ঢেউ এর হাঁটতে শেখা . . .

ছোট ‘ঢেউ’ তার দাদীর ঘরের সামনে দাড়িয়ে, বয়স ১৪ মাস, সে সবে হাঁটতে শিখেছে ! এই ঘরটির সাথে আমাদের পরিবারের অনেক অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে । ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ । পুরান ঢাকা © Monirul Alam

তবু— স্মৃতিরা নানা কথা কয় . . .

31946219_10160370396175707_9074955413262172160_n
আমাদের প্রিয় নানী আনোয়ারা খানম | ছবি: মনিরুল আলম

সকাল বেলা বুবলী আমাকে জানালো—নানী মারা গেছেন ! আমি মা’র রুমে গেলাম ; দেখি মা সোফায় বসে কান্না-কাটি করছেন | বড় মামা ফোন করে জানিয়েছেন — তাদের মা আর নাই ! আমি ছুটলাম ওয়ারীর সালাউদ্দিন হাসপাতালে | নিথর দেহটা এক পাশে কাত হয়ে আছে; দেখে মনে হচ্ছে ঘুমাচ্ছেন ! নানী মারা যাবার সময় বড় মামা-মামী উপস্থিত ছিলেন | মামার কোলেই নানী শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ! দিনটি ছিল—২৬ এপ্রিল ২০১৮ বৃহস্পতিবার সকাল নয়টা| নানী অসুস্থ হবার পর আমার এই বড় মামা-মামী সারাক্ষণ নানীর সেবা যত্ন করতেন |

নানীর সাথে আমার খুব একটা দেখা হতো না | অযুহাত হলো— সময় এবং ব্যস্ততা | কিন্তু নানী ঠিক খোজ-খবর রাখতেন সবার, তার নাতি-নাতনি আর নাত বউদের,তাদের সন্তানদের | নানীর বাসায় গেলে আমাদের জমিয়ে আড্ডা হতো| এই নানীর বাসাকে কেন্দ্র করে আমার ছোট বেলায় বেড়ে উঠা | স্কুল ছুটি শেষে আমরা নানীর বাসায় যেতাম,বাসার পিছনে বেশ কিছু ফলের গাছ ছিল—ছিল খেলার জায়গা; সেখানে আমরা বন্ধুরা মিলে খেলা-ধূলা করতাম |

ছোট বেলায় নানীকে খুব ভয় পেতাম | বড় হয়ে সেই নানী বন্ধু হয়ে গেল—হয়ে গেল প্রিয় মানুষ | নানী আমার বাবা’কে কখনো জামাই বলতেন না, বলতেন—তোর বাপ হইলো আমার আর এক—বেটা | আমার বাবা’কে সে খুব ভালোবাসতেন | প্রচন্ড ভালোবাসতেন তার বড় নাতিকে ( আমার বড় ভাই ) এই পরিবারে তাদের বড় নাতি ছিল—মধ্যমনি | বড় নাতিও ছিল নানা-নানীর অন্ধ ভক্ত |

নানী মারা যাবার এক সপ্তাহ আগেও নানীকে কোলে করে নিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে গাড়ীতে উঠানো হলো হাসপাতালে নেওয়ার জন্য | বড় নাতির কোলে করে নানী সেই যে বাসা থেকে বের হলেন— ফিরলেন নিস্তেজ—নিথর হয়ে ! চির দিনের জন্য চলে গেলেন—না ফেরার দেশে |

হ্যাঁ—আমাদের নানীর বয়স হয়েছিল, কিন্তু মানুষের মন কখনো আপনজনকে হারাতে চায় না ! আর তাইতো আমাদের অভিমানী ছোট মামা ( মনু মামা ) তার মায়ের বিছানায় বসে—মায়ের রেখে যাওয়া স্মৃতি খুঁজে ফেরেন ! নীরবে চোখের পানি ফেলেন ! বড় একা হয়ে গেলেন আমার এই অভিমানী মামাটি ! আর সেজ মামা সেতো খানিকটা অসুস্থা ! মায়ের জন্য দোয়া পড়ছেন সারাক্ষণ ।

