গাড়ীর লাইট,বডি,সিট কিছুই ঠিক নাই ? আমার কথাটা শুনে সে যেন আরো বিরক্ত হলো ! সে বলল, সব কিছুই ঠিক আছে—ফিটনেস ঠিক আছে, লাইন ম্যান ঠিক আছে, সার্জেন্ট ঠিক আছে । আপনি আমার গাড়ীর ছবি তুলবেন না । আমি তাকে বললাম, এই গাড়ী রাতে চলাচল করলে এ্যাকসিডেন্ট হইতে পারে— এইটা আপনার জন্য ক্ষতি, যাত্রীদের জন্য ক্ষতি ! ছবিটা প্রকাশ করা হলে আপনি নিজেও সর্তক হবেন, অন্যরাও সর্তক হবেন ! রাগ কইরেন না ভাই ! আর আপনার গাড়িতেই তো লিখে রেখেছেন” পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত মানুষের বিবেক ! গাডীটার দিকে একবার তাকিয়ে বলেনতো, আপনার বিবেক কী বলে !
ভাই কিছু নিয়ম-কানুন তো মানতে হয়, তাই না ! তার সাথে কথা বলতে বলতে সে একটু যেন নরম হয়ে এলো ! তার সাথে থাকা লোকজন আস্তে আস্তে সরে গেলেন ! মানুষকে বুঝিয়ে বললে— হয়তো কিছুটা কাজ হয় । হিউম্যান হলারটির নাম ছিল—নিশা পরিবহন । পরিবহনটি মতিঝিল-বাসাবো লাইনে চলাচল করে ।
উমাম, ইরফান ভাইয়ের ছেলে আমাকে জানালো, আংকেল আমার বাবা’কে নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছি । লেখাটা আপনাকে পাঠাতে চাই, একটু পড়ে দেখবেন । আমি উমাম’কে বললাম, লেখাটা আমাকে ই-মেইল করো । মাত্র কয়েক দিন হলো, এই ছোট মানুষটি তার প্রিয় বাবা’কে—চির দিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে ! তার মনের অনুভূত কি রকম হতে পারে তা খুব সহজেই—অনুমেয় । আমি উমাম’কে বলি, তুমি লেখাটা পাঠাও, সম্ভব হলে লেখাটা আমাদের পত্রিকায় ছাপাতে চেষ্টা করবো । লেখাটা ছাপা হলে, হয়তো ছোট এই মানুষটির মন কিছুটা হলেও— সান্তনা খুঁজে পাবে !
ইরফান’কে হত্যা করে হয়েছে ! তার মৃত্যুটি স্বাভাবিক ভাবে হয়নি । তার মৃত্যুটি ছিল—নির্মম একটি হত্যাকান্ড ! স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়ে— আমরা মানব বন্ধন করেছি । রাষ্ট্রের কাছে এই হত্যাকান্ডের বিচার চাওয়া ছিল— আমাদের একটা নিরব প্রতিবাদের অংশ । পরিবারটি বা আমরা এতটুকু সান্তনা পাবো—যদি হত্যা কান্ডটি যারা ঘটিয়েছেন, তাদের খুঁজে বের করে—যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হয়।
