এই হিজলের মাটিতে দিবো এক দীর্ঘ ঘুম . . .

নোট: ছবিটি তুলে দিয়েছিল আমার কাজিন, সুমন ।
জানুয়ারি ২০১৫ হিজুলিয়া, মানিকগঞ্জ © মেহেদী হাসান

আমন ধানের চাল দিয়ে ভাত রান্না করলে, সেই ভাত খেতে অন্যরকম এক স্বাদ পাওয়া যায় । আগে আমাদের গ্রামের বাড়ী ‘হিজুলিয়া’ থেকে নিয়মিত সেই চাল আসতো। আমাদের ঢাকার বাসায়, সাথে আসতো খাঁটি সরিষার তেল, খেজুরের গুঁড় সহ—নানা সুস্বাদু খাবার !

এসব মূল্যবান খাবারের মর্ম ছোট বয়সে ঠিক বুঝে উঠতে শিখিনি। এখন এই বয়সে এসে, সেইসব খাবারের মর্ম উপলব্ধি করি । কিন্তু সময় পেরিয়ে গেছে ! ইচ্ছে করলেই সেই সময়কে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় ! যদিও শহুরে জীবনাচরণে বড় হয়ে উঠা এই আমি, আমাদের পরিবার । তথাপি, হিজুলিয়ার সেই ছোট্ট গ্রামের মায়া ত্যাগ করতে পারিনি । সেটা সম্ভব নয় —এই জীবনে । আমার বাবা, দাদা-দাদী পরম শান্তিতে এই হিজুলিয়ার মাটিতে দিয়েছেন—একঘুম । আমারও ইচ্ছা মৃত্যুর পর, এই হিজলের মাটিতেই দেবো দীর্ঘ ঘুম, পরম শান্তিতে—নিঃশব্দে !

ছোটবেলার সেইসব স্মৃতি মাঝে মাঝে মনের গহীনে এক বিশাল ছায়া ফেলে । ফিরে যাই আমার সেইসব সুখ-দুঃখ ভরা কৈশোরের জীবনে । হিজুলিয়ার সেই পুকুর ঘাট, মাছরাঙ্গা পাখির বসে থাকা, একা দাড়িয়ে থাকা হিজল গাছ, সেই সিঁদুরে আম গাছ । কিংবা ছোট খাল পেরিয়ে করবস্থানের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে, দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ক্ষেতে হারিয়ে যাওয়া ! আহা, আমার সেইসব দুরন্তপনা ! সেইসব কৈশোর !

আমাদের মানিকগঞ্জে এখনো প্রচুর সরিষার চাষ হয় । ফুপাতো ভাই, মুকুলের আহবান থাকে, শীতকালে বাড়ী যাবার জন্য । খেজুরের রস, খেজুরের গুঁড় দিয়ে তৈরি পিঠা খাবার জন্য । শীতের সময় সরিষা ক্ষেত দেখতে খুব সুন্দর লাগে । চারিদিকে শুধু হলুদ আর হলুদের সমারোহ। আখ এবং খেজুরের গুঁড়ের জন্য এই এলাকা এখনো বিখ্যাত হয়ে আছে । আমন ধানের চাষ একসময় ব্যাপক হতো, এখন আর সেই আকারে চাষ হয় না ।

সকালে মায়ের হাতে মাখানো বাসি-ভাত ছিল আমার খাবারের তালিকায় পছন্দের একটি খাবার । সরিষার তেল, মরিচ, পিয়াজ, লবণ আর ধনিয়া পাতা দিয়ে মাখানো সেই ভাত খেতে খুব সুস্বাদু ছিল।পেটপুরে সেই খাবার খেয়ে, তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতাম ! ততোক্ষণে স্কুলে, কলেজে যাবার সময় হয়ে যেতো । আমার মায়েরও এই খাবারটা তার পছন্দের তালিকায় ছিল । বাবা অবশ্য ডিম ভাজা দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ করতেন !

ঢাকা শহরে পার্ট-টাইম চাকুরি করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে, আইন পেশায় নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন— আমার বাবা । এখন উপলব্ধি করি সেই সময়ে শহুরে জীবনের সংসার চালাতে কিছুটা অর্থনৈতিক সমন্বয় করাটা কেন জরুরি ছিল !

