সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা . . . 


প্রথমে আপনাকে ভাবতে হবে— পত্রিকার জন্য একটি প্রেজেন্টেবল ছবি । অথার্ৎ হাতের ছবিটি তুলে তার পর শিল্প ! মনে রাখতে হবে, আমার ছবিটা যেন পাঠক আকৃষ্ট হয়। খবু সহজেই ছবিটি পাঠকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করতে পারে । আমি বিকাশ’দার সাথে এক মত, বিশেষ করে —যারা নিউজ ফটোগ্রাফী করেন, তাদের জন্য কথাটি খুব প্রযোজ্য ।

এক জন নিউজ ফটোগ্রাফারকে প্রতিদিন একটা ভালো ছবি তোলার জন্য চেষ্টা থাকতে হবে । হয়ত, প্রতিদিন ভালো ছবি হবে না, কিন্তু চেষ্টা থাকাটা জরুরী । দীঘর্ অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে মনে হয়— একটা ভালো ছবি তোলা খুব সহজ নয় ! ছবির কম্পোজিশন,লাইট, নিউজ কনটেন্ট, ক্রিয়েটিভিটি বিষয় গুলো প্রতিদিনের চচর্ার মাধ্যমে তৈরি হবে—নিজের মধ্য ।
কলকাতা থেকে এপি’র ফটোসাংবাদকি বিকাশ দাশ এসেছিলেন, বাংলাদেশে টি-টোয়েনটি ওয়াল্ডর্ কাপ ২০১৪ কাভার করতে। পাভেল ভাইয়ের আমন্ত্রণে তিনি এসেছিলেন প্রথম আলোর অফিসে গত ২৪ মাচর্, ২০১৪ । সেখানেই তার কাজ দেখা, ফটোগ্রাফী নিয়ে আলোচনা হয়েছিল । সংবাদপত্র বা এজেন্সিতে কাজ করার দীঘর্ অভিজ্ঞতা গুলো তারা শেয়ার করেছিলেন সেদিন ।
লেখার সাথে পোষ্ট দেওয়া ছবিটি ১৯, জানুয়ারি, ২০১২ সালে প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল—এর নেপথ্যের ঘটনাটি হয়ত আর এক দিন বলা যাবে . . .

১৩, সেপ্টেম্বর,২০১৫

পাতলা খান লেন, পুরান ঢাকা

বেঁচে থাকা নিয়ে যাদের যুদ্ধ . . . 

কখনো বাসে- কখনো রিকশায়। মটর সাইকেল কিংবা ভ্যান । আবার কখনো পায়ে হেটে,কখনো বা নদী পথে— অবিরাম ছুটে চলা— সঙ্গী ক্যামেরা, সেলুলার আর ডাইরি । এই সব নিয়ে আমার—ছোট ছোট কথা . . .

 