আমার পাঁচ মামা আর তিন খালা এবং আমার মা—তাদের বাবা-মা’র প্রতি ছিল প্রচন্ড আবেগ তাড়িত —ভালোবাসা ! যদিও নানী’কে তার সব সন্তান ভয় পেতেন খুব | অন্য দিকে তাদের পুলিশ বাবার কাছে ছিল—নানা প্রশ্রয় | নয় ভাই বোনের এই বিশাল সংসার— নানী একা সামাল দিতেন | মানুষকে প্রচন্ড ভালোবাসার ক্ষমতা ছিল— আমাদের এই নানীর |

মেজ মামা আমাকে একদিন ফোন করে বললেন—তোর নানীর একটা ছবি তুলে দিস, ব্যাংকে লাগবে | আমি শত ব্যস্ততা এড়িয়ে নানীর এই ছবিটি তুলেছিলাম | এই ছবিটা আমার কাছে—এক টুকরো স্মৃতি হয়ে থাকলো | আর উত্তরকালের প্রজন্ম হয়তো—এই ছবিটি দেখে জানবে তাদের অতীত ইতিহাস| এই রকম একজন ছিল—একদিন; সে আর নাই কোন দিন . . .

পুরান ঢাকা | ৪ মে ২০১৮
ছবি: মনিরুল আলম

কইন্যার নাম দিলাম ‘ঢেউ’ . . . 

© Monirul Alam / WITNESS PHOTO
আমাদের কইন্যারে নিয়ে এখনো উদ্বেগ, উৎকন্ঠা কাটে নাই ! দশ দিন হাসপাতালে থাকার পরও তার উপর এখনো চলছে ডাক্তারের নানা পরীক্ষা—এই টেষ্ট ঐ টেষ্ট ! যদিও তার অন্যান্য সব রিপোর্ট ভালো তবে তার বিলোরবিনের পরিমান এখনো বর্ডার লাইনে আছে । ডাক্তার বললেন, রোদে দেওয়া লাগবে। কিন্তু রোদের দেখা নাই ! এই রোদ আবার এই বৃষ্টি ! ডাক্তার আরো জানালেন, বিলোরবিনের পরিমান বাড়তে থাকলে আবারও তাকে ফটোথ্যারাপি দেওয়া লাগবে ! আল্লাহ সহায় । আল্লাহ যেন—আমাদের বাবুটা’কে সুস্থতা দান করেন । 

তার নাম দিলাম ‘ঢেউ’ ! মেঘের বোন—ঢেউ । নবজাতক পেটে থাকতেই, আমরা তার নাম কি রাখা হবে সেটা ভাবছিলাম, হঠাৎ করেই এই নামটা মাথায় আসলো । ছেলে হোক বা মেয়ে তার নাম রাখা হবে —ঢেউ । মেঘের সাথে মিলিয়ে কইন্যার নাম রাখা হলো—ঢেউ । মেঘের মা অবশ্য খাতা-কলমের জন্য একটা নাম ভেবে রেখেছে ! আল্লাহর রহমতে তার আকিকাটা দিয়ে নামের কাজটি সম্পন্ন করতে চাই । 

সবাই আমাদের কইন্যা ‘ঢেউ’ এর জন্য দোয়া করবেন . . . 
পুরান ঢাকা 

২৪ জুলাই ২০১৭ 

আমি এখন স্মার্ট নাগরিক . . .

19030589_10158863619995707_8469355625031083945_n
© Monirul Alam / WITNESS PHOTO

আজ রাতে—সেহেরি না খেয়েই রোজা রাখতে হয়েছে ! আমাদের পরিবারের কেউ, সেহেরির রাতে ঘুম থেকে উঠতে পারেনি । যদিও আমার ঘুমাতে ঘুমাতে বেশ রাত হয়েছিল । তবুও সেহেরির সময়— আমার ঘুম ভাঙ্গেনি । লালকুঠিতে আমাদের কাউন্সিলরের কার্যালয়ে, জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার সময় কথা হচ্ছিল এলাকার—সানি চাচার সাথে । সেও গত রাতের সেহেরিতে ঘুম থেকে উঠতে পারেনি । তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর করছিলাম । এখন সে একা বেলেন্স করে চলতে পারেন না কষ্ট হয়— আরেক জনের সাহায্য নিতে হয় । মসজিদে যাওয়া হয়ে উঠে কম । বাড়ীতেই নামায আদায় করেন । স্মার্ট কার্ডটি আনতে গিয়ে দেখা হলো এলাকার আরো অনেক মুরুব্বীর সাথে কথা হলো—তরুণ প্রজন্মের সাথে ।