এখন নানা কারণেই সেই আমনের চাল গ্রামের বাড়ি থেকে আসে না । যদিও মাঝে মধ্যে সরিষার তেলটা আনা হয়, সেটাও এখন অনিয়মিত ! আমাদের মায়ের দীর্ঘ অসুস্থতা, সামাজিক নানা কারণ-অকারণে জীবনের কিনারা ঘেঁষেই এই শহর কেন্দ্রিক জীবন চলে যাচ্ছে ।

সেদিন বুবলীকে বলেছিলাম, ধনিয়া পাতা, সরিষার তেল দিয়ে মাখা বাসি-ভাত খেতে খুব ইচ্ছে করছে ! বুবলী তার ছোট্ট পরিসরে সেই আয়োজন করেছিল, তাকে ধন্যবাদ ।

মায়ার এই সংসারে মেঘ-ঢেউ বড় হয়ে উঠছে, এই শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তারা ! ওরা নিশ্চই একদিন ওদের হিজুলিয়া’কে চিনে নিবে . . .

ডাইরি / পুরান ঢাকা,
মার্চ, ২০২২ © মনিরুল আলম

পাথরকুচি ফুলেরা . .

শীতকাল বিদায় নিচ্ছে । মাঘের শেষ শীত যেন বেশ জাকিয়ে বসেছে গ্রামাঞ্চলে । ঢাকায় বসে তা খুব একটা অনুভব করা যায় না ! এবারের শীতে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি ভাপা পিঠা খাওয়া হয়েছে । আমার ফুপাতো ভাই মুকুল গ্রামের বাড়ী থেকে ভাপা পিঠা এবং দুধ চিতই পিঠা নিয়ে এসেছিল । মজা করে খাওয়া হয়েছে । আগে এই পিঠা-পুলি এবং খেজুরের রস খেতে শীতকালে গ্রামের বাড়ী যাওয়া হতো বেশ কয়েকবার । তখন দাদা-দাদী, বড় ফুপু বেঁচে ছিলেন । এখন বছরে একবারও যাওয়া হয়ে উঠে না । তবে নাড়ির এই টান একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাইনি, আমার !

বেশ কিছুদিন হলো আমাদের ছাদ-বাগানে যাওয়া হয়ে উঠেনি । নিজের নানা ব্যস্ততার পাশাপাশি, শীতজনিত রোগে সারা মাস জুড়েই পরিবারের কেউ না কেউ ভুগেছে । মায়ের শরীরটা এই শীতে কিছুটা ভালো থাকলেও, শীতের শেষে এসে আবার খারাপ করতে শুরু করেছে । আমাদের মায়ের জন্য দোয়া চাই ।

ছাদ-বাগানের জন্য বেশ কিছু নতুন ফুল গাছ নিয়ে আসা হয়েছে । সেদিন বিকেলে নতুন লাগানো ফুল গাছ গুলো দেখার পাশাপাশি পুরোনো এই পাথরকুচি ( ঔষধি উদ্ভিদ ) গাছে ফুটে থাকা ফুলগুলো দেখছিলাম খুব সুন্দর লাগছিল । বিকেলের আলোয় ফুলগুলো অসাধারন লাগছিল । পেশা এবং নেশা এক হলে যা হয় । সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন দিয়ে বেশ কিছু ছবি এবং ভিডিও ধারণ করলাম । ( ভিডিওটি পোষ্টে যোগ করে দিয়েছি )

আজকের দিনটি পহেলা ফাল্গুন । পালিত হচ্ছে বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস এবং সুন্দরবন দিবস, সবাইকে দিবস গুলোর শুভেচ্ছা জানাই । পাশাপাশি সবাই সুস্থ থাকি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করি । সবার জন্য শুভ কামনা . . .

ডাইরি / ঢাকা, বাংলাদেশ
ফেব্রুয়ারি, ২০২২
© মনিরুল আলম

এই নদী অনন্ত কালের . . .

ছোট এই শহরটির এখানে বসলেই নদীটি দেখা যায়;আমরা রোজ এখানে বসে নদী দেখি, আহা— কতো কতো ঢেউ বয়ে চলে, তার বুকের প’রে; পৃথিবী কী মনে রাখে— সব !

তুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললে, নক্ষত্রেরাও আমাদের সাথে নদী দেখে—রোজ রাতে ; আমি নদীর ঢেউ দেখে দেখে বললাম—এই নদী অনন্ত কালের ; তার স্রোতের গল্প গুলো আবহমান কালের—উপকথা !

তুমি আর আমি—যখন একদিন থাকবো না; যখন আমরা একদিন ঐ নীলাকাশের নক্ষত্র হবো; সেদিনও এই নদী কালের স্রোতে জেগে থাকবে—নিশ্চল ! তুমি আর একবার তাকালে নদীর দিকে, তোমার চোখে তখন নদীর—ছায়া !

আমাদের পাশেই কোন এক বৃক্ষ শাখার ডালে বসে, এক লক্ষীপেঁচা ডেকে উঠল, তারপর আরো একটা; আমরা তখন সন্ধ্যা তাঁরার আলোয়, নদীটিকে পেছনে ফেলে ফেলে ঘরে ফিরছি; আমাদের রক্তে তখন—শীতল নিরবতা . . .

সেপ্টেম্বর , ২০২১

■ ডাইরি / পদ্মানদী, মুন্সীগঞ্জ

হিম রাত্রি নামছে . . .

পৃথিবীর সেইসব বিকেলের আলো একে একে নিভে গেলে —তখন সন্ধ্যা আসে ! দূরাগত শহরের প্রান্ত থেকে কি জানি কিসের শব্দ ভেঁসে আসছে !

আমরা তিনজন— জ্যোৎস্নার আলোয় বসে আছি; আমাদের মাথার উপর হিম রাত্রি নামছে ।

■ ডাইরি / জানুয়ারি, ২০২১

মায়া-আলোয় শরৎ দেখা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

নীলাকাশে তখন সবেমাত্র সূর্য্যস্তের রঙ লাগতে শুরু করেছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সাদা মেঘ গুলো কোথাও কোথাও সেই রঙের আভায় ঝলকাচ্ছে, আহা— কি যে সুন্দর দেখতে ! এটাকেই বলে প্রকৃতির—ক্যানভাস । চারিদিকে শান্ত নিরবতা, মৃদু বাতাস আর শুভ্রতা নিয়ে দাড়িয়ে থাকা কাশফুলেরা, আমাদের কাছে আজকের পৃথিবীটার গল্পটা যেন এমনই—ভালোবাসার, আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

প্রকৃতি— তার নিজের ভিতর এমন একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ধারণ করে যে, মানুষের দল সেই মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে ! মানুষের মাথার ভিতরে এক ধরণের ‘বোধ’ তৈরি হয় ! চারিদিকের পরিবেশটা তখন এক আশ্চর্যময় ভালোলাগা তৈরি হয় । আবার এর বিপরীতও হয়— সেটা বোধহীন মানুষের বেলায় খাটে !

দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে, একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে, এখানে। আমরা তখন শরতের কাশফুল ঘেরা মাঠে হেঁটে চলছি, মৃদু ছন্দে । এখানে, সেইসব নীলাকাশে সাদা মেঘেরা খেলা করে, ঐ যে দূরে—দিগন্ত রেখা দেখা যায়; ঠিক তার নিচেই মাঠের প’রে মাঠে ছড়িয়ে আছে কাশফুলেরা—ওরা যেন সব শরৎ ছবি হয়ে আছে !

হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে কেমন যেন এক ধরণের শীতল অনুভূতি হতে লাগলো, বাতাসের গতিবেগ কিছু একটা ইঙ্গিত দিতে চাইছে, কাশফুল গুলোতে যেন সেটা বুঝতে পেরে কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ! প্রকৃতির ‘খেয়াল’ বলে কথা ।

