ক্যামেরার প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আলো-ছায়া, কম্পোজিশন, নন্দনতত্ত্ব, বিষয়বস্তু, ঘটে যাওয়া ঘটনার চুড়ান্ত মুহূর্তের ছবিটা তুলতে পারা এবং তা সময় মতো প্রকাশ করা, একজন ফটোসাংবাদিকের—বড় মুনশিয়ানার পরিচয় বহন করে । নিশ্চই এই বিষয়টা একদিনে হয়ে উঠে না— নিয়মিত চর্চা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া,অভিজ্ঞতা অর্জন, একনিষ্ঠভাবে কাজ করার পাশাপাশি ফটোগ্রাফী বিষয়ক পড়াশোনা করাটা খুব জরুরী বলে মনে হয় । লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে স্মাট ক্যামেরা কিনলেই, পেশাদার ফটোগ্রাফার / ফটোসাংবাদিক হওয়া যায় না —নিজের ভিতরের শিক্ষাটা জরুরী !
বস্তু বিজ্ঞানের সৃষ্ট এই যন্ত্র ‘ক্যামেরা’ দিয়া নিখুঁত বাস্তবতার চিত্রটি তুলে ধরা খুব সহজ একটা কাজ না । মাঠে যারা কাজ করেন তারা ভালো বোঝেন —একটা ভালো ছবির জন্য প্রতিদিন কি পরীক্ষা দেওয়া লাগে ! প্রচলিত একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাই, ছবি তোলা আর এমন কি —ক্লিক করলেই তো ছবি হইয়া যায় ! এইটার মধ্য আবার কেরামতির কি আছে !
যদিও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে, স্মাট ফোনের সুবাদে আমজনতা সবাই এখন ‘সৌখিন ফটোগ্রাফার’ ! ছবির ভালো-মন্দ বোঝার ধারে কাছে যাওয়ার দরকার পরে না— আলো-ছায়া, কম্পোজিশন, নন্দনতত্ত্ব এখানে মুখ্য বিষয় নয় ! স্মার্ট ফোনে ছবি তুলে তা পোষ্ট করার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ থাকে ! আবার সেই আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যায়, ছবিটাকে কেউ যদি লাইক বা মন্তব্য করেন । বতর্মান আমজনতার ছবি তোলার এই যে ‘খায়েশ’ তা পুরোটাই একটা আবেগী ব্যাপার। স্মার্ট ফোন বিক্রেতাদের বাণিজি্যক করণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম গুলাতে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া । অবশ্য বতর্মান সমাজের চালচলনের যে অবস্থা তাতে এই জানান দেওয়াটা সময় সময় জরুরীও বটে ! তবে ঐ যে বলছিলাম— নিজের ভিতরের শিক্ষাটা জরুরী ! আমি ‘স্মার্ট— আমার ক্যামেরাও ‘স্মাট’ ! এই প্রক্রিয়ায় আওয়াজ দেওনের চেয়ে—সাদাসিধা ভাবে আওয়াজ দিলে তার গ্রহণ যোগ্যতা হবে অন্য রকম ।
আমাদের দেশে ফটোগ্রাফী বা ছবির ব্যবহার যে পরিমাণে বাড়ছে বা জনপ্রিয় হচ্ছে, সেই তুলনায় ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়াটা আমাদের মধ্য অনেক কম । সেই দিক থেকে চিন্তা করে, ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়া’টা আমার কাছে জরুরী বলে মনে হয় ( চলবে )
পাতলা খান লেন, পুরান ঢাকা
০২, এপ্রিল, ২০১৬
ছবির তথ্য: ছবির এই ছোট মানুষটির নাম খান মোহাম্মদ নাদিম হোসেন,আমার ছোট মামা। ছবিটি পুবান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার আঁকাবাঁকা স্টুডিও থেকে ১৯৭৮সালে তোলা ।
নীল আকাশে দুটি ভুবন চিল চক্কর দিচ্ছিল; নিম গাছ গুলোর আলো-ছায়া, পাখির কোলাহল আর নির্জনতার— এক অদ্ভুত সমীকরণ সৃষ্টি হয়েছে এখানে ! কবরস্তানের পাশ গিয়ে বয়ে গেছে ছোট খাল; দূরে—বহু দূরে । এখানেই শুয়ে আছেন অগণিত মৃতরা । কোন কোন কবরের উপর দেখলাম গ্রীল দিয়ে খাচা তৈরি করে দেয়া হয়েছে, খোঁজ নিয়ে জানলাম, সদ্য মৃতদের কবর এভাবে ঢেকে দেওয়া হয়—বেজির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে !
জানা-অজানা নানা গাছ দিয়ে ঘেরা এই নির্জন স্থানটি—কেন যেন ভালো লেগে গেল ! একটি নিম গাছের নিচে চুপটি করে বসে পড়লাম ! কবরের একটা অংশ জুড়ে ফুটে আছে— থোকায় থোকায় ছোট কাশফুল ! সেই কাশফুল গুলো বাতাসে খুব দুলছিল—বসে বসে তাই দেখছিলাম। এখানে প্রচুর নিম গাছের দেখা মিলল । আরো দেখা মিলল দুটি প্রাণীর সাথে—একটা বেজি আর অন্যটা বেড়াল ! তারা দুজনেই আমাকে দেখে দূরে সরে গেল !
পরিবার থেকে চিরদিনের মতো বিদায় নেয়া—মানুষ গুলো শেষ ঠিকানা এই করবস্তান । স্বজনেরা তাদের হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে স্বরণ করতে এখানে ফিরে আসেন—বারবার ! পি্রয় মানুষটির জন্য দোয়া পাঠ করেন, কবরের পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, মনে পরে যায়— মানুষটির সঙ্গে নানা স্মৃতি-বিস্মৃতির ঘটনা ।
মেঘের দুই মামা তাদের বাবার কবরটির সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া পাঠ করছিলেন—আমি দূর থেকে তাই দেখছিলাম । দুজনের চেহারাতে বাবা হারানোর বেদনার ছাপ স্পষ্ট ! হয়তো বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে অতীত হয়ে যাওয়া সেই সব স্মৃতি ! গত সপ্তাহে চির দিনের জন্য পৃথিবীর ছেড়ে চলে গেছেন এই মানুষটি । এখন তার শেষ ঠিকানা বাড্ডার —বেরাইদ কবরস্থান ।
মনে পড়ে গেল—আমাদের গ্রামের বাড়ি হিজুলিয়ার কবরস্থানটির কথা । সেখানে সমাহিত আছেন, আমার প্রিয় বাবা, ফুপু, দাদা-দাদী সহ অন্যান্য স্বজনেরা । প্রকৃতি ঘেরা এই কবরস্থানটি আমার খুব পছন্দের—একটা জায়গা । গ্রামের বাড়ী গেলে আমি কবরস্তানে গিয়ে বসে থাকি— ভালোলাগে । অনেক দিন হলো বাবার কবরটি দেখতে যাওয়া হয় না ! ভেবেছি, বাবার কবরে— একটা এপিটাফ লিখে দিব, কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি ! বাবার স্মৃতি এখন আমার কাছে—সাদা শর্াট আর কালো কোর্ট পরা, চোখে চশমা দেওয়া ফ্রেমে বাঁধানো একখানা—সাদা-কালো ছবি !
বাড্ডা, বেরাইদ
১.শারীরিক ভাবে এবার যেন একটু বেশী অসুস্থ হয়ে পড়লাম ! নানা ঔষধ-পত্র, ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ম-নীতি সবই হলো ! কিন্তু অসুস্থতা যেন আমার পিছু ছাড়তে চাইছে না ! শরীরের ক্ষতটা, আমাকে দিনরাত জানান দেয়; সে আমার সঙ্গেই আছে—আমি তথৈবচ ! পৃথিবীর কিছু সুন্দরের সাথে আরো কিছু দিন কাটাতেই ইচ্ছা হয়—মৃত্যু অনিবার্য ; তাকে অনুভব করার শক্তি দিয়ে—অর্জন করতে চাই ।
২. মধ্য রাত থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে এখানে ! মেঘের ‘নানা’ কাউকে কিছু না বলেই চলে গেলেন—না ফেরার দেশে ! আমি তাকে যতটুকু দেখেছি—খুব সহজ একজন মানুষ ছিলেন । উত্তর কাফরুল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন— তিনি । এই মসজিদে জানাজা শেষে করে; তার ইচ্ছা অনুযায়ী, গ্রামের বাড়ী বাড্ডা, বেরাইদ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হলো।
আমি— মেঘকে মাটির একটি টুকরা হাতে দিয়ে বললাম, বাবা এই মাটির টুকরাটা তোমার নানার কবরের উপর দিয়ে দাও ! ছোট মেঘ— তার ছোট ছোট হাতে তার নানার কবরের উপর মাটির টুকরাটা রাখল ! সাত বছরের মানুষটির এই প্রথম অভিজ্ঞতা হলো—কবরস্থানের। একটু পরে সে— আমাকে জিজ্ঞেস করে,বাবা ওরা নানা’কে মাটির উপর শুইয়ে দিলো কেন ? আমি বললাম বাবা, মানুষ মরে গেলে এভাবেই মাটির উপর শুইয়ে—করব দিতে হয় । তোমার নানা এখন— আল্লার কাছে চলে গিয়েছেন। তুমি এখন আল্লার কাছে দোয়া করবা— সে যেন শান্তিতে থাকেন ।