মা—হারানোর দিনগুলো . . .

মায়ের ইন্তেকালের পর আমরা গভীর শোক ও ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে মাকে গোসল করিয়ে ঢাকায় তাঁর প্রথম জানাজা সম্পন্ন করি। সবকিছু যেন অদ্ভুত লাগছিল—বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে এটাই মায়ের সঙ্গে আমাদের শেষ আনুষ্ঠানিকতা।

এরপর ভোরের নিস্তব্ধ আলোয় আমরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই। মায়ের নিথর দেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সে আমি আর বড় মামা নীরবে বসে ছিলাম। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু বুকভরা কান্না আর অসীম শূন্যতা নিয়ে আমরা মায়ের শেষ যাত্রার সঙ্গী হয়েছিলাম।

আমাদের গ্রামের বাড়ির আঙিনা সেদিন ছিল শোকের নীরবতায় আচ্ছন্ন। মায়ের জানাজার সময় আমাদের সব কাজিন ও আত্মীয়-স্বজনেরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে একত্রিত হয়েছিলেন— হিজুলিয়াতে।

সবার চোখে ছিল অশ্রু, হৃদয়ে ছিল গভীর বেদনা—প্রিয় মাকে শেষ বিদায় জানানোর ভারী মুহূর্ত। মেঘ এবং ঢেউয়ের চোখে ছিল গভীর বেদনা তারা তাদের প্রিয় দাদীকে হারিয়ে খুব নীরবে হয়ে গিয়েছিল!

২০২৫ সালের ১৫ মে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে আমাদের প্রাণপ্রিয় মা জননী এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। তাঁর শূন্যতা আমাদের জীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতা হয়ে থাকবে।

এর অনেক আগেই, ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর, আমাদের প্রিয় বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। বাবা-মা দু’জনের স্মৃতি আজও আমাদের হৃদয়ে অমলিন, তাঁদের ভালোবাসা ও আদর্শই আমাদের চলার পথের শক্তি।

‎رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]

অর্থ : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন।’
(সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

হিজলের ছায়া তলে তোমার দিয়েছো—এক গভীর ঘুম!
ভালো থেকো আমাদের প্রিয় বাবা-মা . . .

নোট: ছবিতে আমার চাচা ( চাচার হাতটি ধরে আছেন ইকতিয়ার ভাই ) এবং কাজিনরা ও আত্মীয়-স্বজনেরা জানাজার জন্য কবরস্থানের পাশেই মাঠে যাচ্ছিলেন ।

ছবি © মনিরুল আলম

ডাইরি / মে ২০২৫ হিজুলিয়া
ছবি © মনিরুল আলম

বাবাতো এখন ফ্রেমে বন্দি একখানা ছবি . . .

ছবি : ছবিটি আমাদের পারিবারিক ছবির অ্যালবাম থেকে সংগ্রহ করা। ছবিটিতে প্রথম সারিতে বসা, ডান দিক থেকে তিন নম্বর আমাদের বাবা ।

সারা দেশেই চলছে তাপপ্রবাহ, বাইরে বের হলেই প্রচন্ড হাঁসফাঁস লাগে, আবহাওয়া অধিদপ্তর কাছে কোন সুখবর নেই, তারা জানিয়েছে, আগামী পাঁচদিন এই গরম থাকবে । তবুও জীবন বহমান নদী—আমাদের সেই বিশাল জীবনের পথ বয়ে চলে হয়— কখনও উজানে কখনও বা ভাটায় ।

অনেক দিন হয় মা’কে গোসল করানো হয় না । আজ দুই ভাই মিলে মা’কে গোসল করালাম। কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে বেচারা ! প্রায় চার বছর হলো একই অবস্থা, অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে যাচ্ছেন জননী আমার ।