ওমা— এইসব যখন ভাবছি, তখন দেখি আকাশ তার ক্যানভাস একদম পাল্টে ফেলছে ! আকাশ জুড়ে তখন কালো মেঘের আনাগোনা—বৃষ্টি নামবে বলে মনে হয় ! মেঘ— তখন হঠাৎ করে চিৎকার করে বলে উঠলো, বাবা প্লেন ! দেখো কতো নিচ দিয়ে চলছে ! আমরা তখন সবাই তাকালাম, ঢেউ’ সেই প্লেন দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো ! আমি মেঘ’কে বললাম, ওটা নামছে একটু দূরেই আমাদের এয়ারপোর্ট, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল ততোক্ষণে ! আমরা তখন বৃষ্টি ভেজা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে কোন একটা ছাউনি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু আশেপাশে সেরকম কিছু চোখে পরলো না, বেশ দূরে একটা নির্মাণাধীন ব্রীজ দেখলাম, সেটাকে টার্গট করে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম ! তবে সেই ব্রীজ পর্যন্ত পৌঁছাতে যথেষ্ট ভিজে গেলাম, আমরা । মজার ব্যাপার হলো, ঢেউ এবং মেঘ এই বৃষ্টিতে ভিজতে পেরে ওরা তাদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। ঢেউ—বলে উঠলো, বাবা এই বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগছে, আমি বললাম, বিউটিফুল মনের আনন্দে ভিজো— ‘মা’ । আজ ছোট এই মানুষটির কাশফুলের মাঠে বৃষ্টিভেজার অভিজ্ঞতা হচ্ছে !

মেঘ’কে দেখলাম কাশফুলের মাঝে তার দুই হাত প্রসারিত করে, সে বৃষ্টিটাকে খুব উপভোগ করছে । অন্যদিকে মেঘ/ঢেউ এর মা, মেঘের সেই দৃশ্য দেখে তার দিকে ‘কটমট’ করে তাকিয়ে বলছে, মেঘ দ্রুত হাঁটো ! বেচারী বেশ খানিকটা ভিজে গেছে, বৃষ্টিতে ! অবশেষে আমরা ব্রীজের নিচটায় আশ্রয় নিলাম, ততোক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এখানে ।

ব্রীজটির নিচে দাড়িয়ে আমরা বৃষ্টি পরা দেখতে লাগলাম, কাশশফুলের বনে তখন অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে ! মেঘ, আমাকে বললো, বাবা আমরা’তো বৃষ্টিতে ভিজেই গেছি, চলো আরো একটু ভিজি। আমরা বাপ-বেটা মিলে আবার ভিজতে শুরু করলাম, আমাদের এই কান্ড দেখে ‘ঢেউ’ তার মায়ের কাছ থেকে চলে এসে, আমাদের সাথে যোগ দিলো !

একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল । মেঘ/ঢেউ এর মা বললো, সে এখন বাসায় ফিরে যেতে চায় ! আমরা তার সাথে একমত হয়ে সিএনজিতে উঠে পরলাম । ততোক্ষণে কাশফুলের বনে সূর্যাস্ত হচ্ছে । আমাদের সিএনজি চলতে শুরু করলে, একটু পরেই দেখি—ঢেউ আমার কোলে ঘুমিয়ে পরেছে ! তখন তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক মায়া-আলো ছড়িয়ে পরেছে । আমরা তখন সেই মায়া-আলো সঙ্গী করে, ঘরে ফিরে চলছি ।

সেপ্টেম্বর , ২০২১

■ ডাইরি / দিয়াবাড়ী, উত্তরা

© মনিরুল আলম

© মনিরুল আলম

জল ছবি . . .

দিনের ঘাস খাওয়া শেষ হলে;
গোধূলী সন্ধ্যায় কৃষকের গরু গুলো হেলেদুলে কাশফুলের মাঠ পেরিয়ে যায়—ওরা একে একে ঘরে ফিরে ;

দলছুট একটা গরুকে দেখলাম—কার্তিকের মাঠে লাল, নীল নর-নারীদের দেখে থমকে দাড়িয়েছে ! তার চোখের ভিতরে এক জল ছবির ছায়া ; সবুজ ঘাসের দেশে ততোক্ষণে সন্ধ্যা-রাত্রি নেমেছে—আমরা জোনাকি পোকা দেখে দেখে বাড়ী ফিরছি . . .

সেপ্টেম্বর , ২০২১
■ ডাইরি / সারিঘাট, কেরানীগঞ্জ
© মনিরুল আলম

ছবি: মনিরুল আলম

এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া !