আমাদের এলাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ কার্যক্রম এ সপ্তাহে শুরু হয়েছে— চলবে ১৭ জুন ২০১৭ পর্যন্ত । কেউ যদি নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে স্মার্ট কার্ডটি সংগ্রহ করতে না পারেন, তাহলে বাড়তি একটা দিন রাখা হয়েছে কার্ডটি সংগ্রহের জন্য—সেটা ১৮ জুন, ২০১৭ ।

আজ আমার ‘স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র’ অর্থাৎ—স্মার্ট কার্ডটি হাতে পেলাম । এখন থেকে আমি দেশের একজন—স্মার্ট নাগরিক ! যদিও অনেক আগে থেকেই আমি যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে, স্মার্ট নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করছিলাম ! এখন কিন্তু পুরোপুরি—স্মার্ট নাগরিক হয়ে গেলাম ! এই কার্ড সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি—এই কার্ড ব্যবহার করে, ২২টি সেবা পাওয়া যাবে—যদিও এই কার্ডটির চিপ বা তথ্য ভান্ডারে আমার ৩২টি তথ্য সংগ্রহে থাকছে—যা মেশিন রিডেবল ! তারপরও—আমি এখন দেশের একজন স্মার্ট নাগরিক . . .

১১ জুন, ২০১৭
পুরান ঢাকা

© Monirul Alam / WITNESS PHOTO
https://monirulalam.net

তবুও মানুষের আশ্রয় এখানেই . . .

photo-1494576732
© Monirul Alam

খালপাড়ে পড়ে আছে কয়েক ফুট উঁচু নোংরা পলিথিনের স্তূপ—সেখানে মাছি উড়ছে! দুর্গন্ধ, কাছে যাওয়া যায় না! রয়েছে ঘোড়ার আস্তাবল। সরু খাল দিয়ে বয়ে যাওয়া—দগদগে কালা পানি! সেই কালা পানিতে ধোয়া হচ্ছে লন্ড্রির কাপড়! এটা বুড়িগঙ্গা নদীর শাখা খাল, কামরাঙ্গীরচরের প্রবেশ মুখের চিত্র।

একটা সময় এই খালটি বুড়ীগঙ্গা নদীর একটা চ্যানেল ছিল, এখন দখল হতে হতে তা সরু খালে পরিণত হয়েছে! এই খাল পার এলাকায় দেখা হলো কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে—বিকেলে তারা এখানেই ঘোরাফেরা করে, মানে খেলাধুলা। এই শিশুদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো, টুকটাক কথা হলো ওদের সঙ্গে—ওরা ছবি তুলতে চাইলে আমি ওদের ছবি তুললাম। চোখে পড়ল টিন দিয়ে ঘেরা কিছু ছোট ছোট ঘর। কিছু নারী শ্রমিককে দেখলাম—নোংরা পলিথিনের স্তূপের ওপর বসে কাজ করছেন। আমার সঙ্গে ক্যামেরা থাকায় তাঁরা কেউ কেউ মুখ ঢেকে ফেললেন। এঁরা সামান্য অর্থের বিনিময়ে সারা দিন পলিথিন ঘাঁটাঘাঁটি করেন। তাঁদের থেকে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম—চোখে পড়ল ব্রিজ! ব্রিজের নিচে বিকেলের রোদে বসে আছে একটি শিশু! মাটির নিজ দিয়ে বেরিয়ে আসা একটি ড্রেনের মুখ দিয়ে নোংরা পানি পড়ছে সরু খালটিতে—শিশুটি বসে বসে সেই পানি পড়া দেখছে! আরো চোখে পড়ল কিছু বেওয়ারিশ কুকুর! এরা সবাই এই বিষাক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠছে—ভাবলেশহীন সব প্রাণ! আমি বিকেলের আলোয় একের পর এক ছবি তুলে যাই! সব চোখ যেন আমার ক্যামেরাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে! কারো কারো চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখি! কেউ কেউ ভীত-সন্ত্রস্ত! সেদিন পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে ছবি তুলতে গিয়েছিলাম—পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কামরাঙ্গীরচর ও এর আশপাশের এলাকায়

