীরবতায় আচ্ছন্ন। মায়ের জানাজার সময় আমাদের সব কাজিন ও আত্মীয়-স্বজনেরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে একত্রিত হয়েছিলেন— হিজুলিয়াতে।
সবার চোখে ছিল অশ্রু, হৃদয়ে ছিল গভীর বেদনা—প্রিয় মাকে শেষ বিদায় জানানোর ভারী মুহূর্ত। মেঘ এবং ঢেউয়ের চোখে ছিল গভীর বেদনা তারা তাদের প্রিয় দাদীকে হারিয়ে খুব নীরবে হয়ে গিয়েছিল!
২০২৫ সালের ১৫ মে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে আমাদের প্রাণপ্রিয় মা জননী এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। তাঁর শূন্যতা আমাদের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা হয়ে থাকবে।
এর অনেক আগেই, ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর, আমাদের প্রিয় বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। বাবা-মা দু’জনের স্মৃতি আজও আমাদের হৃদয়ে অমলিন, তাঁদের ভালোবাসা ও আদর্শই আমাদের চলার পথের শক্তি।
পুরান ঢাকা টু মিরপুর এগারো । উদ্দেশ্য ছিল দুইটা [এক ]‘উন্মাদ’ এর আয়োজনে বাংলা কমিকস্ প্রদর্শনী ও উৎসবে যোগ দেওয়া ! [ দুই ] ঢেউ বলছিল বাবা আমার জন্মদিনে তো কোথাও আমাদের নিয়ে ঘুরতে গেলা না ! তাই সবাই মিলে একটু ঘুরে আসা !
সড়ক পথের প্রায় পনেরো কিলোমিটারের এই জার্নিতে আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছিল অনেক । যেমন সড়ক অবরোধ, রথ যাত্রার মিছিল দেখা, যানজট, তীব্র গরম ! এবং গন্তব্যে পৌছাতে নানা পদ্ধতির প্রয়োগ করা । কখনো পায়ে হাঁটা, কখনো রিকশা আবার কখনো সিএনজি করে অবশেষে কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌছানো । যাহোক এটাই এখন আমাদের সহনীয়-অসহনীয় ঢাকা শহর । কারণ আমরা ঢাকাবাসী ! আমরা ঢাকায় থাকি !
ঋদ্বি—গ্যালারীতে কমিকস্ প্রদর্শনীর কমিকস্ গুলো দেখে খুব মজা পাচ্ছিলাম।হঠাৎ আমি ঢেউকে বললাম ঐ লোকটাকে চেনো ? ঐ যে চেয়ারে একা একা বসে আছেন ? উনার কাছাকাছি কিন্তু যেও না ! ঢেউ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো কেন বাবা ! উনি কি ভয়ঙ্কর লোক ! আমি বললাম না উনি হচ্ছেন ‘উন্মাদ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক !
ঢেউ ততোক্ষণে বুঝে গেছে আসল ব্যাপারটা ! সে দেখেছে তাদের বাসার বুক সেলফে এই উন্মাদ ম্যাগাজিন কয়েকটা কপি আছে । পরে আমি হাসতে হাসতে বললাম —হ্যাঁ মা উনি হচ্ছে গ্র্যান্ডফাদার অফ জোকস, আমাদের উন্মাদ ম্যাগাজিনের সম্পাদক আহসান হাবীব।
বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট, রম্য সাহিত্যিক এবং কমিক লেখক । উনার কিন্তু আরো দুইজন বিখ্যাত ভাই আছেন তারা হলেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ এবং মুহাম্মদ জাফর ইকবাল।
আমরা প্রদশর্নী দেখা শেষ করে উন্মাদ ম্যাগাজিনের কিছু বিশেষ সংখ্যা, ষ্টিকার, কিছু কমিকসের বই কিনে, ঋদ্বি ক্যাফেতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে মেঘ/ ঢেউ এর নানী বাসা হয়ে ফিরে এলাম নিজেদের গন্তব্যে ।
মায়ের এই ছবিটি আমাদের সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সময় তুলেছিলাম, ২৭ নভেম্বরের ২০১০ সালে । ছবি: মনিরুল আলম
মায়ের বিজন মুহূর্ত গুলো এখন কোমাতেই কাটে ! আহা— কি ভিষণ সেইসব কষ্ট ! কি ভীষণ সেই সব সময় গুলো পার করছেন, জননী আমার । মাঝে মাঝে যখন গভীর অন্ধকার থেকে চেতনা গুলো ফিরতে শুরু করে তখন মনে হয়, আমাদের ‘মা’ যেন একদম স্বাভাবিক মানুষ । সবার খোঁজ-খবর করেন, পরিবারের ছোট সদস্যটিকে কাছে টেনে নেয়, ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিতে ভেসে বেড়ান ! মায়ের চোখে তখন আলোর ঝিলিক দেখা যায় ।
সেদিন বুবলী পোলাও মাংস রান্না করেছিল । ‘মা’ কে বল্লাম তুমি কি পোলাও-মাংস খাবে ? রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে, তোমাকে কি দেবো একটু । ‘মা’ খেতে রাজি হলেন, বল্লেন— যা নিয়ে আয় । বড় ভাই— যত্ন করে সেই খাবার খাওয়ালেন। খাবার শেষ করে ‘মা’ বল্লেন —বাবা, আমাকে এশার নামাজটা পড়িয়ে দে । নামাজ শেষে দোয়া করলেন সবার জন্য । তারপর ধীরে ধীরে সেই বিজন অন্ধকারে চলে যেতে লাগলেন !