এই মাসের ২ এপ্রিল, ২০১৬ ইরফান, ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়ে নিঁখোজ হন । পরের দিন তার লাশ পাওয়া যায়— নারায়নগঞ্জের লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় । এই ইরফান এবং আনিস ভাইয়ের সাথে কত কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে—আমার । দৃক এবং পাঠশালার ডার্করুমে । ছবি পি্রন্ট করা থেকে শুরু করে—ফিল্ম ডেভেলাপ, কন্টাক পি্রন্ট, ছবির প্রদর্শনী— আরো কত কি । মনে পরে গেল বঙ্গবন্ধুর সাদাকালো লাইফ সাইজ ছবিটির পি্রন্ট করার কথা । আমরা ছবির নেগেটিভটি ডাকর্রুমের দেয়ালে প্রজেকশন করে ছবিটি পি্রন্ট করে ছিলাম কারণ লাইফ সাইজ ছবি পি্রন্ট করার কোন বিকল্প পদ্ধতি ছিল না । আলম ভাইকে দিয়ে বিদেশ থেকে রোল পেপার আনানো হয়েছিল, লাইফ সাইজ পি্রন্ট করার জন্য । এরকম আরো কত কত স্মৃতি ইরফান আর আনিস ভাইয়ের সাথে জড়িয়ে আছে—সেই সব আজ স্মৃতি । দুজনেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে ।
ছোট উমাম তার বাবা’কে নিয়ে লেখাটা পড়তে পড়তে আমার চোখ ভিজে আসছিল । মনে পড়ছিল ইরফানের নিয়ে অনেক স্মৃতি ! উমাম, তার লেখার একটা জায়গায় লিখেছে, ‘আজ আমি বাবাহারা, এই বাবাই আমার সব ছিল,আমার এখন ভীষণ একাএকা লাগে’ ।
কী ছিল আমার বাবার অপরাধ ? কেন এবং কী কারণে আমার বাবা’কে খুন করা হলো ? আমরা তিনজন মিলে ছোট একটা পরিবার ছিলাম । ছোট উমাম, মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, তার বাবার হত্যাকারীদের খুজে বের করে তাদের শাস্তি দিতে ।
উমামের লেখাটি, ‘বাবা হত্যার বিচার চাই’ লিংকটা দিলাম । যা প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে ছাপা হয়েছে । আপনারা লেখাটি পড়তে পারেন ।
ক্যামেরার প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আলো-ছায়া, কম্পোজিশন, নন্দনতত্ত্ব, বিষয়বস্তু, ঘটে যাওয়া ঘটনার চুড়ান্ত মুহূর্তের ছবিটা তুলতে পারা এবং তা সময় মতো প্রকাশ করা, একজন ফটোসাংবাদিকের—বড় মুনশিয়ানার পরিচয় বহন করে । নিশ্চই এই বিষয়টা একদিনে হয়ে উঠে না— নিয়মিত চর্চা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া,অভিজ্ঞতা অর্জন, একনিষ্ঠভাবে কাজ করার পাশাপাশি ফটোগ্রাফী বিষয়ক পড়াশোনা করাটা খুব জরুরী বলে মনে হয় । লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে স্মাট ক্যামেরা কিনলেই, পেশাদার ফটোগ্রাফার / ফটোসাংবাদিক হওয়া যায় না —নিজের ভিতরের শিক্ষাটা জরুরী !
বস্তু বিজ্ঞানের সৃষ্ট এই যন্ত্র ‘ক্যামেরা’ দিয়া নিখুঁত বাস্তবতার চিত্রটি তুলে ধরা খুব সহজ একটা কাজ না । মাঠে যারা কাজ করেন তারা ভালো বোঝেন —একটা ভালো ছবির জন্য প্রতিদিন কি পরীক্ষা দেওয়া লাগে ! প্রচলিত একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাই, ছবি তোলা আর এমন কি —ক্লিক করলেই তো ছবি হইয়া যায় ! এইটার মধ্য আবার কেরামতির কি আছে !