1494576626-Image-02
© Monirul Alam

এই এলাকা বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে দখল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এলাকাটি ঘুরলেই তা চোখে পড়ে। আর এই দখল প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সরকারি মদদপুষ্ট লোকজন, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! সময় সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, একদল চলে নতুনরা ক্ষমতায় বসেন, তখন দখল প্রক্রিয়ার চিত্রেরও বদল ঘটে!

মূল নদী থেকে শুরু করে নদীটির আশপাশের খাল, খানা-খন্দে পানির প্রবাহ দেখলেই বোঝা যায়, বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে নদীর পানিতে কালো এক ধরনের তরল পদার্থ ভাসতে থাকে, পুরো শুকনো মৌসুম। মাদ্রাসার শিশুদের সঙ্গে নদীর পানি নিয়ে কথা বলতেই—ওরা জানাল এ সময়ে (শুকনো মৌসুমে) তারা এই নদীর পানি ব্যবহার করে না। ওরা জানাল—এই পানিতে গোসল করলে শরীর পচে যায়, ঘাসহ নানা ধরনের অসুখ হয়। এ সময় এলাকার কেউ নদীর পানি ব্যবহার করেন না। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি যখন কিছুটা ভালো থাকে—তখন তারা এই নদীর পানিতে গোসল করাসহ অন্যান্য কাজে তা ব্যবহার করে।

মিরপুর-গাবতলী এলাকা থেকে শুরু হয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমি, হাজারীবাগ, লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচর—এদিকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচ হয়ে লালকুঠি, শ্যামবাজার, পোস্তগোলা, পাগলা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা দখল আর নদী দূষণের চিত্র প্রায়—অভিন্ন। আমি বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষে নিমির্ত বেড়িবাঁধটির কল্পনায় আনি—না কোথাও খুঁজে পাই না এতটুকু দূষণমুক্ত পরিবেশ। যেখানে ভোরে বা বিকেলে রোদে নদীটির বাঁধ ধরে হেঁটে যাওয়া যায় বহু দূরে—কিংবা নৌকা নিয়ে নদী ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যায়—এই নদী বুড়িগঙ্গার বুকে! একটা সময় (নব্বই দশকে) আমাদের স্কুলজীবনে এই নদীতে বন্ধুরা মিলে নৌকাতে ঘুরে বেড়িয়েছি, শ্যামবাজার থেকে এক কাদি/ছড়ি কলা কিনে নৌকায় বসে তা খেতে খেতে গল্প করেছি, নদীর দুই পারের নানা চিত্র দেখেছি, জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখেছি! আজ সেই সব চিত্র কোথায় হারিয়ে গেছে! অতীত কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে আসি!

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যমে নানা সময়ে জানিয়েছেন এই নদী নিয়ে তাঁদের শঙ্কা ও পর্যবেক্ষণের কথা। প্রায় ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্যে অনেক আগেই বিষাক্ত হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে আট ফুট পুরু পলিথিনের স্তর। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, মাছ ও জলজ প্রাণী বসবাসের জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ পাঁচ মিলিগ্রাম বা তার বেশি থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, দ্রবীভূত হাইড্রোজেন মাত্রা কমপক্ষে সাত মিলিগ্রাম থাকা উচিত। অথচ বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোটায়।