দুই ভাই মিলে যখন মা’কে নিয়ে বাথরুমে যাচ্ছি—তখন বাবার ছবিটার দিকে একনজর তাকালাম, আহা ! বাবা আমার । বাবা যেন সবকিছু দেখছেন ! দেয়ালের ফ্রেমে বন্দি হয়ে থাকা বাবা’কে অনেক প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় ! কিন্তু বাবাতো এখন ফ্রেমে বন্দি একখানা ছবি ।

ঢাকা আইনজীবী সমিতি কার্যকরী পরিষদের সদস্যদের সাথে আমাদের প্রিয় বাবা, আব্দুল মোন্নাফ তালুকদার ( ছবিটিতে প্রথম সারিতে বসা, ডান দিক থেকে তিন নম্বর, আমাদের বাবা ) । তখন তিনি ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী পরিষদের ( ১৯৮২-৮৩ ) সাধারন সম্পাদক ছিলেন । সেই সময়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নানা অনুষ্ঠানে আমরা অনেক সময় অংশগ্রহণ করতাম । এখন সেই সব শুধুই স্মৃতি।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির বার লাইব্রেরিতে গেলে এখনো দেখা যায়— আইনজীবী সমিতির কর্তৃপক্ষ আমার বাবার একটা পোট্রট এবং এই গ্রুপ ছবি সংরক্ষণ করছেন ।

বাবা সেই ১৯৯০ সালে ( হেমোরেজিক স্ট্রোক ) মস্তিস্কের রক্তক্ষরণের কারণে ইন্তেকাল করেন । আমরা বাবা’কে আমাদের গ্রামের বাড়ী, হিজুলিয়ার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি ।

আমাদের বাবা-মা দুজনের জন্য দোয়া চাই । আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের বাবা-মা এর সকল গুনাহ মাফ করেন, তাদেরকে শান্তিকে রাখেন, আমার মা’কে সুস্থতা দান করেন । রব্বানা ইন্নান আমান্না ফাগফিরলানা জুনুবানা ওয়াক্বিনা- আজাবান্নার।

বাবা— কী এক অদ্ভুত এই আমি ! আজ কতদিন—কতমাস হলো দেখতে যাওয়া হয় না— তোমার কবর ! অথচ ঘোরলাগা এই জগৎ, সমাজ, সংসার, সময় দিব্বি চলে যায়— কিম্ভূতকিমাকায় !

ঐ দিকে তোমার সমাধি আজো দেখা যায়; চৌত্রিশ বছর পর; একা একা শুয়ে আছো—সেই হিজলের তলায় !
ঘাস ফড়িং, শালিকেরা উড়ে যায়; সেইসব শেয়ালের ডাক শোনা যায় ! অথচ তোমার সমাধিতে তুমি যেন এক অনন্য নিথর—মানবআত্মা !

নোট: ছবিটি আমাদের পারিবারিক ছবির অ্যালবাম থেকে সংগ্রহ করা। ছবিটিতে প্রথম সারিতে বসা, ডান দিক থেকে তিন নম্বর আমাদের বাবা ।

ডাইরি / এপ্রিল, ২০২৪
ঢাকা, বাংলাদেশ
© মনিরুল আলম

মায়ের বিজন মুহুর্ত গুলো . . .

মায়ের এই ছবিটি আমাদের সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের সময় তুলেছিলাম, ২৭ নভেম্বরের ২০১০ সালে । ছবি: মনিরুল আলম

মায়ের বিজন মুহূর্ত গুলো এখন কোমাতেই কাটে ! আহা— কি ভিষণ সেইসব কষ্ট ! কি ভীষণ সেই সব সময় গুলো পার করছেন, জননী আমার । মাঝে মাঝে যখন গভীর অন্ধকার থেকে চেতনা গুলো ফিরতে শুরু করে তখন মনে হয়, আমাদের ‘মা’ যেন একদম স্বাভাবিক মানুষ । সবার খোঁজ-খবর করেন, পরিবারের ছোট সদস্যটিকে কাছে টেনে নেয়, ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিতে ভেসে বেড়ান ! মায়ের চোখে তখন আলোর ঝিলিক দেখা যায় ।