যদিও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে, স্মাট ফোনের সুবাদে আমজনতা সবাই এখন ‘সৌখিন ফটোগ্রাফার’ ! ছবির ভালো-মন্দ বোঝার ধারে কাছে যাওয়ার দরকার পরে না— আলো-ছায়া, কম্পোজিশন, নন্দনতত্ত্ব এখানে মুখ্য বিষয় নয় ! স্মার্ট ফোনে ছবি তুলে তা পোষ্ট করার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ থাকে ! আবার সেই আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যায়, ছবিটাকে কেউ যদি লাইক বা মন্তব্য করেন । বতর্মান আমজনতার ছবি তোলার এই যে ‘খায়েশ’ তা পুরোটাই একটা আবেগী ব্যাপার। স্মার্ট ফোন বিক্রেতাদের বাণিজি্যক করণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম গুলাতে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া । অবশ্য বতর্মান সমাজের চালচলনের যে অবস্থা তাতে এই জানান দেওয়াটা সময় সময় জরুরীও বটে ! তবে ঐ যে বলছিলাম— নিজের ভিতরের শিক্ষাটা জরুরী ! আমি ‘স্মার্ট— আমার ক্যামেরাও ‘স্মাট’ ! এই প্রক্রিয়ায় আওয়াজ দেওনের চেয়ে—সাদাসিধা ভাবে আওয়াজ দিলে তার গ্রহণ যোগ্যতা হবে অন্য রকম ।
আমাদের দেশে ফটোগ্রাফী বা ছবির ব্যবহার যে পরিমাণে বাড়ছে বা জনপ্রিয় হচ্ছে, সেই তুলনায় ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়াটা আমাদের মধ্য অনেক কম । সেই দিক থেকে চিন্তা করে, ফটোগ্রাফী বিষয়ক বোঝাপড়া’টা আমার কাছে জরুরী বলে মনে হয় ( চলবে )
পাতলা খান লেন, পুরান ঢাকা
০২, এপ্রিল, ২০১৬
ছবির তথ্য: ছবির এই ছোট মানুষটির নাম খান মোহাম্মদ নাদিম হোসেন,আমার ছোট মামা। ছবিটি পুবান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকার আঁকাবাঁকা স্টুডিও থেকে ১৯৭৮সালে তোলা ।
নীল আকাশে দুটি ভুবন চিল চক্কর দিচ্ছিল; নিম গাছ গুলোর আলো-ছায়া, পাখির কোলাহল আর নির্জনতার— এক অদ্ভুত সমীকরণ সৃষ্টি হয়েছে এখানে ! কবরস্তানের পাশ গিয়ে বয়ে গেছে ছোট খাল; দূরে—বহু দূরে । এখানেই শুয়ে আছেন অগণিত মৃতরা । কোন কোন কবরের উপর দেখলাম গ্রীল দিয়ে খাচা তৈরি করে দেয়া হয়েছে, খোঁজ নিয়ে জানলাম, সদ্য মৃতদের কবর এভাবে ঢেকে দেওয়া হয়—বেজির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে !
জানা-অজানা নানা গাছ দিয়ে ঘেরা এই নির্জন স্থানটি—কেন যেন ভালো লেগে গেল ! একটি নিম গাছের নিচে চুপটি করে বসে পড়লাম ! কবরের একটা অংশ জুড়ে ফুটে আছে— থোকায় থোকায় ছোট কাশফুল ! সেই কাশফুল গুলো বাতাসে খুব দুলছিল—বসে বসে তাই দেখছিলাম। এখানে প্রচুর নিম গাছের দেখা মিলল । আরো দেখা মিলল দুটি প্রাণীর সাথে—একটা বেজি আর অন্যটা বেড়াল ! তারা দুজনেই আমাকে দেখে দূরে সরে গেল !