1494576663-Image-04
© Monirul Alam

এত দূষণ এবং দখলের মধ্যেও জীবন এখানে থেমে নেই! প্রতিদিন ঘরছাড়া, গ্রামছাড়া অসহায় মানুষের দল আশ্রয় নেয় এই নগরে। তাদের বসবাসের আশ্রয়স্থল হয় কখনো এই এলাকার কোনো বস্তিতে, এখানে-সেখানে বা অন্য কোথাও! বিপন্ন পরিবেশ, তবুও আশ্রয়হীন মানুষের আশ্রয় এখানেই—বেঁচে থাকতে হবে! ন্যায়-অন্যায় এখানে বিবেচ্য নয়—কখনই! নানা অপরাধ এখানে সংগঠিত হয়। পরিবেশগত কারণেই তা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। বড় কোনো অপরাধ সংগঠিত হলে প্রশাসনের টনক নড়ে, আবার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং অসৎ প্রসাশনিক লোকজনের বদৌলতে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যান।

দখল হয়ে যাওয়া নদীর পারে গড়ে উঠেছে পলিথিন ও প্লাস্টিক গলানোর কারখানা। ফেলে দেওয়া পলিথিন আর প্লাস্টিক এসব কারখানায় জড়ো করা হয়—তারপর তা আগুনে পোড়ানো হয়। দিনে-রাতে সারাক্ষণ এই এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়! এসব গলানো প্লাস্টিক আবার ব্যবহার করে তৈরি করা হয় নতুন প্লাস্টিকের পণ্য। দীর্ঘদিন ধরেই এসব কারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলার কারণে পুরো এলাকা দূষিত হচ্ছে, দূষিত হচ্ছে বাতাস, বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগ। যাঁরা এলাকায় বসবাস করেন, তাঁরা অনেকটা অসহায় হয়ে বেঁচে আছেন। এলাকাটি ঘুরে চোখে পড়ল পরিবেশ বিপর্যয়ের নানা চিত্র! দখলদার আর ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বে চলছে—এই পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা! পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ, যাঁরা এসব দেখার দায়িত্বে আছেন—তাঁরা সত্যি কি তা দেখছেন? শুনেছি—নদী রক্ষায় সরকারের একটি টাস্কফোর্স আছে, সময়ে সময়ে তাঁরা জানান দেন, তাঁরা আছেন—শুধু টেবিলে আর খাতা-কলমে! তাঁদের মাঠে যাওয়ার মতো সময় হয় না।

আশার কথা শোনা যাচ্ছে, এ সরকারের সময়ে সম্প্রতি পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে পানি দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন ‘বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সরকারের আমলে এই রকম আশা বাণী শুনতে পাই কাজ হোক আর না হোক! সাধারণ জনগণ হিসেবে এই আশার ‘বাণী’ আমাদের ভরসা। জানি না, আবার কখনো এই মৃতপ্রায় নদী বুড়িগঙ্গা দখল, দূষণের জালমুক্ত হয়ে আবার প্রাণ সঞ্চারিত হবে কি না!

লেখক : সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী

 

অদ্ভুত রহস্যময় —এক আলো ! 


আমাদের ছাঁদে একটা বেঞ্চ আছে । যেখানে বসে থাকা যায় আবার লম্বা হয়ে শুয়ে থাকা যায় । আমি মাঝে মাঝে রাতে— ছাঁদে হাটতে গেলে সেই বেঞ্চটিতে চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি । অন্ধকার আকাশ দেখি—জেগে থাকা চাঁদ,তারা দেখি ! কতো দিন মনে করেছি—মহাকাশ বিষয়ক কিছু বই পত্র কিনে পড়াশোনা করবো। আকাশ সম্পকে কিছু জানাশোনা হবে । কিন্তু নানা কারণে তা আর হয়ে উঠেনি । হয়তো কোন একদিন হয়ে উঠবে । 

আজ ১৪ নভেম্বর ২০১৬ সাল । মেঘকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে—ধানমন্ডিতে । আ্যপয়েন্টমেন্ট করা আছে, রাত আটটায় ওর সিরিয়াল—পাঁচ । শীতের সময় মেঘের ঠান্ডা এবং এ্যালার্জিটা বেড়ে যায়, তাই এই সময়টা তাকে বেশ সর্তকে রাখতে হয় । কিন্তু কে শোনে কার কথা—সারাক্ষণ দুষ্টমি আর খেলে বেড়ানো ! 