সময়ের হিসাবে মায়ের অসুস্থতা প্রায় সাড়ে তিন বছর হতে চললো ! স্বজনরা এখনো কেউ কেউ মায়ের খোঁজ খবর করেন । যদিও সময় এবং জীবনের বাস্তবতাটা ভিন্ন কথা বলে ! আমরা পরিবারের সবাই মিলে মায়ের সেবা করে যাচ্ছি। তিন ভাই-বোনের সান্তনা এটাই আমাদের ‘মা’ বেঁচে আছেন—আমাদের সাথে আছেন । আল্লাহ তা’য়ালার কাছে তার পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন । নিশ্চই আমাদের রব তার প্রতি রহম করবেন, তার ভূলত্রুটি গুলো ক্ষমা করবেন । মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিশ্চই আমাদের ‘মা’ কে নেক হায়াত দান করবেন । আল্লাহ তা’য়ালার কাছে এই দোয়া করি সবাইকে যেন তিনি শান্তিতে রাখেন . . .
যতদূর মনে পরে আমার বই পড়ার এই অভ্যাস মায়ের কাছ থেকে পাওয়া । ছোটবেলায় দেখতাম ‘মা’ নিয়মিত নামাজ পরার পাশাশাপি কোরআন শরিফ পাঠ করতেন । আমাদের বাসায় নিয়মিত পত্র-পত্রিকা রাখা হতো । বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’ এবং মায়ের পছন্দের পত্রিকা ছিল—সচিত্র সাপ্তাহিক ‘বেগম পত্রিকা’ । আমি সে গুলোর পাতা উল্টাতাম, ভালো লাগতো । মায়ের ‘বেগম পত্রিকা’ পাঠটির অনুরাগের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ।
বিভিন্ন সূত্র থেকে থেকে জানা যায় — ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার কিছুদিন আগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেগম পত্রিকা’। এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তৎকালীন ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক নাসির উদ্দিন।
ভারতবর্ষ বিভক্ত হবার পরে ১৯৫০ সালে বেগম পত্রিকার অফিস ঢাকার পাটুয়াটুলিতে আসে । বর্তমানে এটাই তার স্থায়ী ঠিকানা।বেগম পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন, কবি সুফিয়া কামাল। তার সাথেই কাজ করতেন নাসির উদ্দিনের একমাত্র কন্যা নূরজাহান বেগম।
এই বেগম পত্রিকা তৎকালীন সমাজে নারী পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের জন্য সাংস্কৃতিক বিনোদন দেবার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ১৯৬০ এবং ১৯৭০’র দশকে প্রতি সপ্তাহে বেগম পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ছিল ২৫ হাজারের মতো। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডাকযোগে এই পত্রিকা পৌঁছে যেত। যা আমার ‘মা’ —আয়েশা সিদ্দিকা পত্রিকাটির একজন নিয়মিত পাঠক এবং গ্রাহক হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে ।
তো যা হোক — দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন আর বিভিন্ন গল্পের বই, কবিতার বই যেমন — সেবা প্রকাশনি নানা বই, রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর সিরিজ এবং বেতালের কমিকস ছিল আমার নিয়মিত পাঠের অন্যতম বিষয় । প্রিয় বন্ধু চন্দন, কামাল, লিপ্টন, অপু এবং আমার সংগ্রহে ছিল প্রচুর কমিকস, যা আমরা একে অপরকে শেয়ার করতাম। আমরা বাংলাবাজার পুরাতন বইয়ের মার্কেট থেকে কম টাকায় এসব বই কিনতাম।
এ ছাড়া আমি প্রতিবছর ২১শের বইমেলা আসলে সেখানে আমার নিয়মিত যাতায়াত হতো। বন্ধুদের ষ্টলে বসা, আড্ডা মারা ছিল আমার প্রধান কাজ । বিভিন্ন কবি, লেখকদের সাথে পরিচিত হওয়া তাদের সম্পর্কে জানা, তাদের বই কেনা ছিল তখন আমার নিয়মিত চর্চা । ২১শে বই মেলায় নানা ঘটনা এখন শুধুই স্মৃতির পাতায় !