পরিবার থেকে চিরদিনের মতো বিদায় নেয়া—মানুষ গুলো শেষ ঠিকানা এই করবস্তান । স্বজনেরা তাদের হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকে স্বরণ করতে এখানে ফিরে আসেন—বারবার ! পি্রয় মানুষটির জন্য দোয়া পাঠ করেন, কবরের পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, মনে পরে যায়— মানুষটির সঙ্গে নানা স্মৃতি-বিস্মৃতির ঘটনা ।
মেঘের দুই মামা তাদের বাবার কবরটির সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া পাঠ করছিলেন—আমি দূর থেকে তাই দেখছিলাম । দুজনের চেহারাতে বাবা হারানোর বেদনার ছাপ স্পষ্ট ! হয়তো বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছে অতীত হয়ে যাওয়া সেই সব স্মৃতি ! গত সপ্তাহে চির দিনের জন্য পৃথিবীর ছেড়ে চলে গেছেন এই মানুষটি । এখন তার শেষ ঠিকানা বাড্ডার —বেরাইদ কবরস্থান ।
মনে পড়ে গেল—আমাদের গ্রামের বাড়ি হিজুলিয়ার কবরস্থানটির কথা । সেখানে সমাহিত আছেন, আমার প্রিয় বাবা, ফুপু, দাদা-দাদী সহ অন্যান্য স্বজনেরা । প্রকৃতি ঘেরা এই কবরস্থানটি আমার খুব পছন্দের—একটা জায়গা । গ্রামের বাড়ী গেলে আমি কবরস্তানে গিয়ে বসে থাকি— ভালোলাগে । অনেক দিন হলো বাবার কবরটি দেখতে যাওয়া হয় না ! ভেবেছি, বাবার কবরে— একটা এপিটাফ লিখে দিব, কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি ! বাবার স্মৃতি এখন আমার কাছে—সাদা শর্াট আর কালো কোর্ট পরা, চোখে চশমা দেওয়া ফ্রেমে বাঁধানো একখানা—সাদা-কালো ছবি !
বাড্ডা, বেরাইদ
১.শারীরিক ভাবে এবার যেন একটু বেশী অসুস্থ হয়ে পড়লাম ! নানা ঔষধ-পত্র, ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ম-নীতি সবই হলো ! কিন্তু অসুস্থতা যেন আমার পিছু ছাড়তে চাইছে না ! শরীরের ক্ষতটা, আমাকে দিনরাত জানান দেয়; সে আমার সঙ্গেই আছে—আমি তথৈবচ ! পৃথিবীর কিছু সুন্দরের সাথে আরো কিছু দিন কাটাতেই ইচ্ছা হয়—মৃত্যু অনিবার্য ; তাকে অনুভব করার শক্তি দিয়ে—অর্জন করতে চাই ।
২. মধ্য রাত থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে এখানে ! মেঘের ‘নানা’ কাউকে কিছু না বলেই চলে গেলেন—না ফেরার দেশে ! আমি তাকে যতটুকু দেখেছি—খুব সহজ একজন মানুষ ছিলেন । উত্তর কাফরুল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন— তিনি । এই মসজিদে জানাজা শেষে করে; তার ইচ্ছা অনুযায়ী, গ্রামের বাড়ী বাড্ডা, বেরাইদ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হলো।
আমি— মেঘকে মাটির একটি টুকরা হাতে দিয়ে বললাম, বাবা এই মাটির টুকরাটা তোমার নানার কবরের উপর দিয়ে দাও ! ছোট মেঘ— তার ছোট ছোট হাতে তার নানার কবরের উপর মাটির টুকরাটা রাখল ! সাত বছরের মানুষটির এই প্রথম অভিজ্ঞতা হলো—কবরস্থানের। একটু পরে সে— আমাকে জিজ্ঞেস করে,বাবা ওরা নানা’কে মাটির উপর শুইয়ে দিলো কেন ? আমি বললাম বাবা, মানুষ মরে গেলে এভাবেই মাটির উপর শুইয়ে—করব দিতে হয় । তোমার নানা এখন— আল্লার কাছে চলে গিয়েছেন। তুমি এখন আল্লার কাছে দোয়া করবা— সে যেন শান্তিতে থাকেন ।
আজ অফিস ছুটি ছিল আমার । মেঘ আর মেঘের মা’কে নিয়ে গিয়েছিলাম ২১শের বই মেলায় । মেঘ বার বার বলছিল,বাবা বই মেলায় নিয়ে যাবে না ! আজ সেই সুযোগ হলো । তিনজনে মিলে বই মেলায় গেলাম । বাপ-বেটা আর বউ মিলে—মেলা ঘুরে ঘুরে মোট ২৫টা বই কিনলাম ! এর মধ্য ১৫টা বই-ই আমার ! এবারের বই মেলায় আমার বাড়তি পাওনা হলো—মজা করে মোবাইলে তোলা বাপ-বেটার একটা অসাধারন ছবি ! সেই গল্পটা না হয় একটু জানা যাক ।
বই মেলার বাংলা একাডেমি অংশে লিটিল ম্যাগ চত্তরে— বেশ কিছু লিটিল ম্যাগাজিন দিয়ে এবারের বই কেনা শুরু হলো । অবশ্য প্রতিবার তাই করি —এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না । তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, বই মেলায় বই কিনতে হলে সঙ্গে ভাংতি টাকা থাকা আবশ্যক !