সেদিন বুবলী পোলাও মাংস রান্না করেছিল । ‘মা’ কে বল্লাম তুমি কি পোলাও-মাংস খাবে ? রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে, তোমাকে কি দেবো একটু । ‘মা’ খেতে রাজি হলেন, বল্লেন— যা নিয়ে আয় । বড় ভাই— যত্ন করে সেই খাবার খাওয়ালেন। খাবার শেষ করে ‘মা’ বল্লেন —বাবা, আমাকে এশার নামাজটা পড়িয়ে দে । নামাজ শেষে দোয়া করলেন সবার জন্য । তারপর ধীরে ধীরে সেই বিজন অন্ধকারে চলে যেতে লাগলেন !

সময়ের হিসাবে মায়ের অসুস্থতা প্রায় সাড়ে তিন বছর হতে চললো ! স্বজনরা এখনো কেউ কেউ মায়ের খোঁজ খবর করেন । যদিও সময় এবং জীবনের বাস্তবতাটা ভিন্ন কথা বলে ! আমরা পরিবারের সবাই মিলে মায়ের সেবা করে যাচ্ছি। তিন ভাই-বোনের সান্তনা এটাই আমাদের ‘মা’ বেঁচে আছেন—আমাদের সাথে আছেন । আল্লাহ তা’য়ালার কাছে তার পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন । নিশ্চই আমাদের রব তার প্রতি রহম করবেন, তার ভূলত্রুটি গুলো ক্ষমা করবেন । মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিশ্চই আমাদের ‘মা’ কে নেক হায়াত দান করবেন । আল্লাহ তা’য়ালার কাছে এই দোয়া করি সবাইকে যেন তিনি শান্তিতে রাখেন . . .

ডাইরি / ঢাকা, জানুয়ারি, ২০২৪
ছবি: © মনিরুল আলম

বাবা . . .

মানিকগঞ্জের হিজুলিয়ায় আমাদের কবরস্থান, ১৯৩৭ সালে এটা স্থাপিত হয় । ছবিটি ২০, ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম

বাবা— কী এক অদ্ভুত এই আমি ! আজ কতদিন—কতমাস হলো দেখতে যাওয়া হয় না— তোমার সমাধি ! অথচ ঘোরলাগা এই জগৎ, সমাজ, সংসার, সময় দিব্বি চলে যায়— কিম্ভূতকিমাকায় ! ঐ দিকে তোমার সমাধি আজো দেখা যায়; তেত্রিশ বছর পর;

একা একা শুয়ে আছো—সেই হিজলের তলায় ! ঘাস ফড়িং, শালিকেরা উড়ে যায়; সেইসব শেয়ালের ডাক শোনা যায় ! অথচ তোমার সমাধিতে তুমি যেন এক অনন্য নিথর—মানবআত্মা !

ডাইরি / পুরান ঢাকা

মে ২০২৩ ছবি : মনিরুল আলম

ছবি: পোট্রট ছবিটি ফ্যামেলি অ্যালবামে থেকে সংগ্রহ ।

ক্যামেরা কাঁধে আবার ছুটবেন তিনি . . . 

© Monirul Alam

অনেক দিন পর আবীর ভাইয়ের সাথে দেখা হলো আজ ! ল্যাবএইড হাসপাতালে এসেছেন চেক আপ করাতে । তার হাতের অবস্থা আগের থেকে অনেকটা ভালো । আনন্দের সংবাদ হলো— এই সপ্তাহ থেকে আবার কাজ শুরু করছেন । আমরা, এই মানুষটিকে নানা আ্যসাইমেন্টে আবার দেখতে পাবো—ক্যামেরা কাঁধে ছুটে চলছেন । 

সবাই আবীর ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন . . . 

