শিল্পীত জীবন শিল্পীত মৃত্যু । কাইয়ুম চৌধুরী । ৯ মাচর্ ১৯৩২- ৩০ নভেম্বর ২০১৪

IMG_1909.JPG

৩০ নভেম্বর ২০১৪ রাতে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে বক্তব্য দেওয়ার সময় বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে শিল্পীকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। রাত নয়টার পর এই গুনী শিল্পী চলে যান না ফেরার দেশে । তার আত্মার শান্তি কামনা করি । শিল্পী না ফেরার দেশে ভালো থাকবেন . . .

শিল্প-সংস্কৃত বিষয়ক আ্যসাইনমেন্ট গুলোতে গেলে- মাঝে মাঝে এই গুনী শিল্পীর সাথে দেখা হতে। কথোপকথন মধ্য কুশল বিনিময় হতো – জিজ্ঞেস করতেন, ভালো কি না ? আমি উত্তরে মাথা নেড়ে বলতাম,’জ্বী স্যার ভালো’। গ্যালারি গুলোতে যখন ছবি দেখতেন- তার হাত দুটি পিছনে থাকতো একটার উপর আরেকটা । তিনি সামনের দিকে মনে হয় যেন একটু ঝুঁকে; অত্যন্ত নিবিষ্ট মনে কাজ গুলো দেখতেন । আমি অনেক বার তার এই ভঙ্গী লক্ষ করেছি । যতো টুকু বুঝেছি – চুপচাপ থাকতে সে পছন্দ করতেন । তার সাবর্র্ক্ষনিক সঙ্গী ছিলেন আর এক শিল্পী অশোক কমর্কার। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ছবি আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছে- আমাদের গ্রাম বাংলাকে, আমাদের এই বাংলাদেশে’কে ।

আমার ব্যক্তিগত ব্লগে ‘মেঘমনিরের দেশে’ তার শেষ একক প্রদশর্নী ‘কোয়েষ্ট অফ সেল্ফ’ (যার বাংলাটা করা হয়েছে ‘‘আত্নানুসন্ধান’’) সম্পর্কে লিখেছিলাম । সেখান থেকে তার কাজ সম্পর্কে আমার অনুভুতি তুলে ধরলাম ।

গ্যালারীতে প্রবেশ করে- প্রথমেই যেটা আমার মনটাকে- চমকে দিলো সেটা হলো বিশাল এক রঙের রাজ্যে যেন এখন আমার পদার্পণ। এক একটা ক্যানভাস যেন এক একটা অদ্ভুত বর্ণিল জগত; সেই জগতে রঙ, তুলি আর ক্যানভাসের সাথে বাস করছে গ্রামীণ নারী, কৃষক-জেলে-রাখাল, নদী-নৌকা-গলুই, বৃক্ষ, সূর্য, পাখ-পাখালি- সেই সাথে আরো বাস করছে মাটির সোদা গন্ধ, জল-জোছনারা; সেই আবহমান বাঙলারা; আমার প্রিয় জন্ম ভূমি- বাংলাদেশ।

সৃজন এই শিল্পীর কাব্যিক চিত্র গুলো যেন আমাকে নিস্পলক অভিবাদন জানায়- আমি অপলক দেখতে থাকি শিল্পীর অনবদ্য সেই সৃষ্টি- এই আলো আধারির দেয়ালে দেয়ালে। অ্যাক্রিলিক, প্যাস্টেল কখনো বা সেরিগ্রাফকে মাধ্যম করে আঁকা তার এই ‘‘ভিন্ন মাত্রার কাজ’’ পুরোটাই জ্যামিতিকায়িত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে আর চিত্র প্রেমীরা তা মুগ্ধ হয়ে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছেন এই শিল্পালয়ে।

শিল্পীর ৮০টি ছবিই ‘কোয়েষ্ট অফ সেল্ফ’ (যার বাংলাটা করা হয়েছে ‘‘আত্নানুসন্ধান’’) সিরিজের অন্তর্গত। গ্যালারি ঘুরলে আর একটা বিষয় নজরে আসে সেটা হলো বেশীর ভাগ ছবির পাশে লাল টিপ পড়ানো হয়ে গেছে। অর্থাৎ শিল্পের ক্রেতারা তা ইতিমধ্যে তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ছবি দেখতে দেখতে মনে পরে যায় আমাদের রুপসী বাংলার কবি- জীবনানন্দ দাশকে। সেই সাথে মনে পরে তার অনন্য চিত্রকাব্য রুপসী বাংলাকে।

একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে
বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে রবো-পশমের মতো লাল ফল
ঝরিবে বিজন ঘাসে, (রুপসী বাংলা )

কিংবা মনে পড়ে- কবির সেই বহুল পাঠ্য কবিতাটি-

রাঙা মেঘ সাতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিব ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে। ( রুপসী বাংলা )

আবহমান এই বাংলাকে শিল্পী দেখেছেন তার বাল্যকালে, আশৈশবে, যৌবনে আর এখন দেখছেন এই পড়ন্ত কালে- পঞ্চাশ দশকে প্রতিষ্ঠিত বর্ষীয়ান গুণী শিল্পীর এই ‘‘ভিন্ন মাত্রার কাজ’’ নিশ্চই অনভিপ্রেত নয় বরং অনেক অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পারিপাট্য- বিষয়ে, মননে, তুলির আচড়ে আর রঙে। শিল্পীর এই অগ্রযাত্রাকে আবারও অভিবাদন ! সেই সাথে তার ৮০তম জন্মদিনে রং তুলি আর ক্যানভাসের বর্ণিল শুভেচ্ছা . . .

মনিরুল আলম-১৮ মার্চ,২০১২ বেঙ্গল শিল্পালয় ধানমন্ডির ঢাকা।

নোট: বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এই পোট্রেটি তুলেছিলাম- এ বছরের জুলাই মাসে বেঙ্গল শিল্পালয় ধানমন্ডিতে।

পাতলা খান লেন, পুরান ঢাকা

মনিরুল আলম, নভেম্বর, ২০১৪

Copy Right Notice:
All images,videos, ART and text in this site is copyrighted. http://www.monirulnews.com Please don’t use any image without written permission. Please contact witnessphoto@gmail.com