লিটিল ম্যাগ চত্তর থেকে বেড়িয়ে বাংলা একাডেমির স্টলে দিকে যাব এর মধ্যে দেখি ঘোষণা মঞ্চের সামনে একটা জটলা ! সবাই হাত উপরে তুলে মুষ্ঠিবদ্ধ করে রেখেছে ! খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম— হুমায়ন আজাদ স্বরণে এখানে একটা শপথ হয়ে গেল—বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে ।
আমি মেঘের মা’কে বলালম, মেঘ’কে ঘাড়ে নিয়ে আমার একটা ছবি তোলার শখ হইছে ! ২১শের বই মেলায় মেঘ’কে ঘাড়ে নিয়া মেলা ঘুরতাছি— এই রকম একটা ছবি তুইল্যা দ্যাও —আমার মোবাইলে ! কথাটা শুনে মনে হয় সে যেন একটু বিব্রতকর অবস্থায় পড়লো ! তার এক হাতে সদ্য কেনা বই আর অন্য হাতে মোবাইল ! সে বই-পত্র হাতে নিয়েই একটা ভালো ছবি তোলার চেষ্টা করতে লাগলো !
সমস্যাটা হলো— অন্য জায়গায় ! আমি মেঘ’কে কাঁধে নিয়া একটা বই ধরাইয়া দিলাম আর বলালম, বেটা বইয়ের দিকে তাকায় থাইকো ! মেঘের মা’কে বললাম, এইবার তুলো ! সে ঝটপট কয়েকটা ছবি তুইল্যা বলে—হইছে ! আমি তাকাইয়া দেখি অনেকেই আমাদের বাপ-বেটার এই ছবি তুলার দৃশ্য দেখছে ! এক জনকে দেখলাম তার ডিএসএলআর ক্যামেরাতে একটা ছবিও তুলল ! আমি মোবাইলটা হাতে নিয়া দেখতে লাগলাম— বউ আমার কি ছবি তুলছে ! না দেখলাম একেবারে খারাপ তুলে নাই এই ছবি চালাইয়া দেওয়া যায় ! ভালো তুলছে— তবে মেঘ’কে নিয়ে যা সন্দেহ করছিলাম তাই হইছে ! বেটা আমার বইয়ের দিকে না তাকিয়ে—তার মায়ের মোবাইলের দিকে তাকাইয়া ছিল প্রায় সব গুলা ছবিতে ! যাইহোক— আমার তো শখ পূরণ হইলো ! আর বাপ-বেটার অসাধারন একটা মুহুর্তের ছবি পাইলাম ।
ছবি তোলা শেষ কইরা সামনের দিকে আগাইয়া যাইতেছি— হঠাৎ কইরা মেঘের মা পেছন থ্যাইকা আমার পাঞ্জাবি ধইরা একটা টান দিয়া বলে, উন্মাদের স্টলে চল— উন্মাদ কিনব ! মেঘ পাশ থেকে বলল, বাবা উন্মাদ কি জিনিস ? আমি মেঘ’কে বলালম, বাবা উন্মাদ হচ্ছে— একটা স্যাটায়ার ম্যাগাজিন,আহসান হাবীব হইলো এইটার সম্পাদক ও প্রকাশক । ও কি বুঝলো কে যানে—বলে, আমার ডাইনোসারের বই কিনা দাও । আমি বলালম—ঠিক আছে বাবা !