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে পরবর্তী পেশাগত জীবনে প্রবেশের সাথে সাথে আজ পাঠভ্যাস হারিয়েছে। তবে প্রিয় দুই সন্তান মেঘ, ঢেউ’কে অনুপ্রেরনা দেওয়ার জন্য অনিয়মিত হলেও এই পাঠভ্যাস আবার শুরু করেছি । নিজের এই বই পড়ার অভ্যাসটা ফিরিয়ে আনা এবং ওদের ভিতরে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে চাই।
এবারের ২১শের বইমেলায় বেশ কিছু বই কেনা হয়েছে যা এবারের রমজান মাসে পাঠ শেষ করেছি । আমার কাছে মনে হয়েছে বই পড়ার সেই পুরোনো অভ্যাসটি আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে । আর এখন অনলাইনে বই অর্ডার করলে বই চলে আসে বাসায় । প্রযুক্তির কল্যাণে বিক্রয় ব্যবস্খাপনা বদলে গেছে !
‘আমাদের কুরআনের বন্ধুরা’ বইটির রিভিউ :
মেঘ, ঢেউ এর জন্য কেনা ছোটদের উপযোগী করে লেখা—‘আমাদের কুরআনের বন্ধুরা’ বইটি আমার পড়ার পাশাপাশি মেঘ এর পাঠ শেষ করেছে এই রমজানে । আমাদের কোরআন শরিফে বিভিন্ন নবী ও রাসূল এর যে বর্ণনা করা হয়েছে তার একটি বাংলা ভাষায় রচিত ছোটদের উপযোগী করে গল্পের আকারে বইটি লেখা হয়েছে । যা এক কথায়—সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন । বইটি পাঠ করে আমার ভালো লেগেছে । যদিও কিছু কিছু কোরআনের কাহিনী অতি সংক্ষেপ করার পাশাপাশি কিছু কিছু ঘটনা খুব দ্রুততার সাথে বর্ণনা করা হয়েছে । মনে হয় শিশুদের কথা বিবেচনা করে এমনটা করা হয়েছে ।
তবে বইটির উল্লেখ যোগ্য দিক হলো— প্রতিটি কাহিনীতে কোরআনের সূরা এবং আয়াত নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রতিটি কাহিনী শেষে ছোট ছোট প্রশ্ন করা হয়েছে, যার উত্তর প্রতিটি কাহিনীতে উল্লেখ আছে। যা পাঠ করলেই উত্তর দেয়া সম্ভব ।বইটির প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে। আর্ট পেপারে ছাপা হওয়া বইটির মান অনেকাংশে ভালো । প্রতিটি কাহিনীতে লেখার পাশাপাশি প্রতিটি পৃষ্ঠায় জলরঙ দিয়ে আঁকা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা বইটির অলঙ্করণ নান্দনিক হয়েছে ।
ইফতার শেষ করে— চায়ের পানের পাশাপাশি একটু সময় নিয়ে বইটি শেষ করেছি । এবং এই বইটি নিয়মিত পাঠের অংশ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত বইয়ের লাইব্রেরিতে স্থান দিয়েছি । ছোটদের কোরআন সম্পর্কে ধারণা পেতে একটা সুন্দর বই ।
মেঘ—তুই তোর একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখিটা চালিয়ে যাস । নিশ্চয়ই তুই ভালো করবি, এটা আমার বিশ্বাস । প্রজ্ঞা হল জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার ।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম গুলোতে তোর অনিয়মিত লেখালেখিটা প্রমাণ করে তুই লেগে থাকলে ভালো করবি।দুনিয়াটা জয় করতে চাইলে নিজেকে জানা এবং দুনিয়াটাকে জানা জরুরী।এটা আমার কথা না জ্ঞানী সক্রেটিসের কথা । আমি শুধু একটু উল্টা-পাল্টা করে বললাম ।
তোর এ কাজে নিয়মিত চর্চা,অধ্যবসায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনা করাটা জরুরী । যা তোর “মা” তোকে দিয়ে যাচ্ছে । অবশ্যই সে তোর জন্য একজন ভালো গাইড । মা— কে কখনো হারিয়ে ফেলবি না !
পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সহজ কাজটা হলো মানুষকে সহজে উপদেশ এবং জ্ঞান দেওয়া । যা আমি তোকে সহজে দিলাম !
তোর জন্য শুভকামনা।
ভালোবাসা / বাবা ডাইরি / ঢাকা, মার্চ ২০২৩ মনিরুল আলম
এই সময়ে তার দূরন্তপনার সাথে পেরে উঠা খুব একটা সহজ নয় ! স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরে, বাবাকে জড়িয়ে ধরে —‘বাবা’ বলে তাঁর সেকি আদর ! তারপর শুরু হয় তার কথামালা, সেখানেও তার সাথে পেরে উঠা দায় ! আহা সময় ! অতঃপর আমার হৃদয়ের মাঝে এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয় ! আহা ভালোবাসা ।
যতো দূর মনে পরে—আমি ছেলেবেলায় বাবার কাছে থেকে খুব দূরে দূরে থাকতাম ! তার প্রতি ছিল খুব ভয় ! বড় হয়েও বাবা-ছেলের মধ্যে সেই দূরত্ব থেকে গেল ! সেই ভয় আর এই জীবনে কাটলো না । বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে ! আজ অনেক আফসোস হয় ! ভদ্রলোক ছিলেন গভীর মনের মানুষ— একজন জ্ঞানী ব্যক্তি । তবে যতো সখ্যতা আর দাবি-দাওয়া ছিল, তা ছিল সব মায়ের সাথে ।
ঢেউ’কে দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা বললে, সবার আগে সে রেডি ! ভাইকে সে বলে, ভাই তুই তাড়াতাড়ি রেডি হ ! আমরা বেড়াতে যাবো না ? অন্য দিকে তার মা তাকে বলে বেশি কথা বললে বেড়াতে যাওয়া কেনসেল !
আমি যতই বলি “মা” বেড়াতে গেলে তুমি কিন্তু দুষ্টমি করবা না, কে শোনে কার কথা ! খোলা জায়গা পেলে তো আর কথাই নেই । আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে- নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে ?
এই ছবিটা সেদিন— অমর ২১শে বই মেলায় তোলা । তার একটা পোট্রট । শত চেষ্টার পর তোলা । যদিও আমি আদর করে, আমার লক্ষী ‘মা’ বলে ডাক দিলেই সে এক দৌড়ে চলে আসে—আমার বুকে ! আমাদের ছোট দুই মানুষদের প্রতি ভালোবাসা । আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া তারা যেন এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, সুন্দর মানুষ হয়ে গড়ে উঠে ।
আমাদের দেশে ছয় ঋতুর ভিভাজন কাল হিসেব করলে এখন চলছে—শরৎকাল। অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাস মিলে শরৎকাল । নীলাকাশে সাদা মেঘেরা এই ঋতুতেই ভেসে বেড়ায় ! আবার হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ জমে, ঝিরিঝির বৃষ্টি সব কিছু ভিজিয়ে দেয় ক্ষণিক সময়ের জন্য । দেখতে খুব অসাধারন লাগে । এটাই এই ঋতুর বৈশিষ্ট ।
সকালে ঘুম থেকে উঠেছি । বারান্দাতে দাঁড়াতেই দেখি গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পরছে ! মানুষজন কেউ কেউ ছাতা মাথায় নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন ! যদিও বেশীর ভাগ মানুষ এই গুড়িগুড়ি বৃষ্টিকে পাত্তা দেন না ! বারান্দায় লাগানো ফুলগাছ গুলোর দিকে তাকাতেই দেখলাম সবগুলো গাছ বৃষ্টিতে ভিজে একাকার ! আমাদের সামনের বাসার টিনের চালা দেওয়া বারান্দা থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার উপর পরছে ! মেঘ-ঢেউ’কে ডাকলাম তারা তখনো ঘুম !