ছবি: মনিরুল আলম

আমাদের দেশে ছয় ঋতুর ভিভাজন কাল হিসেব করলে এখন চলছে—শরৎকাল। অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাস মিলে শরৎকাল । নীলাকাশে সাদা মেঘেরা এই ঋতুতেই ভেসে বেড়ায় ! আবার হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ জমে, ঝিরিঝির বৃষ্টি সব কিছু ভিজিয়ে দেয় ক্ষণিক সময়ের জন্য । দেখতে খুব অসাধারন লাগে । এটাই এই ঋতুর বৈশিষ্ট ।

সকালে ঘুম থেকে উঠেছি । বারান্দাতে দাঁড়াতেই দেখি গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পরছে ! মানুষজন কেউ কেউ ছাতা মাথায় নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন ! যদিও বেশীর ভাগ মানুষ এই গুড়িগুড়ি বৃষ্টিকে পাত্তা দেন না ! বারান্দায় লাগানো ফুলগাছ গুলোর দিকে তাকাতেই দেখলাম সবগুলো গাছ বৃষ্টিতে ভিজে একাকার ! আমাদের সামনের বাসার টিনের চালা দেওয়া বারান্দা থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার উপর পরছে ! মেঘ-ঢেউ’কে ডাকলাম তারা তখনো ঘুম !

নয়নতারা গাছটিতে বেশ কয়েকটা সাদা রঙের ফুল ফুটে আছে । ফুল এবং পাতাতে বৃষ্টির ফোটা লেগে থাকা এবং তাতে সূর্যের আলো পরায়— বৃষ্টির ফোটা গুলো খুব অসাধারন লাগছে ! যদিও দৃশ্যটি খুব সাধারন খুব সহজেই যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় । কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলেই মনের ভিতরে এক অসাধারন অনুভূতি তৈরি হয়— ভালো লাগে । আমার কাছে মনে হয়, এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া ! যদিও আমাদের বেশীর ভাগ মানুষদের এই সব ছোট ছোট অনুভূতি দিন দিন ভোতা হতে চলছে ! পাশাপাশি করোনাকালীন এই দুঃসময়ে আমরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, প্রযুক্তি নির্ভরতায় অভ্যস্ত হয়ে পরছে আমাদের জীবন . . .

ডাইরি / ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদী
শরৎকাল, আশ্বিন ১৪২৮
লেখা ও ছবি: মনিরুল আলম

ওয়েল কাম টু ধামরাই উপজেলা . . .

ছবি: © খালেদ সরকার

মনে মনে বৃষ্টির আশংকা করছিলাম, সেই চিন্তা থেকে
ক্যামেরা ব্যাগের মধ্যে ছাতা, রেইনকোট নিয়ে নিলাম সঙ্গে এক বোতল পানি । যাবো ধামরাই উপজেলায়, EPA-EFE এর জন্য একটা ষ্টোরি করতে হবে, সঙ্গী আমার প্রতিদিনের বাহন মটরসাইকেল । ঢাকা থেকে সড়ক পথে এই উপজেলাটির দূরত্ব প্রায় ৪২ কিলোমিটার, এখানে আগেও আসা হয়েছে।

বর্ষা মৌসুম শুরু না হলেও বেশ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে । গ্রীষ্মকাল শেষ হতে চলছে, আর ২/৩ দিন পরই শুরু হবে আষাঢ় মাস অর্থাৎ—বর্ষাকাল । খাল-বিল তখন ভরে উঠবে বর্ষার পানিতে, শুরু হবে নৌকা চলাচল, অবিরাম বৃষ্টি পরা শব্দের সাথে শোনা যাবে, ডোবায় ব্যাঙের ডাকাডাকি !

