এই হিজলের মাটিতে দিবো এক দীর্ঘ ঘুম . . .

নোট: ছবিটি তুলে দিয়েছিল আমার কাজিন, সুমন ।
জানুয়ারি ২০১৫ হিজুলিয়া, মানিকগঞ্জ © মেহেদী হাসান

আমন ধানের চাল দিয়ে ভাত রান্না করলে, সেই ভাত খেতে অন্যরকম এক স্বাদ পাওয়া যায় । আগে আমাদের গ্রামের বাড়ী ‘হিজুলিয়া’ থেকে নিয়মিত সেই চাল আসতো। আমাদের ঢাকার বাসায়, সাথে আসতো খাঁটি সরিষার তেল, খেজুরের গুঁড় সহ—নানা সুস্বাদু খাবার !

এসব মূল্যবান খাবারের মর্ম ছোট বয়সে ঠিক বুঝে উঠতে শিখিনি। এখন এই বয়সে এসে, সেইসব খাবারের মর্ম উপলব্ধি করি । কিন্তু সময় পেরিয়ে গেছে ! ইচ্ছে করলেই সেই সময়কে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় ! যদিও শহুরে জীবনাচরণে বড় হয়ে উঠা এই আমি, আমাদের পরিবার । তথাপি, হিজুলিয়ার সেই ছোট্ট গ্রামের মায়া ত্যাগ করতে পারিনি । সেটা সম্ভব নয় —এই জীবনে । আমার বাবা, দাদা-দাদী পরম শান্তিতে এই হিজুলিয়ার মাটিতে দিয়েছেন—একঘুম । আমারও ইচ্ছা মৃত্যুর পর, এই হিজলের মাটিতেই দেবো দীর্ঘ ঘুম, পরম শান্তিতে—নিঃশব্দে !

ছোটবেলার সেইসব স্মৃতি মাঝে মাঝে মনের গহীনে এক বিশাল ছায়া ফেলে । ফিরে যাই আমার সেইসব সুখ-দুঃখ ভরা কৈশোরের জীবনে । হিজুলিয়ার সেই পুকুর ঘাট, মাছরাঙ্গা পাখির বসে থাকা, একা দাড়িয়ে থাকা হিজল গাছ, সেই সিঁদুরে আম গাছ । কিংবা ছোট খাল পেরিয়ে করবস্থানের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে, দিগন্ত বিস্তৃত সরিষা ক্ষেতে হারিয়ে যাওয়া ! আহা, আমার সেইসব দুরন্তপনা ! সেইসব কৈশোর !

আমাদের মানিকগঞ্জে এখনো প্রচুর সরিষার চাষ হয় । ফুপাতো ভাই, মুকুলের আহবান থাকে, শীতকালে বাড়ী যাবার জন্য । খেজুরের রস, খেজুরের গুঁড় দিয়ে তৈরি পিঠা খাবার জন্য । শীতের সময় সরিষা ক্ষেত দেখতে খুব সুন্দর লাগে । চারিদিকে শুধু হলুদ আর হলুদের সমারোহ। আখ এবং খেজুরের গুঁড়ের জন্য এই এলাকা এখনো বিখ্যাত হয়ে আছে । আমন ধানের চাষ একসময় ব্যাপক হতো, এখন আর সেই আকারে চাষ হয় না ।

সকালে মায়ের হাতে মাখানো বাসি-ভাত ছিল আমার খাবারের তালিকায় পছন্দের একটি খাবার । সরিষার তেল, মরিচ, পিয়াজ, লবণ আর ধনিয়া পাতা দিয়ে মাখানো সেই ভাত খেতে খুব সুস্বাদু ছিল।পেটপুরে সেই খাবার খেয়ে, তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতাম ! ততোক্ষণে স্কুলে, কলেজে যাবার সময় হয়ে যেতো । আমার মায়েরও এই খাবারটা তার পছন্দের তালিকায় ছিল । বাবা অবশ্য ডিম ভাজা দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ করতেন !