ছবি: মনিরুল আলম

তেজগাওঁ রেলওয়ে বস্তির মধ্য দুপুর। খবর রটে যায় বস্তি উচ্ছেদের । চারিদিকে চিৎকার-চেঁচামেচি,কান্না আর ভাঙ্গনের শব্দ- আতংকিত মানুষের ছুটোছুটি। ৬৫ বৎসরের বৃদ্ধা শহরবানু দিশেহারা হয়ে পড়েন। নিজের ঝুপড়ি ঘর থেকে বেড়িয়ে নাতনির হাত ধরে রেল লাইনের উপর বসে পড়েন। স্বামীর হাত ধরে বেঁচে থাকার জন্য গ্রাম ছেড়ে ছিলেন সেই কবে—আজ আর মনে নেই। স্বামী হারা হয়েছেন দীর্ঘদিন। এখন সন্তানই একমাত্র ভরসা ! তেজগাওঁ এর এই ঝুপরিতেই দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। আজ রেল লাইনের উপর বসেই দেখলেন, তার ঝুপড়ি ঘরটি ভেঙ্গে ফেলা হলো ! শহরবানু নিজের মনেই বলে উঠেন, খোয়াবের শহর ! স্বামী হারা হইছি এই ঢাকা শহরে আইস্যা,মরলে এই হানেই মরুম ! ততোক্ষণে হুইসেল দিয়ে ট্রেন ছুটে আসে । ট্রেনের খট খট শব্দে শহরবানুর কথা মিলিয়ে যায় বাতাসে . . .
কামরাঙ্গীর চর তখন সকাল দশটা। হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়-আপনাদের প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিন। এখনই উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। চরবাসী রাজ্যের শক্তি নিয়ে যেন নেমে পড়ে। মাটির চুলা,থালাবাটি,ছটি ঘরের সন্তান, ঘরের বেড়া,প্রিয় ছাগল/মুরগীর খামার,আজমীর শরীফ, শাবনুরের পোস্টার আর বেঁচে থাকার সব অবলম্বন নিয়ে চরের সড়ক ধরে দৌড় দিতে হয়। বুলডোজারটি পিছন পিছন ছুটে আসে। কারো কারো শেষ রক্ষা হয়ে উঠে না। গ্রাম থেকে চলে আসা ভিটেহীন এসব মানুষের- শহুরে বস্তিতেও ঠায় হয় না। প্রিয় মানুষ,বৃদ্বা মা আর সন্তানের দিকে তাকিয়ে ছুটতে হয়। তারপর ক্লান্ত শ্রান্ত ছোট দেহটি খোলা আকাশের নিচে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে . . .
তেজগাওঁ পুরান এয়ার পোর্ট এলাকা তখন বিকেল ভর করেছে। আশ্রয়ের সব কিছু তখন মাটির সাথে মিশে আছে। জীবিত মানুষ গুলো শুধু বেঁচে আছে-বেঁচে থাকতে হবে বলে ! আট মাসের ময়না-খোলা আকাশের নিচে খড়খুটোর মধ্যে শুয়ে থেকে চিৎকার করে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত। এই শীতের বিকেলে তার যেন কোথায় থাকার কথা ছিল তার ? আর ঐ দিকে ময়নার বাপ- মেয়েকে জন্ম দিয়েই কোথায় যেন হারিয়ে গেছে—সেই কবেই। অথচ অনেক শখ করে ময়নার বাপের হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে ছিল শিউলি— জুয়ার শহর এই ঢাকা বস্তির ঐ ঘরটাই ছিল তার বেঁচে থাকার একমাএ ঠিকানা। ময়নার বাপের জন্য অপেক্ষার ঠিকানা হারিয়ে শিউলি এখন নির্বাক। শুন্য আকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে আর ভাবে পরের রাতটা কোথায় কাটাবে . . .

শ্যামপুর গাজীর হাট এলাকায় তখন সকাল। মমতা বেগম কাখের কলসি ফেলে ছুটে আসে- তার ঘর বাঁচাতে ! সরকারের জায়গাতেই চারশত টাকা ভাড়া দিয়ে থাকতেন বাপ মরা মেয়েটিকে নিয়ে। সারা দিন দোকানে দোকানে পানি টেনেই চলতো তাদের দুই জনের সংসার । এক পা ভাঙ্গা— চৌকিটা নিজেই একা টেনে বের করার চেষ্টা করেন,আর বিলাপ করতে থাকেন। ঐ দিকে আতংকে ছুটতে থাকে মেয়ে বাহারজান ! তার জীবনে এটাই প্রথম উচ্ছেদ হওয়া। মা/মেয়েরে কান্নায় গাজীর হাটের বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও—বুলডোজারটি ঠিকই গুড়িয়ে দেয় ওদের ঘর ! ছাপড়া ঘর আর পা ভাঙ্‌গা চকিটি মমতা বেগম অনেক আকুতি করেও শেষ রক্ষ করতে পারে না । মমতা বেগম নিজের মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে শান্তনার সুরে বলেন-আমাগো আল্লাই দেখবো মা . . .

পুরান ঢাকা ,আগস্ট, ২০০৭

পদ্মার ঢেউ রে . . .