সোহরাওয়াদীর্ উদ্যান অংশে বই মেলার লোকজনের ব্যাপক ভীড় ! বড় প্রকাশকদের স্টল সব গুলো এই খানে ! প্রায় সব স্টলের সামনে লোকজন ভীড় করে দাঁড়িয়ে আছে— বই কিনছে ! স্টল গুলোর সামনে দাড়িয়ে চলছে সেলফি তোলার কাজ ! আমরা স্টল গুলো ঘুরে ঘুরে বই দেখলাম আরো কিছু বই কেনা হলো । মেঘের বইটি, অদ্ভুত প্রাণী ডাইনোসর এখানে খুঁজে পেলাম লেখক, আখতারুল ইসলাম। মেঘ’কে আমার পছন্দের একটা বই কিনে দিলাম—সব্যসাচী হাজরার ‘চিত্রলিপি’ চিত্রবর্ণ পরিচয় । বই মেলার সন্ধ্যা বাতি গুলো ততোক্ষণে জ্বলে উঠেছে— মেঘ বলল, বাবা বাসায় ফিরে চলো— আমার ঘুম পেয়েছে . . .
জিয়া আমাকে ফোন করলেন— মনির ভাই, বই মেলাটা ঘুইরা আইসেন । ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার পর বই মেলার কি অবস্থা দেইখা আইসেন ! মাসুমের সাথে কথা বলে নিয়েন । নওশাদ মামার মৃতু্যর সংবাদ শুনে—মনটা এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে সকাল থেকে।
মন খারাপ নিয়েই মেলা প্রাঙ্গণে গেলাম—ভিজে যাওয়া বই, জমে থাকা পানি-কাদা আর লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া স্টল গুলোর ছবি তুললাম ।
হঠাৎ চোখে পড়ল তাদের— বাংলা প্রকাশ স্টলের সামনের কাদা-মাটিতে পরে আছে তারা ! ঝড়ো-হাওয়ায় লতা-পাতা আর ভাঙ্গা ডালের সাথে জড়িয়ে পরে আছে “ক” বর্ণমালাটি তার ঠিক একটু দূরে পড়ে আছে— মৃত কাকটি !
মনটা খারাপ হয়েছিল আগেই— তারপর এই দৃশ্য দেখে মন আরো খারাপ হলো . . .
সোহরাওয়াদীর্ উদ্যান, অমর একুশে গ্রন্থমেলা , ঢাকা
বাবার এই ছবিটি পুরান ঢাকার কালাম ষ্টুডিও থেকে তোলা
পি্রয় বাবা—কে নিয়ে আমার কবিতা
সোনালী আকাশ . . .
সোনালী আকাশ থেকে খসে পরা
একটি উজ্জল নক্ষত্র;
হাজারো নক্ষত্রের মেলা থেকে—চির বিদায় নেয়া;
—দূর গন্তবের দিকে ! সোনালী আকাশ এখন নিস্পন্দন !
এমনি করে খসে পড়বে—হাজারো নক্ষত্র একদিন !