ঢাকা শহরে পার্ট-টাইম চাকুরি করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে, আইন পেশায় নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন— আমার বাবা । এখন উপলব্ধি করি সেই সময়ে শহুরে জীবনের সংসার চালাতে কিছুটা অর্থনৈতিক সমন্বয় করাটা কেন জরুরি ছিল !

এখন নানা কারণেই সেই আমনের চাল গ্রামের বাড়ি থেকে আসে না । যদিও মাঝে মধ্যে সরিষার তেলটা আনা হয়, সেটাও এখন অনিয়মিত ! আমাদের মায়ের দীর্ঘ অসুস্থতা, সামাজিক নানা কারণ-অকারণে জীবনের কিনারা ঘেঁষেই এই শহর কেন্দ্রিক জীবন চলে যাচ্ছে ।

সেদিন বুবলীকে বলেছিলাম, ধনিয়া পাতা, সরিষার তেল দিয়ে মাখা বাসি-ভাত খেতে খুব ইচ্ছে করছে ! বুবলী তার ছোট্ট পরিসরে সেই আয়োজন করেছিল, তাকে ধন্যবাদ ।

মায়ার এই সংসারে মেঘ-ঢেউ বড় হয়ে উঠছে, এই শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তারা ! ওরা নিশ্চই একদিন ওদের হিজুলিয়া’কে চিনে নিবে . . .

ডাইরি / পুরান ঢাকা,
মার্চ, ২০২২ © মনিরুল আলম

When the color influence me . . .

মায়া-আলোয় শরৎ দেখা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

নীলাকাশে তখন সবেমাত্র সূর্য্যস্তের রঙ লাগতে শুরু করেছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সাদা মেঘ গুলো কোথাও কোথাও সেই রঙের আভায় ঝলকাচ্ছে, আহা— কি যে সুন্দর দেখতে ! এটাকেই বলে প্রকৃতির—ক্যানভাস । চারিদিকে শান্ত নিরবতা, মৃদু বাতাস আর শুভ্রতা নিয়ে দাড়িয়ে থাকা কাশফুলেরা, আমাদের কাছে আজকের পৃথিবীটার গল্পটা যেন এমনই—ভালোবাসার, আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

প্রকৃতি— তার নিজের ভিতর এমন একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ধারণ করে যে, মানুষের দল সেই মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে ! মানুষের মাথার ভিতরে এক ধরণের ‘বোধ’ তৈরি হয় ! চারিদিকের পরিবেশটা তখন এক আশ্চর্যময় ভালোলাগা তৈরি হয় । আবার এর বিপরীতও হয়— সেটা বোধহীন মানুষের বেলায় খাটে !

দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে, একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে, এখানে। আমরা তখন শরতের কাশফুল ঘেরা মাঠে হেঁটে চলছি, মৃদু ছন্দে । এখানে, সেইসব নীলাকাশে সাদা মেঘেরা খেলা করে, ঐ যে দূরে—দিগন্ত রেখা দেখা যায়; ঠিক তার নিচেই মাঠের প’রে মাঠে ছড়িয়ে আছে কাশফুলেরা—ওরা যেন সব শরৎ ছবি হয়ে আছে !

হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে কেমন যেন এক ধরণের শীতল অনুভূতি হতে লাগলো, বাতাসের গতিবেগ কিছু একটা ইঙ্গিত দিতে চাইছে, কাশফুল গুলোতে যেন সেটা বুঝতে পেরে কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে ! প্রকৃতির ‘খেয়াল’ বলে কথা ।

ওমা— এইসব যখন ভাবছি, তখন দেখি আকাশ তার ক্যানভাস একদম পাল্টে ফেলছে ! আকাশ জুড়ে তখন কালো মেঘের আনাগোনা—বৃষ্টি নামবে বলে মনে হয় ! মেঘ— তখন হঠাৎ করে চিৎকার করে বলে উঠলো, বাবা প্লেন ! দেখো কতো নিচ দিয়ে চলছে ! আমরা তখন সবাই তাকালাম, ঢেউ’ সেই প্লেন দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো ! আমি মেঘ’কে বললাম, ওটা নামছে একটু দূরেই আমাদের এয়ারপোর্ট, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ।

বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল ততোক্ষণে ! আমরা তখন বৃষ্টি ভেজা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে কোন একটা ছাউনি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু আশেপাশে সেরকম কিছু চোখে পরলো না, বেশ দূরে একটা নির্মাণাধীন ব্রীজ দেখলাম, সেটাকে টার্গট করে দ্রুত হাঁটতে লাগলাম ! তবে সেই ব্রীজ পর্যন্ত পৌঁছাতে যথেষ্ট ভিজে গেলাম, আমরা । মজার ব্যাপার হলো, ঢেউ এবং মেঘ এই বৃষ্টিতে ভিজতে পেরে ওরা তাদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। ঢেউ—বলে উঠলো, বাবা এই বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগছে, আমি বললাম, বিউটিফুল মনের আনন্দে ভিজো— ‘মা’ । আজ ছোট এই মানুষটির কাশফুলের মাঠে বৃষ্টিভেজার অভিজ্ঞতা হচ্ছে !

মেঘ’কে দেখলাম কাশফুলের মাঝে তার দুই হাত প্রসারিত করে, সে বৃষ্টিটাকে খুব উপভোগ করছে । অন্যদিকে মেঘ/ঢেউ এর মা, মেঘের সেই দৃশ্য দেখে তার দিকে ‘কটমট’ করে তাকিয়ে বলছে, মেঘ দ্রুত হাঁটো ! বেচারী বেশ খানিকটা ভিজে গেছে, বৃষ্টিতে ! অবশেষে আমরা ব্রীজের নিচটায় আশ্রয় নিলাম, ততোক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, এখানে ।

ব্রীজটির নিচে দাড়িয়ে আমরা বৃষ্টি পরা দেখতে লাগলাম, কাশশফুলের বনে তখন অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে ! মেঘ, আমাকে বললো, বাবা আমরা’তো বৃষ্টিতে ভিজেই গেছি, চলো আরো একটু ভিজি। আমরা বাপ-বেটা মিলে আবার ভিজতে শুরু করলাম, আমাদের এই কান্ড দেখে ‘ঢেউ’ তার মায়ের কাছ থেকে চলে এসে, আমাদের সাথে যোগ দিলো !

একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল । মেঘ/ঢেউ এর মা বললো, সে এখন বাসায় ফিরে যেতে চায় ! আমরা তার সাথে একমত হয়ে সিএনজিতে উঠে পরলাম । ততোক্ষণে কাশফুলের বনে সূর্যাস্ত হচ্ছে । আমাদের সিএনজি চলতে শুরু করলে, একটু পরেই দেখি—ঢেউ আমার কোলে ঘুমিয়ে পরেছে ! তখন তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক মায়া-আলো ছড়িয়ে পরেছে । আমরা তখন সেই মায়া-আলো সঙ্গী করে, ঘরে ফিরে চলছি ।

সেপ্টেম্বর , ২০২১

■ ডাইরি / দিয়াবাড়ী, উত্তরা

© মনিরুল আলম

© মনিরুল আলম

এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া !

ছবি: মনিরুল আলম

আমাদের দেশে ছয় ঋতুর ভিভাজন কাল হিসেব করলে এখন চলছে—শরৎকাল। অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাস মিলে শরৎকাল । নীলাকাশে সাদা মেঘেরা এই ঋতুতেই ভেসে বেড়ায় ! আবার হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ জমে, ঝিরিঝির বৃষ্টি সব কিছু ভিজিয়ে দেয় ক্ষণিক সময়ের জন্য । দেখতে খুব অসাধারন লাগে । এটাই এই ঋতুর বৈশিষ্ট ।

সকালে ঘুম থেকে উঠেছি । বারান্দাতে দাঁড়াতেই দেখি গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পরছে ! মানুষজন কেউ কেউ ছাতা মাথায় নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন ! যদিও বেশীর ভাগ মানুষ এই গুড়িগুড়ি বৃষ্টিকে পাত্তা দেন না ! বারান্দায় লাগানো ফুলগাছ গুলোর দিকে তাকাতেই দেখলাম সবগুলো গাছ বৃষ্টিতে ভিজে একাকার ! আমাদের সামনের বাসার টিনের চালা দেওয়া বারান্দা থেকে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার উপর পরছে ! মেঘ-ঢেউ’কে ডাকলাম তারা তখনো ঘুম !