নয়নতারা গাছটিতে বেশ কয়েকটা সাদা রঙের ফুল ফুটে আছে । ফুল এবং পাতাতে বৃষ্টির ফোটা লেগে থাকা এবং তাতে সূর্যের আলো পরায়— বৃষ্টির ফোটা গুলো খুব অসাধারন লাগছে ! যদিও দৃশ্যটি খুব সাধারন খুব সহজেই যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় । কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলেই মনের ভিতরে এক অসাধারন অনুভূতি তৈরি হয়— ভালো লাগে । আমার কাছে মনে হয়, এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া ! যদিও আমাদের বেশীর ভাগ মানুষদের এই সব ছোট ছোট অনুভূতি দিন দিন ভোতা হতে চলছে ! পাশাপাশি করোনাকালীন এই দুঃসময়ে আমরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, প্রযুক্তি নির্ভরতায় অভ্যস্ত হয়ে পরছে আমাদের জীবন . . .
ডাইরি / ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদী শরৎকাল, আশ্বিন ১৪২৮ লেখা ও ছবি: মনিরুল আলম
তখন বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকটাই । আমি বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি । দিনের পুরোটা সময়, এই এলাকাটিতে থাকে, পথচারীদের চলাচল আর নগর যানের দৌরাত্ব !
খেয়ালি— কোন পথচারী খানিক সময়ের জন্য পার্কটিতে একটু বিশ্রাম নিয়ে, আবার চলতে শুরু করেন তার নিজস্ব গন্তব্যে । স্বাস্থ্য সচেতন এলাকাবাসী সকাল-বিকেল এমনকি রাতের বেলাতেও হাঁটেন, নানা বয়সের ভবঘুরে মানুষদের অসঙ্গতি চোখে পরে— পার্কটিতে !
ক্যামেরা ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই চোখে পড়ল, পার্কটির ঊত্তর পাশের সম্প্রসারণ অংশে থোকায় থোকায় ফুটে আছে; বৃষ্টিতে ভেজা ফুলগুলো । আজ মনে হয়, ইচ্ছে মতো বৃষ্টিতে ভিজেছে— ওরা ! ফোটায় ফোটায় বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে তাদের ভিজে যাওয়া শরীর থেকে ।
গাছগুলোর শরীরে লেগে থাকা পানির ফোটার আলোকিত বিচ্ছুরণ—অনেক দূর থেকে দেখা যায় । কোনো কোনো পথচারীরকে দেখলাম, বৃষ্টিতে ভেজা সেইসব ফুলগুলোর সৌন্দর্য দেখছিলেন খানিক দাড়িয়ে ।
ভিজে যাওয়া ফুল গাছগুলোর অনেক গুলো ছবি তোলা হলো । ঘোড়ার গাড়ীর ছুটে চলার শব্দ, রিকশার টুংটাং আর পার্কটিকে ঘিরে থাকা বাসের সেইসব শব্দ পিছনে ফেলে আমি ফিরে চললাম ।
আর হ্যাঁ — আমি যে ফুলটা দেখে আলোড়িত হয়েছিলাম, আমরা তাদের ‘ফুরুস ফুল’ বলে ডাকি . . .
ছোট শিশুদের ফেলে দেওয়া বাথটবে-ই তার জন্ম ! অনেকটা অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে উঠা, এতো ছোট যে অনেক সময় বড়দের ভীড়ে, তাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না, কোথায় যেন হারিয়ে যায়—সে !
কিন্তু ঐ যে, ছোট শিশুদের নিয়ে সব সময় একটা অন্যরকম আকর্ষন থাকে; দেখতে পেলেই তাকে ভালোবাসতে , আদর করতে ইচ্ছে করে । তাকে দেখে আমার কাছে তাই মনে হলো । কিভাবে দাড়িয়ে আছে সে—একাকী সকলের ভীড়ে !
সেদিন—আমাদের ছাদবাগানে নানা লতা-পাতা, গ্লুম দেখতে দেখতে আমি দেখতে পেলাম তাকে । মুগ্ধতা নিয়ে বেশ কিছু ছবি তোলা হলো, তারপর তাকে জানার জন্য চললো কিছু খোঁজ-খবর ।
শহরের মানুষ তাকে ‘পর্তুলিকা’ নামে চেনেন, গ্রামের মানুষেরা তাকে ডাকে তাদের— ঘাস ফুল ।
আর ঘূর্ণিঝড় ‘কায়ান্ট’ সম্পর্কে যতোটুকু জানা গেল, এই নামটি এসেছে মিয়ানমার থেকে। স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ কুমির ! নগরবাসী এই কায়ান্টের প্রভাবে সৃষ্ট ঝিরিঝির বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে আরো দুই দিন . . .