তখন সোনালী আকাশে অসীম শূণ্যতা।
( পি্রয় বাবা, আব্দুল মোন্নাফ তাকুরদারের স্বরণে)
জন্ম: ৬ নভেম্বর ১৯৩৬। মৃত্যু: ২০ ডিসেম্বর ১৯৯০
সৃষ্টিকাল/এপ্রিল,১৯৯৪
১.বাবার ২৫ তম মৃত্যু বাষির্কী পালন করতে আমাদের গ্রামের বাড়ী মানিকগঞ্জের হিজুলিয়াতে গিয়েছিলাম পরিবারের সদস্যরা মিলে। অন্যান্য সদস্যের মধ্য মা, বুবলী, মেঘ আর চাচা,চাচী এবং বুবলীর বড় ভাই-ভাবী এবং ওদের বাচ্চার । আমাদের গ্রামের মসজিদে বাদ মাগরিব নামায শেষে মিলাদ এবং দোয়া পাঠ করা হয়েছে । তার কবরস্থানে গিয়ে কবরে দোয়া পড়লাম । অনেকক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এবার মা আমাদের কবরস্থানে একটা ঘর করে দিয়েছেন, যাতে বষর্ার,বৃষ্টি-বাদলে মরদেহ নিয়ে মানুষ সেখানে আশ্রয় নিতে পারে । এবারের বষর্ার বাবার কবরের মাটি ধসে গিয়েছে তা সংস্কার করার উদে্যগ নিলাম।
২.১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর, বাবা— না ফেরার দেশে চলে যান । সে দিনের সংবাদটা আমরা ফোনে পেয়েছিলাম । আমি তখন বাসাতে ছিলাম, ঠিক সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফোন আসে । ফোনটা আমার মা রিসিভ করেন- ও প্রান্তের কথা ঠিক বুঝতে না পেরে, আমাকে ফোনটা দেন। আমি কথা বলে ততোক্ষণে বুঝে গেছি—আমরা, আমাদের পি্রয় বাবাকে চিরদিনের মত হারিয়ে ফেলেছি ! বাবা ব্রেন ষ্টো্রক করেছিলেন । সে দিন হাইকোর্টে তাদের বার্ষিক ডিনার পাটির্ ছিল । সেখানে অংশ গ্রহণ করে— মতিঝিল এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন । আমার বাবর আত্মার শান্তি কামনা করে সবাইকে তার জন্য দোয়া করার অনুরোধ রইল । সবাই ভাল থাকুন . . .
২০ ডিসেম্বর, ২০১৫ / হিজুলিয়া, মানিকগঞ্জ
বাম পাশে আমার বাবা ,উপরের ছবি আমি এবং মেঘ নিচের ছবি আমার চাচা এবং আমি । ছবি: মনিরুল আলম বাবা তোমায় খুব দেখতে ইচ্ছা করে . . .
“বাবা” তোমাকে যে খুব দেখতে ইচ্ছে করে । কত দিন যে তোমাকে দেখি না ! বুকের মধো কষ্ট গুলো আর্তনাদ করে উঠে-বার বার । কেন যে তোমার উপর বারবার এতো অভিমান হয় আমার । আমি কাউকে বোঝাতে পারিনা . . .
আজ ২০ ডিসেম্বর আমার বাবার ২৪তম মৃতু্য বাষির্কী । ১৯৯০ সালের এই দিনে বাবা, না ফেরার দেশে চলে যান । সে দিনের সংবাদটা আমরা ফোনে পেয়েছিলাম । আমি তখন বাসাতে ছিলাম, ঠিক সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফোন আসে । ফোনটা আমার মা রিসিভ করেন- ও প্রান্তের কথা ঠিক বুঝতে না পেরে আমাকে ফোনটা দেন। আমি কথা বলে ততোক্ষণে বুঝে গেছি। আমরা আমাদের পি্রয় বাবাকে চিরদিনের মত হারিয়ে ফেলেছি।
বাবা ব্রেন ষ্টো্রক করেছিলেন । সে দিন হাইকোর্টে তাদের বার্ষিক ডিনার পাটির্ ছিল, সেখানে অংশ গ্রহণ করে মতিঝিল এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ।
গতকাল আমরা পারিবারিক ভাবে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে কোরান খতম, দোয়ার আয়োজন করেছিলাম ।
ছোট মেঘ তার দাদা’কে দেখেনি। তাঁর কাছে, তার দাদা মানে ফ্রেমে বাঁধানো এক খানা সাদাকালো ছবি আর তার দাদীর কাছে থেকে শোনা নানা গল্প কথা ।
এ মাসে আমাদের গ্রামের বাড়ী হিজুলিয়া গিয়েছিলাম। বাবা যেখানে ঘুমিয়ে আছে ২৪ বছর ধরে। বাবা আপনি ভালো থাকবেন । আমার বাবার জন্য সবাই দোয়া করবেন . . .