নয়নতারা গাছটিতে বেশ কয়েকটা সাদা রঙের ফুল ফুটে আছে । ফুল এবং পাতাতে বৃষ্টির ফোটা লেগে থাকা এবং তাতে সূর্যের আলো পরায়— বৃষ্টির ফোটা গুলো খুব অসাধারন লাগছে ! যদিও দৃশ্যটি খুব সাধারন খুব সহজেই যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় । কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলেই মনের ভিতরে এক অসাধারন অনুভূতি তৈরি হয়— ভালো লাগে । আমার কাছে মনে হয়, এখানেই প্রকৃতির শ্রেষ্ঠত্ব—মায়া ! যদিও আমাদের বেশীর ভাগ মানুষদের এই সব ছোট ছোট অনুভূতি দিন দিন ভোতা হতে চলছে ! পাশাপাশি করোনাকালীন এই দুঃসময়ে আমরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, প্রযুক্তি নির্ভরতায় অভ্যস্ত হয়ে পরছে আমাদের জীবন . . .

ডাইরি / ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদী
শরৎকাল, আশ্বিন ১৪২৮
লেখা ও ছবি: মনিরুল আলম

বৃষ্টি ভেজা ফুরুস ফুলেরা . . .

ছবি: মনিরুল আলম

তখন বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকটাই । আমি বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি । দিনের পুরোটা সময়, এই এলাকাটিতে থাকে, পথচারীদের চলাচল আর নগর যানের দৌরাত্ব !

খেয়ালি— কোন পথচারী খানিক সময়ের জন্য পার্কটিতে একটু বিশ্রাম নিয়ে, আবার চলতে শুরু করেন তার নিজস্ব গন্তব্যে । স্বাস্থ্য সচেতন এলাকাবাসী সকাল-বিকেল এমনকি রাতের বেলাতেও হাঁটেন, নানা বয়সের ভবঘুরে মানুষদের অসঙ্গতি চোখে পরে— পার্কটিতে !

ক্যামেরা ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করেই চোখে পড়ল, পার্কটির ঊত্তর পাশের সম্প্রসারণ অংশে থোকায় থোকায় ফুটে আছে; বৃষ্টিতে ভেজা ফুলগুলো । আজ মনে হয়, ইচ্ছে মতো বৃষ্টিতে ভিজেছে— ওরা ! ফোটায় ফোটায় বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে তাদের ভিজে যাওয়া শরীর থেকে ।

গাছগুলোর শরীরে লেগে থাকা পানির ফোটার আলোকিত বিচ্ছুরণ—অনেক দূর থেকে দেখা যায় । কোনো কোনো পথচারীরকে দেখলাম, বৃষ্টিতে ভেজা সেইসব ফুলগুলোর সৌন্দর্য দেখছিলেন খানিক দাড়িয়ে ।

ভিজে যাওয়া ফুল গাছগুলোর অনেক গুলো ছবি তোলা হলো । ঘোড়ার গাড়ীর ছুটে চলার শব্দ, রিকশার টুংটাং আর পার্কটিকে ঘিরে থাকা বাসের সেইসব শব্দ পিছনে ফেলে আমি ফিরে চললাম ।

আর হ্যাঁ — আমি যে ফুলটা দেখে আলোড়িত হয়েছিলাম, আমরা তাদের ‘ফুরুস ফুল’ বলে ডাকি . . .

ডাইরি / মে ২০২১
বাহাদুর শাহ পার্ক, পুরান ঢাকা

ঘাস ফুল . . .

ছবি: মনিরুল আলম

ছোট শিশুদের ফেলে দেওয়া বাথটবে-ই তার জন্ম ! অনেকটা অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে উঠা, এতো ছোট যে অনেক সময় বড়দের ভীড়ে, তাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না, কোথায় যেন হারিয়ে যায়—সে !