ল্যাবএইড হাসপাতাল

ধানমন্ডি, ঢাকা

অক্টোবর ২০১৬

সত্য এবং সুন্দরের গল্প . . . 

© Monirul Alam
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি।

চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।

তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে . . . 

[ সৈয়দ শামসুল হক ] ২৭ ডিসেম্বর ১৯৩৫ – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

প্রয়াত কবি—সৈয়দ শামসুল হকের সাথে সেই অর্থে, আমার কোন স্মৃতি নেই ! নেই কোন দৃশ্যপট । স্মৃতির অতলে খুঁজে ফিরি সেই সব দৃশ্যপট । সেখানে দেখা দেন আর এক প্রয়াত কবি—শামসুর রাহমান ! মনে পরে তার শ্যামলী রোডের দোতলা বাসায় একবার ছবি তুলতে গিয়েছিলাম—আমরা । কবি এবং কবি পরিবারের চমৎকার সমাদরে আনন্দিত হয়েছিলাম সে দিন ! 

কবির একটা কথা আজও আমার খুব মনে পরে । কবির সাথে আমার প্রথম স্বাক্ষাতে তিনি বলেছিলেন— এই যে, আপনাকে আমি চিনি । আপনার মুখটা আমার অনেক দিনের পরিচিত । আমি তার সেই কথায় পুলকিত হয়েছিলাম, ছোট হাসি হেসেছিলাম । আর মনে মনে, ভাবছিলাম এতো বড় একজন কবি আমাকে কি ভাবে চেনেন ! আর আমাকে কিভাবেই বা মনে রাখলেন ! 

সময়টা ছিল ২০০১ সাল— তখন আমি পাঠশালায় কাজ করি, ফটোগ্রাফী করি । সেই সময়ে প্রথম আলো পত্রিকায় আমার একটা লেখা ছাপা হয়েছিল চিঠিপত্র বিভাগে। লেখাটির শিরোনামটি ছিল ‘রক্তাক্ত আমার পহেলা বৈশাখ’ । পহেলা বৈশাখের দিন রমনা বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় দশজন নিহত হয়েছিলেন । সেই বিষয় নিয়ে আমার একটা অনুভূতির কথা লিখেছিলাম। ছাপা হয়েছিল ছবি সহ, পত্রিকাটিতে । 

আমার যতো দূর মনে পরে তার দুই/এক দিন পরে বাসায় বসে টিভি দেখছিলাম— এ চ্যানেল ও চ্যানেল দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি চ্যানেল আইতে কবি সৈয়দ শামসুল হক আমার লেখা, ছাপা হওয়া সেই চিঠিটি পড়ছেন ! সেই অনুষ্ঠানটি দেখে সেদিন আমার একটা অন্য রকম অনুভূতি হয়েছিল— মনে ! এরকম একজন কবির কন্ঠে আমার পুরো চিঠিটি আবৃত্তি শুনে যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম । 

তারপর এই মানুষটির সাথে আমার পেশাগত কারনেই দেখা হয়েছে বার কয়েক নানা অনুষ্ঠানে । দূর থেকে মানুষটাকে দেখেছি, তার সম্পর্কে জেনেছি, তার ছবি তুলেছি । যতোদূর মনে পরে তার কয়েকটা পোট্রেট তুলেছিলাম, হয়তো এখন তা হারিয়ে ফেলেছি ! 

সেদিন তার বিদায় অনুষ্ঠানে ছিলাম বাংলা একাডেমিতে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে । শত মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ফুলে সিক্ত হলেন কবি ! তারপর— চিরদিনের মতো যাত্রা শুরু করলেন, আমাদের কবি । যেখান থেকে আর কখনো কোন মানুষ ফিরে আসে না ! এই বাংলার অন্যতম সেরা ভাষাশিল্পী, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক— আপনাকে অভিবাদন ! 

পুরান ঢাকা, পাতলা খান লেন

সেপ্টেম্বর ২০১৬