 

© Monirul Alam

 

নদী পাড়ের ভূমিতে ভাঙ্গনের ক্ষত চিহ্ন ! বিধ্বস্ত গ্রাম—উপড়ে আছে গাছ, মাটি ফেটে প্রবেশ করছে স্রোতের পানি ! নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে এ জনপথ ! অথচ পদ্মা যেন নিবর্িকার ! সে কেবল ছলছল, খলখল করে সামনের দিকে ছুটে চলছে . . .

তখন সকাল ৭.৩০ মিনিট । আমাদের মটর সাইকেল ছুটে চলছে ঢাকা-মাওয়া সড়ক অভিমুখে । আমার সঙ্গী হয়েছেন আলোকচিত্রী নিরব হোসেন মুকিত । উদ্দেশ্য পদ্মা নদী পাড়ের এলাকা ঘুরে দেখা—মানুষের সঙ্গে কথা বলা । তাদের সুখ-দু:খের জীবন সম্পকের্ জানা ।
মটর সাইকেলে যেতে যেতে মুকিত বলেলন, ভাই খবর পেলাম লৌহজংয়ের খড়িয়া গ্রামের অনেকাংশ পদ্মার ভাঙ্গনের বিলিন হয়ে গেছে, সেই গ্রামে যাওয়া যেতে পারে । আমি তাকে বললাম ঠিক আছে । তাহলে আগে সেখানে ভাঙ্গন পরিস্থিতি দেখে আসি তারপর না হয় অন্যান্য এলাকায় যাওয়া যাবে ।
পথে যেতে যেতে বেশ কিছু ছবি তোলা হলো । বষর্ার পানিতে টইটুম্বুর চারিদিক—বাঁশের সাঁকো, নৌকা আর জেলেদের মাছ ধরার সেই সব দৃশ্য ! ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে সেই সব ছবি তুলতে তুলতে মনে মনে আর একবার গাইলাম— আমার সোনার বাংলা, আমি তোমার ভালবাসি . . .
অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে একটা মুদি দোকানে থামলাম আমরা । দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, খড়িয়া যাবো ? সে আমাদেরকে বলল, এই পথে যেতে যেতে আগে ‘হইলদা” বাজার পড়ব । হেরপর হইলদা বাজারে গিয়া কাউরে জিগাইলে ‘খইড়া’ যাওনের রাস্তা দেখাই দিব । এক লিটারের একটা পানি কিনে আবার যাত্রা শুরু করলাম। পথে আরো কিছু মানুষকে জিজ্ঞেস করে করে সঠিক পথটা জেনে নিচ্ছিলাম—অতপর খড়িয়া গ্রাম ।
গ্রামটির প্রবেশ মুখেই দেখলাম—একটি তিন চাকার শ্যালো যানে করে ভেঙ্গে আনা ঘর-বাড়ী নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । মটর সাইকেল থামিয়ে ছবি তুললাম—কথা হলো তাদের সাথে, মুল ভাঙ্গন এলাকাটিতে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে তা জেনে নিলাম । আমারা যেখানে থামলাম সেখান থেকে মূল সড়কটি বিলীন হয়ে গেছে । মটর সাইকেল আর সামনের দিকে যাবে না। আমাদের সামনে বিধ্বস্ত এক গ্রামের চিত্র !
গাছ গুলো কেটে ফেলা হয়েছে —মূলকান্ডটির ন্যাড়া হয়ে পরে আছে । কোথাও ন্যাড়া কান্ডটির শেকর বেড়িয়ে মাটি আর পানিতে ঝুলে আছে ! এখন শুধু অপেক্ষা নদী গর্ভে যাবার ! কোথাও কোথাও বসতবাড়ির শুধু মাটি মাটির চিহ্ন টুকু আছে, দেখলে বোঝা যায় এখানে মানুষের বসতি ছিল— ছিল ঘর-বাড়ী, ছিল সাজানো সংসার । মূল সড়কটি কোথাও কোথাও ভেঙ্গে পড়েছে সেই ভাঙ্গা সড়কটির উপর রাখা হয়েছে ভাঙ্গা বসতবাড়ির আসবাপত্র— এখন অপেক্ষা শুধু তা অন্যত্র নিয়ে যাবার । সাজানো এই গ্রামটি তছনছ হতে সময় লেগেছে মাত্র এক সপ্তাহ !