আজ রাতের আকাশটা অন্য রকম হবে ! বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে যতোটুকু জানা গেল আজকের চাঁদটা অনেক অনেক বেশী উজ্জল এবং বড় দেখাবে সাধারনের তুলনায় । যাকে সুপারমুন বলা হয় । চাঁদের এ রকম উজ্জ্বলতম রূপ শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৪৮ সালে। আবার দেখা যাবে ১৮ বছর পর, ২০৩৪ সালের ২৫ নভেম্বর নাসার তথ্য তাই বলছে । পৃথিবীকে ঘিরে চাঁদের যে কক্ষপথ রয়েছে তার আকৃতি ডিম্বাকার হওয়ায় কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার সময় চাঁদ কখনো পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে, আবার কখনো অনেক দূরে চলে যায়। চাঁদ যখনই পৃথিবীর খুব কাছে চলে আসে, তখন তা পৃথিবী থেকে খুব উজ্জ্বল দেখায়।

মনে মনে একটা হিসাব করলাম । মেঘকে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা হবে তাই সন্ধ্যার আকাশে চাঁদ উঠাটা আমাকে মিস করতে হবে,তাই রাতের আকাশে চাঁদের আলোটাই আমাকে উপভোগ করতে হবে । যদিও সন্ধ্যাটা ছিল সুপারমুন দেখার উপযুক্ত সময় ! যাই হোক, ব্যস্ত জীবনে অনেক সময় অনেক কিছু করা হয়ে উঠে না । এটা সত্য আর এই সত্যটা—আমি মানি । 

মজার ব্যাপার হলো, আমি যদি সন্ধ্যার সুপারমুনটি দেখতাম তাহলে রাত এগারোটার পর সেই সুপারমুনটি হয়তো আর দেখতে চাইতাম না । আর আমার জন্য এক চমক এবং বিস্ময় এখানে অপেক্ষা করছিল ! রাতের খাওয়া-দেওয়া শেষ করে ছাঁদে চলে গেলাম । হ্যাঁ প্রতিদিনের চেয়ে আজ রাতের চাঁদের আলো অন্যরকম লাগছিল, অনেক বেশী উজ্জল তবে বড় ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, তবে অনুভূতিটা অন্য রকম ছিল । 

বেঞ্চটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখছি । হঠাৎ খেয়াল করলাম চাঁদের বেশ কিছু দূরে—আকাশের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে একটা লম্বা আলোর রেখা ! আমি মনে করলাম কেউ হয়তো টর্চ দিয়ে আলো ফেলছে । কিন্তু না সেই আলোর লম্ভটা চাঁদের দিকে এগিয়ে আসছে ! ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগলো, আমি সর্তক হলাম কিন্তু ততোক্ষণে যা ঘটার তা ঘটে চলছে ! আমি আমার সঙ্গে থাকা মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছি পাশাপাশি বুবলীকে ফোন দিচ্ছি যেন মেঘকে নিয়ে দ্রুত ছাঁদে আসে, ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাটি দেখে ! কিন্তু ওরা আসতে আসতে বিষয়টি শেষ হয়ে গেল । ওরা শুধু আলোর রেখাটি দেখতে পেল—দূর থেকে । ঘটনাটি ছিল মাত্র কয়েক মুহুর্ত ! আসলে কি ঘটেছিল ? 

আমি যতোটুকু বুঝতে পারি, পরিষ্কার আকাশে এক টুকরো লম্বা মেঘ ( সাদা/কালো ) চাঁদকে অতিক্রম করছিল অর্থাৎ যখন চাঁদ আর ঐ মেঘে মুখোমুখি হলো তখন সৃষ্টি হলো সেই ভয়াবহ আলোর সৌন্দর্য ! অদ্ভুত রহস্যময় —এক আলো ! কি রকম এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়েছিল আমার চারপাশে । আর আমার মনের ভিতর অজানা এক ভয় দানা বেঁধেছিল ! পরর্বতীতে মোবাইলে তোলা ছবি গুলো বারবার দেখছিলাম যদিও সেখানে পুরো ব্যাপারটা বোঝা গেল না তবে সেই মুহুর্তটা ধরা থাকলো । 

আসলে সেই সময়টা কি ঘটেছিল ? বিজ্ঞান কি বলে ? জ্যোতির্বিদরা এর কি ব্যাখ্যা দিবেন ? কেন শুধু মাত্র ঐ সময়ে ঐ রকম অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল । যা এক ধরণের ভয়ের অনুভূতি তৈরি করেছিল আমার মনে ! আহা—রহস্য ঘেরা এই মহাজগত ! কতো কিছুই না ঘটে চলছে . . . 