কিন্তু ঐ যে, ছোট শিশুদের নিয়ে সব সময় একটা অন্যরকম আকর্ষন থাকে; দেখতে পেলেই তাকে ভালোবাসতে , আদর করতে ইচ্ছে করে । তাকে দেখে আমার কাছে তাই মনে হলো । কিভাবে দাড়িয়ে আছে সে—একাকী সকলের ভীড়ে !

সেদিন—আমাদের ছাদবাগানে নানা লতা-পাতা, গ্লুম দেখতে দেখতে আমি দেখতে পেলাম তাকে । মুগ্ধতা নিয়ে বেশ কিছু ছবি তোলা হলো, তারপর তাকে জানার জন্য চললো কিছু খোঁজ-খবর ।

শহরের মানুষ তাকে ‘পর্তুলিকা’ নামে চেনেন, গ্রামের মানুষেরা তাকে ডাকে তাদের— ঘাস ফুল ।

[ ডাইরি ] পুরান ঢাকা
মে / ২০২১ © মনিরুল আলম

একজন Brilliant ফটোসাংবাদিক, শফিকুল আলম . . .

ছবি: © শফিকুল আলম

ফটোসাংবাদিক—শফিকুল আলম Shafiqul Alam এর কাজের সাথে আমি দীর্ঘদিন পরিচিত, খুব ছোট করে যদি বলতে হয়— শফিকের কাজ বিশেষ করে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে, নিউজ ফটোগ্রাফীর ক্ষেত্রে— অনন্য ।

দৈনিক পত্রিকায় ঠিক কোন ছবিটি ছাপা হতে পারে, বা কি ধরণের ছবি তুলতে হবে ডেইলি নিউজের জন্য, শফিক এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন Brilliant ফটোসাংবাদিক বলে আমার কাছে মনে হয় ।

সংবাদপত্রের জন্য সারাদিনে কোন Breaking News বা বড় কোন ঘটনা না ঘটলেও শফিক জানেন তার পত্রিকাটির কি চাহিদা রয়েছে । অন্যদিকে Breaking News কাভার করার সময় ঠিক কোন ছবিটা তুলতে হবে এবং সেই ছবিটির কম্পোজিশন, ভিজুয়াল ইনফরমেশনটা ( পাঠকের জন্য Massage ) কি হবে—তা সে জানেন, এখানেই শফিক অন্যদের থেকে—ব্যতিক্রম ।

কোন নিউজ ইভেন্ট কাভার করার ক্ষেত্রে ফটোসাংবাদিকতার নিউজের যে এঙ্গেল বা পয়েন্ট অব ভিউ, বা অগ্রজ্ঞান বলতে যা বুঝায়, শফিক চট করে তা বুঝে ফেলেন এবং তা তাঁর ক্যামেরায় তুলে আনেন । তাঁর কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এটি । যা আমার কাছে খুব ভালো লাগে, নিউজ ছবি নিয়ে অসমান্য তার চিন্তা শক্তি কাজ করে ।

যারা নতুন ফটোসাংবাদিকতা করছেন বা ফটোসাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করছেন তাদেরকে বলবো— শফিকের কাজ গুলো Study করতে । এতে করে দুটি জিনিস জানা হবে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে Daily News Events কাভার করার ক্ষেত্রে, কোন কোন বিষয় গুলো গুরুত্ব দিতে হবে, তা জানা হবে । এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ফটোসাংবাদিক কি করে সঠিক নিউজের ছবিটি তুলেন, তা জানা যাবে ।

শফিক প্রায় ১৮ বছর যাবত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় কাজ করে আসছেন, বর্তমান তিনি দৈনিক The Financial Express সিনিয়র ফটোসাংবাকিক হিসাবে কাজ করছেন ।

অকৃত্রিম এবং বন্ধুসুলভ এই মানুষটি আমার এই ছবিটি তুলে পাঠিয়েছন । সেদিন, ১ মার্চ, ২০২১ তারিখে বাম সংগঠন গুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ঘেরাও কর্মসুচি আমরা এক সাথে কাভার করেছিলাম ।

শফিক আপনার জন্য শুভ কামনা, ভালো থাকবেন . . .