পুরান ঢাকা, পাতলা খান লেন
২০ ডিসেম্বর, ২০১৪ মানিকগঞ্জের হিজুলিয়ায় আমাদের কবরস্থান, ১৯৩৭ সালে এটা স্থাপিত হয় । ছবিটি ২০, ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম
কোন এক ঈদে আমাদের গ্রামের বাড়ী হিজুলিয়াতে এই ছবিটা তুলেছিলাম। বাম থেকে চাচা মহিদুর রহমান,দাদা আবদুর রাজ্জাক তাল্কদার,বাবা আবদুল মোন্নাফ তালুকদার। ছবি :মনিরুল আলম
জীবনে বিজয়ী হয় তাঁরাই, যারা পড়াশোনায় আনন্দ মন নিয়ে লেগে থাকে । আত্মবিশ্বাস রাখ—তোমরা একদিন বিজয়ী হবেই ।
-ফাদার জেমস শ্যামল গমেজ পি.এস.সি.
ছবি: হাফিজুন নাহার বুবলী
ছবি: হাফিজুন নাহার বুবলী
শীতের সকাল—কিছুটা কুয়াশা আর রোদ ছড়িয়ে আছে— চারিদিকে । মেঘের আজ পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে—সে সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে আছে । আমাকে বলছে, বাবা আজ আমার পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে, আমাদের ক্লাস পাটির্ হবে । আমরা বন্ধুরা মিলে অনেক মজা করব । আমি ঘুমের মধ্যে বললাম—ঠিক আছে, বাবা । মেঘ এবং তার মা সকালের নাস্তা সেরে স্কুলের উদ্দেশ্য বেড়িয়ে পড়ল । আমি বেড রুমের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম— বৈদ্যুতিক তারের উপর একটা বুলবুলি পাখি বসে আছে । এই শীতে আমাদের এখানে বেশ কিছু বুলবুলির দেখা মেলে । আমাদের মেঘটা বড় হয়ে উঠছে—এই জুলাইতে তার সাত বছর বয়স হলো।
ছোট মেঘ আর তার বন্ধুরা—তানভির,রাফাত,আনিলা,মরিয়ম তাদের ক্লাস পাটর্িতে মজা করেছে । তারা সবাই লোয়ার কেজি থেকে আপার ক্লাসে উত্তীর্ন হয়েছে । যদিও বেশ কিছু দিন মেঘ স্কুল করতে পারে নাই, সে অসুস্থ ছিল । মজার ব্যাপার হচ্ছে —এই পিচ্চিরা তাদের মায়েদের মোবাইল ফোন দিয়ে নিজেরাই সেলফি তুলেছে । মেঘ আর তার বন্ধুদের বিশেষ এই মুহুতর্ গুলো ধরে রেখেছে মেঘের মা— বুবলী । এই মুহুতর্ গুলো স্মৃতি আকারে ধরে রাখার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই । আগামী জানুয়ারী ২০১৬ থেকে শুরু হবে নতুন ক্লাস,নতুন বই পাশাপাশি নতুন নতুন বন্ধু ।স্মৃতিকে পেছনে ফেলে— জীবন এভাবে এগিয়ে যায় — সামনের দিকে । আমাদের লাজুক এই ছেলেটির জন্য সবার কাছে দোয়া চাই । মেঘটা—বড় হয়ে অনেক অনেক জ্ঞানী হয়ে উঠুক এই কামনা করি ।
মেঘেদের স্কুল থেকে বের হওয়া— সাফল্যর স্বপ্ন বার্ষিক কাযর্ক্রম ২০১৫ ম্যাগাজিনটি উল্টেপাল্টে দেখছিলাম । ফাদার জেমস শ্যামল গমেজ পি.এস.সি. তার শুভেচ্ছা বাণীতে খুব সুন্দর একটা কথা বলেছেন—জীবনে বিজয়ী হয় তাঁরাই, যারা পড়াশোনায় আনন্দ মন নিয়ে লেগে থাকে । আত্মবিশ্বাস রাখ—তোমরা একদিন বিজয়ী হবেই । কথাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো । সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়াস কিন্ডারগাটেন শিক্ষালয়ের সকলকে আমার পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই এবং মঙ্গল কামনা করি ।