মনের আশংকা সত্য হলো । ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার, নবীনগর এলাকাতে পৌঁছানোর পর শুরু হলো, আকাশ থেকে মেঘের হাকডাক আর বিদ্যুৎ চমকানো । একটু পরেই আকাশ কালো করে শুরু হলো ঝুম— বৃষ্টি ! অগত্যা সড়কের পাশে মটরসাইকেল রেখে—ছাতা, রেইনকোট নিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম । আকাশ থেকে তখন ভারি বৃষ্টি পরছে, একটা অসাধারন বৃষ্টির ল্যান্ডস্কেপ চোখের সামনে দেখলাম । সেই সাথে বৃষ্টির শব্দ—এক কথায় অসাধারন লাগলো সেই মুহুর্ত ! মাঝে মাঝে বাতাসে বৃষ্টির ঝাপটা আমার ছাতাকে পাশকাটিয়ে ভিজিতে দিচ্ছিল আমাকে; এ এক অদ্ভুত অনুভুতি !

ঝড়ো বৃষ্টি-টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, ১০/১২ মিনিট ছিল, বৃষ্টি একটু কমতেই শুরু হলো, আবার আমার মটরসাইকেল যাত্রা ! গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি কেটে কেটে একটা সময় চলে এলাম আমার নিদিষ্ট গন্তব্যে — ওয়েল কাম টু ধামরাই উপজেলা ।

ধামরাই উপজেলার উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এখানেই বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রাচীন ও দেশের বৃহত্তম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় । হিন্দু সম্প্রদায়ের পূণ্যার্থীরা সারাদেশ থেকে এই রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে দলে দলে এখানে আসেন, প্রতিবছর ।

ষ্টোরি-টি শেষ করতে প্রায় দেড়ঘন্টা সময় পার হলে গেল, ততোক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে । এবার আমার ঢাকায় ফেরার পালা । ধামরাই বাজারে দেখতে পেলাম বিশাল— সেই জগন্নাথ রথটি । বাজার থেকে এক প্যাকেট পাউরুটি, কলা আর জাম কিনে নিলাম । মটরসাইকেল ড্রাইভ করতে করতে কোথাও থামিয়ে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নিবো। শুরু হলো আবার সেই আড়াই ঘন্টার মটরসাইকেল যাত্রা— রিটার্ন টু ঢাকা ।

ডাইরি / জুন ২০২১
পুরান ঢাকা © খালেদ সরকার

বৃষ্টি ভেজা ফুরুস ফুলেরা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

তখন বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকটাই । আমি বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি । দিনের পুরোটা সময়, এই এলাকাটিতে থাকে, পথচারীদের চলাচল আর নগর যানের দৌরাত্ব !

খেয়ালি— কোন পথচারী খানিক সময়ের জন্য পার্কটিতে একটু বিশ্রাম নিয়ে, আবার চলতে শুরু করেন তার নিজস্ব গন্তব্যে । স্বাস্থ্য সচেতন এলাকাবাসী সকাল-বিকেল এমনকি রাতের বেলাতেও হাঁটেন, নানা বয়সের ভবঘুরে মানুষদের অসঙ্গতি চোখে পরে— পার্কটিতে !

ক্যামেরা ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই চোখে পড়ল, পার্কটির ঊত্তর পাশের সম্প্রসারণ অংশে থোকায় থোকায় ফুটে আছে; বৃষ্টিতে ভেজা ফুলগুলো । আজ মনে হয়, ইচ্ছে মতো বৃষ্টিতে ভিজেছে— ওরা ! ফোটায় ফোটায় বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে তাদের ভিজে যাওয়া শরীর থেকে ।

গাছগুলোর শরীরে লেগে থাকা পানির ফোটার আলোকিত বিচ্ছুরণ—অনেক দূর থেকে দেখা যায় । কোনো কোনো পথচারীরকে দেখলাম, বৃষ্টিতে ভেজা সেইসব ফুলগুলোর সৌন্দর্য দেখছিলেন খানিক দাড়িয়ে ।

ভিজে যাওয়া ফুল গাছগুলোর অনেক গুলো ছবি তোলা হলো । ঘোড়ার গাড়ীর ছুটে চলার শব্দ, রিকশার টুংটাং আর পার্কটিকে ঘিরে থাকা বাসের সেইসব শব্দ পিছনে ফেলে আমি ফিরে চললাম ।

আর হ্যাঁ — আমি যে ফুলটা দেখে আলোড়িত হয়েছিলাম, আমরা তাদের ‘ফুরুস ফুল’ বলে ডাকি . . .

ডাইরি / মে ২০২১
বাহাদুর শাহ পার্ক, পুরান ঢাকা