[ ডাইরি ] পুরান ঢাকা
মার্চ / ২০২১ © শফিকুল আলম

মাথার উপরে পূর্ণিমার চাঁদ . . .

আমাদের মাথার উপরে তখন ভরা পূর্ণিমার বিশাল আকাশ ছবি: মনিরুল আলম

পূর্ণিমার চাঁদ / Full Moon —আমার কাছে সর্বদা এক ‘কাব্য রহস্য’ বা Poetic Mystery বলে মনে হয়, কি জানি এর অর্থ হয়তো-বা অন্য কোন কিছু । সেদিন পূর্ণিমা দেখতে আমরা তিনজন ছাঁদ-বাগানে বসে ছিলাম, আমাদের মাথার উপরে তখন ভরা পূর্ণিমার বিশাল আকাশ।

মেঘ, ঢেউ আমাকে চাঁদের ছবি তুলতে সাহায্য করেছিল, আমি ছবি তোলা শেষে চাঁদ নিয়ে ছোট বেলায় জানা, নানা গল্প আর চাঁদ বিজ্ঞানের নানা কথা শোনালাম । চাঁদের এই ‘কাব্য রহস্য’ ওদের মনে হয়তো ভালো লাগলো । চাঁদের এই ছবিটি Double Exposure দিয়ে তোলা হয়েছিল, সে গল্প না হয়, অন্য কোন দিন বলা যাবে . . .

[ ডাইরি ] পুরান ঢাকা
এপ্রিল / ২০২১ © মনিরুল আলম

জয়ীতার—‘আলোর মানুষ’ শীর্ষক প্রদর্শনী নিয়ে আলাপচারিতা . . .

দৈনিক পত্রিকায় রুটিন কাজ করে, নিজের চিন্তার কাজ বের করা এবং সেই কাজের প্রদর্শনী করা— বাংলাদেশে ফটোসাংবাদিকতার পরিপ্রেক্ষিতে খুব একটা সহজ পথ নয় ! এর জন্য মনের সাহসিকতা এবং কঠোর পরিশ্রমী হতে হয় । নিজের ভিতরের শক্তিকে জাগাতে হয় । জয়ীতার— ‘আলোর মানুষ’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, জয়ীতার সেই শক্তি আছে, তিনি পারেন ।

প্রতিদিন কাঁধে ক্যামেরা ব্যাগটি ঝুলিয়ে তার সঙ্গী স্কুটি বাইকটি নিয়ে বেড়িয়ে পরেন । তুলে আনেন, এই শহরেরই বুকে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, সংশ্লেষণ ঘটনা। কখনো বা পত্রিকার পাতায় সেইসব ছবি নানা শিরোনামে, ক্যাপশনে ছাপা হয় । ছাপা হওয়া ছবি দেখে মনে এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করে । ছাপা না হলে মন খারাপ হয়, কিন্ত ভেঙ্গে পরেন না । ঐ যে বললাম— একজন ‘মানুষ’ জয়ীতা অনেক প্রাণ শক্তি ধারণ করেন. . .

দৃক গ্যালারি / পান্থপথ, ঢাকা
১১ মার্চ ২০২১ © মনিরুল আলম

জয়ীতা— ‘আলোর মানুষ’শীর্ষক প্রদর্শনীর ছবির গল্প . . .
ছবি: মনিরুল আলম
জতীয়া— তার কাজ নিয়ে যা জানালেন । ভিডিও ধারণ: মনিরুল আলম

সেলফ পোট্রেট . . .