অথচ আনোয়ার শেখের, নিজ হাতে লাগানো ৬টি তাল গাছের বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর ! বয়স্ক মানুষটি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া সেই তাল গাছ গুলোর কথা কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না, তাল গাছ গুলো হারানোর শোকে নিরবে কাঁদছিলেন, বলেলন ঐ গ্রামের গৃহবধু শিরিন, সে ঢাকায় থাকেন । প্রতিদিন ঢাকা থেকে এখানে আসেন তাদের বাড়ীটি দেখতে । তিনি আরো জানালেন, তাদের আম বাগান ছিল তা এখন নদী গর্ভে ! বাড়ীটির কি হয়? সেই চিন্তা তার মাথায় সারাক্ষণ ।
৮৫ বছরের ইমান আলী, শূণ্য ভিটার উপর দাঁড়িয়ে পদ্মার দিকে তাকিয়ে ছিলেন— হয়ত মনে পরে গিয়েছিল তার কোন স্মৃতি ! তার এই দীর্ঘ জীবনে কতশত বার এই নদীর ঢেউ দেখেছেন, তা কি আর মনে আছে আজ ! বৃদ্ধ মানুষটির সাথে কথা হলো । এলকাবাসীর জানালো কেউ কেউ ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে সড়কের পাশের পরিত্যক্ত স্থানে। সেখানেও তারা পানিবন্দী হয়ে আছে, সাময়িক ভাবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেছে এলাকাবসী । প্রাকৃতিক এই দূর্যোগকে নিজেদের মতো মোবাবেল করছেন তারা । উদ্যোমি এই মানুষ গুলো প্রাণ শক্তি অনেক। তাদের সাথে কথা বলে বোঝা গেল । সরকারের কতর্া ব্যক্তিরা এসেছিলেন গ্রামটি দেখে গেছেন প্রয়োজনীয় নিদের্শ দিয়ে চলে গেছেন ! আরো খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল—লৌহজং উপজেলার পুরনো মাওয়া ফেরিঘাট, শিমুলিয়া, হলদিয়ার এবং কুমারভোগের এলাকায়ও পদ্মা ভাঙ্গন চলছে তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই খড়িয়া গ্রামটি। আমরা এলাকাটি নিজেদের মতো ঘুরে ঘুরে দেখলাম তোলা হলো কিছু ছবি ।
নদী পাড়ের ভূমিতে ভাঙ্গনের ক্ষত চিহ্ন ! বিধ্বস্ত গ্রাম—উপড়ে আছে গাছ, মাটি ফেটে প্রবেশ করছে স্রোতের পানি ! নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে এ জনপথ ! অথচ পদ্মা যেন নিবর্িকার ! সে কেবল ছলছল, খলখল করে সামনের দিকে ছুটে চলছে . . .
গ্রামটি থেকে বেড়িয়ে আমাদের মটরসাইকেল মাওয়া ফেরিঘাটের দিকে যাত্রা শুরু করলো— সেখানেও ভাঙ্গনের চিত্র স্পষ্ট ! নদী পাড়ের দৈনন্দিন জীবন কিছু চিত্র চোখ পড়ল—নদীর পাড়ে বসে থাকা, কেউ কেউ কাজ শেষ করে নদীর পানিতে গোসল করছেন, কেউবা মাছ ধরছেন—জীবন থেমে থাকে না ! জীবন বহমান ! এবার ফিরে চলার পালা— আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবনে আরো কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যার যার গন্তব্যে . . .

৩১, আগস্ট, ২০১৫
খড়িয়া গ্রাম, লৌহজং,মুন্সিগঞ্জ

 

© Nirob Hossen Mikit