 ১. ছবি তোলার সময় : ১১.১৩ মিনিট ( মোবাইল ফোনে তোলা )

 ২. ছবি তোলার সময় : ১১.২১ মিনিট ( ডিএসএলআরে তোলা ) 

মনিরুল আলম

পুরান ঢাকা, পাতলা খান লেন

১৪ নভেম্বর ২০১৬

Portrait . . .

The object of my work is to report the real moment of life. © Mursalin Abdullah

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে ওদের জন্ম . . . 

© Monirul Alam
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে কাজ শেষ করে বেরিয়েছি । পাশেই হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে ফুটে আছে সবুজ বুনো ঘাস ! সেই সব ঘাস গুলোর উপর জমে আছে ছোট ছোট জলকণা । সূর্যের আলোয় তারা ঝলমল করছে, ওরা দূর্বল হয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় কায়ান্টের অংশ । ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে ওদের জন্ম ! 

আর ঘূর্ণিঝড় ‘কায়ান্ট’ সম্পর্কে যতোটুকু জানা গেল, এই নামটি এসেছে মিয়ানমার থেকে। স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ কুমির ! নগরবাসী এই কায়ান্টের প্রভাবে সৃষ্ট ঝিরিঝির বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে আরো দুই দিন . . . 

পুরান ঢাকা, কার্তিক ১৪২৩

২৭ অক্টোবর ২০১৬

© Monirul Alam
#MonirulAlam #Dhaka #Bangladesh #kyant #CyclonicStorm #rain #iPhone

ক্যামেরা কাঁধে আবার ছুটবেন তিনি . . . 

© Monirul Alam

অনেক দিন পর আবীর ভাইয়ের সাথে দেখা হলো আজ ! ল্যাবএইড হাসপাতালে এসেছেন চেক আপ করাতে । তার হাতের অবস্থা আগের থেকে অনেকটা ভালো । আনন্দের সংবাদ হলো— এই সপ্তাহ থেকে আবার কাজ শুরু করছেন । আমরা, এই মানুষটিকে নানা আ্যসাইমেন্টে আবার দেখতে পাবো—ক্যামেরা কাঁধে ছুটে চলছেন । 

সবাই আবীর ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন . . . 

ল্যাবএইড হাসপাতাল

ধানমন্ডি, ঢাকা

অক্টোবর ২০১৬

এক টুকরো শরৎ দেখা . . . 

এক টুকরো— নীল খামের চিঠি বুক পকেটে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম, শরৎ দেখবো বলে ! এই নগরীর বুকে আর সেই অমল, ধবল শরতের দেখা মেলে না । তবু—শহরের পিচ ঢালা পথ ছেড়ে মাটির গন্ধ মাখা পথ ধরে ধরে চলে যাই—নদীর পাড়ে । তারপর ঐ দূরে ! এখানে হাটতে হাটতে দেখা মেলে— ফুটে থাকা অফুরান কাশ ফুল—সেই গঙ্গা ফড়িং আর ভাত শালিকের । রুপালী রৌদ্দুর নীলাকাশে সাদা মেঘের দল ছুটে আসে। আর তখন মনে পরে, সঙ্গে রাখা বুক পকেটের—সেই নীল খামের চিঠি !

এই নগরীর বুকে উড়ে চলা গঙ্গা ফড়িং, শালিক, ফুটে থাকা কাশফুল আর 

রুপালী রৌদ্দুরের সাথে না হয় কাটলো— আমাদের একটা শরৎ প্রহর . . . 

সবাইকে শরৎ দেখার নিমন্ত্রণ ।

সেপ্টেম্বর ২০১৬

বুড়ীগঙ্গা নদী, কেরানীগঞ্জ 

© Monirul Alam