সেলফ পোট্রেট । ছবি: মনিরুল আলম

সেদিন শান্তি নগর গিয়েছিলাম । একটা ব্যক্তিগত কাজ ছিল । লিফট দিয়ে নামছি— লিফটের গ্লাসে আমারই প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠেছে, সেটা আমার নজরে এলো । মাস্কের আবরণে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা পরে আছে, কিছুটা যেন অস্পষ্ট, অচেনা লাগছিল নিজের আত্মপ্রতিকৃতিটি দেখে ! মোবাইল ক্যামেরাটি দিয়ে মুহুর্তটির ছবি তুলে রাখলাম ।

করোনাকালীন সময়— এখন সময়ের দাবি মাস্ক পরিধান করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া । এটাই এখন নিজেকে এবং অন্যকে সুস্থ রাখার স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে । আজকাল এই শহরের অনেক জায়গাতে একটি লেখা বেশ চোখে পরে—No mask, No service । সেদিন দেখি, মেঘ আমাদের ছাঁদের দেয়ালে বিভিন্ন জায়গায় ইটের টুকরা দিয়ে এই কথাটি লিখে রেখেছে ।

শহরের মানুষ আগের থেকে অনেকটা ( কম-বেশী ) এই বিষয়ে সচেতন হয়েছেন । তবে এই সচেতনতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা উচিত—আমাদের সবার । ইতিমধ্যে COVID-19 এর ভ্যাকসিন আমাদের দেশে চলে এসেছে । করোনাযুদ্ধের সম্মুখ যোদ্ধারা এরই মধ্যে ভ্যাকসিন নিতে শুরু করেছেন । এ মাসেই শুরু হবে সবার জন্য করোনা ভ্যাকসিন কর্মসুচি । তবে করোনাকালীন সংকটময় সময়টা— মানুষ চিরদিন মনে রাখবে । এই মহামারি জনিত রোগে অনেকেই হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জন। যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি । যারা অসুস্থ রয়েছেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি তারা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেন । সবার জীবন সুস্থ এবং সুন্দর কাটুক— এই প্রত্যাশা ।

Norwegian ফটোগ্রাফার— আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক
Morten Krogvold, বাংলাদেশে এসেছিলেন তার তোলা ছবির প্রদর্শনী নিয়ে ( ছবি মেলার আমন্ত্রণে ) পাশাপাশি আমাদের একটা কর্মশালা নিয়েছিলেন । আমি সেই কর্মশালাতে অংশগ্রহণ করেছিলাম । তার প্রথম আ্যসাইমেন্ট ছিল Self-Portrait তোলা । মুল বিষয়টি ছিল, অনেকটা এরকম—আমি নিজেকে আমার ক্যামেরায় কিভাবে দেখতে চাই এবং উপস্থাপিত হতে চাই । আমরা তা প্যাটিক্যাল করে আমাদের কর্মশালাতে উপস্থাপন করেছিলাম । এই সেলফ পোট্রেটটি তুলতে গিয়ে সেই সময়ের অনেক স্মৃতি মনে পরে গেল ।

আত্মপ্রতিকৃতি Self-Portrait কিংবা group selfie এখন সময়ের দাবি ।বিশেষ করে মোবাইলের সাথে ক্যামেরা সংযুক্ত হবার পর, এই ছবি তোলার প্রবনতা আগের তুলনায় অনেক বেশী বেড়েছে । মানুষ প্রযোজনে-অপ্রযোজনে নিজের সেলফি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট দেন এবং লিখে দেন, এটা এমনি এমনি তুললাম ! অবচেতন মনে, আমরা অনেক সময় অনেক কিছু করি । সব সময় সব কিছুর কারণ খুঁজতে গেলে, অনেক সময় আনন্দটা নষ্ট হয়ে যায়—মন খারাপ হয় ।

সেলফ পোট্রেটটি তোলার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঘটনাস্খলটির একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণিক দলিল বা স্বাক্ষ্য বহন করা । যা অত্যন্ত সহজ এবং দ্রুততার সাথে বর্তমানে মোবাইল ফোনটি দিয়ে তোলা যায়, সংরক্ষণ করা যায় চাইলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যায় । ছবি তোলার গুরুত্বের দিক থেকে বলতে গেলে—আজকের তোলা একটি আলোকচিত্র / ছবি আগামী দিনের ইতিহাস। যা সেই সময়ের স্মৃতিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মনে রাখে, প্রকাশ করে . . .

■ ডাইরি / ঢাকা
ফেব্রুয়ারি, ২০২১